ছয়তলার ছাদের প্রান্ত দেয়ালে হেলান দিয়ে বাম হাতের দু আঙ্গুলের ফাঁকে রাখা নামকরা ব্র্যান্ডের সিগারেটটায় আয়েশি টান দিয়ে আকাশের দিকে ধোঁয়া ছুড়ে মারছে শাকীল। মাঝে মাঝে কোন এক নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ছে যাতে ধোয়াগুলো গোলাকার রিং আকৃতি ধারণ করে উড়ে যাচ্ছে, আর তারই ভিতরদিয়ে আকাশকে দেখার মজা লূটে নিচ্ছে সে।আহা! কি আনন্দ!! আসলে এইতো জীবন। ভাবতে ভাবতেই ওর মনে পড়ে গেল একটি গান “যৌবন একটা গোল্ডিফ (গোল্ড লিফ) সিগারেট”। গানটা মনে হতেই ঠোঁটের কোনে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো তার। মনে হয় কিছুটা কৌতুক বোধ করেছে সে। যাহোক, সর্বপরি তার ধুমপানের ধরণ ধারণ দেখে সহজেই অনুমেয় যে সে নতুন সিগারেট ধরেছে।
ধুমপানের ব্যপারে অভিভাবক মহলের এত্ত বারণ ওর ভালো লাগে না। বন্ধু মহলের অনেকেই এখন নিয়মিত এই বিষেশ পণ্যটার ক্রেতা। সিগারেট টেনে ধোয়া ছাড়ার মাঝে কেমন যেন একটা ভাব আছে। বন্ধুদেরকে এটা পান করতে দেখে সে এমনটাই অনুভব করেছে। আগুন এবং ধোয়া, দুটোই কেমন যেন এক প্রকার দুর্বোধ্য জিনিস, তাই এইদুটো জিনিস নিয়ে খেলার মাঝে একটা ভাব থাকাই স্বাভাবিক। একটা বেয়াড়া ভাব আছে, সাবালকী ভাবটার উপস্থিতিটাও বেশ আকর্ষণীয়। রাস্তার মোড়ে বন্ধুদের সাথে ভ্যাবলা কান্তের মত দাঁড়িয়ে আড্ডা দেয়ার চাইতে হাতে একটা সিগারেট থাকলে বিষয়টাতে একটা নয়া দিগন্তের ছোঁয়া লাগে বলে মনে হয়। তাছাড়া বন্ধুদের কাছ থেকে শোনা একটা বিশেষ উপকারও নাকি আছে, সিগারেট খেলে টেনশন মুক্ত থাকা যায়।
সব কিছু ঠিক আছে, কিন্তু সিগারেট খেলে টেনশন মুক্ত থাকার ব্যাপারটা তার কাছে এখনও ক্লিয়ার না। কারন সে যখন ধুমপান করে তখন তার টেনশন তুঙ্গে উঠে যায়। না জানি আব্বু-আম্মু বা মুরুব্বি কেউ দেখে ফেলে। বুকটা কেমন যেন ধুকপুক করে সারাক্ষন। তার পরও ওটায় কেমন যেন একটা মজা অনুভব করে সে। যেদিন সে প্রথম ধুমপান করেছিল সেদিন বন্ধুরা অনেক ঠাট্টা করে বলেছিল “তুই আজ এডাল্ট হইসিশ” আসলেই সেদিন নিজেকে একন যেন সিনিয়র সিনিয়র মনে হচ্ছিল।
শাকীলের সিগারেট খাওয়ার আজ অনেক দিন হতে চললো, সেদিন রাস্তার মোড়ে এক নতুন বন্ধুকে সে বলছিল “দেখ মামা! বিড়ি খাবি ভাব নিয়া, আরে সব জিনিসের মধ্যে একটা ভাব অথবা মজা না লইলে কি লাভ আছে? আরে ব্যাটা ভাব লইয়া খাইবি, আর মাইয়ারা তোর সেই ভাব দেইখা তোর প্রেমে পইড়া যাইবো” বুঝাই যাচ্ছে অভিজ্ঞতার ঝুলি বেশ গভীরতা লাভ করেছে। ইতোমধ্যে বাসার সবাই জেনে গেছে যে সে ধুমপান করে। প্রথম যেদিন জেনেছিল সেদিন আব্বু অনেক বকেছিলেন। তার পরে আরও কয়েকবার হাতে নাতে ধরা খেয়েছিল সে। প্রতিবারই আব্বু আম্মু হয়তো বকেছেন নয়তো ঠান্ডা মাথায় বুঝিয়েছেন। কিন্তু লাভ হয়নি কিছুতেই। বার বার এসব নাটক ওর নিজের কাছেই অস্বস্থিকর লাগছিল। তাই শেষ বার যখন পিতামাতা প্রচন্ড রেগে গেলেন তখন সেও রেগে মেগে কয়টা কথা তাদের শুনিয়ে দিল। মাথায় বাজ পড়ার মত অবস্থা তৈরী হল। বাবা-মার মুখদিয়ে আর কথা সরছিল না। শাকীলের এখনও মনে আছে সর্বশেষ সে উচ্চস্বরে বলেছিল “আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে তোমাদের নাক গলাতে বলেছে কে?” সেই যা বাবা-মা তাকে বারন করা বন্ধ করলেন। এখন নিজের বেড রুমে বা বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে অনায়াসে ধুমপান করে। কেউ কিছু বলে না। “ব্যক্তিগত ব্যাপার” টার্মটা ভালোই কাজে দিয়েছে সেদিন।
ইদানিং বন্ধুরা বার বার বলছে সিগারেটে আর নাকি পোষাচ্ছে না। শাকীলেরও সেরকমটাই মনে হয়। আসলেই কেমন যেন পোষাচ্ছে না আর। একটা নতুন কিছু করা দরকার মনে হচ্ছে। এদিকে ধুমপান জিনিসটা পুরান হলেও ছেড়েও কোন মজা পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক খোজ খবর লাগিয়ে সেদিন একটা মজার জিনিসের সন্ধান পেল ওরা। সিগারেট জাতীয় একটা জিনিস, খেলে নাকি অন্যরকম ফিলিংস আসে। জিনিসটা ওদের সবার পছন্দ হয়েছে। কিন্তু জিনিসটার নামটা ওদের কারও পছন্দ নয়। এত সুন্দর একটা জিনিসের এত ক্ষ্যাত মার্কা নাম হলে কিছুতেই মানায় না। যাই হোক, নাম দিয়ে কি কাজ, কাজই হল আসল।
দিন যেতে যেতে ওদেরকে অবাক করে দিয়ে পানীয় ও ধুমপানীয় জগতের চমকপ্রদ জিনিসগুলো সামনে আসতে লাগলো। একটার চেয়ে আরেকটায় আকাশ পাতাল তফাৎ। আর কি যে মজা তাতো বলার অপেক্ষাই রাখে না। কিন্তু সমস্যা হল “টাকা”। বিভিন্ন কৌশলে টাকা হাতিয়ে ওদের কাজ সারতে হয়।
গত সপ্তাহে শাকীল তার মা থেকে এক হাজার টাকা চেয়ে নিয়েছে, তার আগের সপ্তাহে বাবার পকেট থেকে সরিয়েছে আরও এক হাজার। আব্বু আম্মুর ভাব চক্কর দেখে শাকীল বুঝে গেছে টাকা সরানোর ব্যাপারটা সবাই টের পেয়ে গেছে। কিন্তু আজও তার টাকা দরকার। সে অনেক চেষ্টা করেও নিজেকে ঠেকাতে পারছে না। কিছু একটা করা দরকার। সারা ঘর সে তন্ন তন্ন করে খুজলো। আব্বু আম্মু সাধাররনত যে সকল জায়গায় টাকা রাখেন সেসকল জায়গার আজ একটি পয়সাও নেই। কি করবে কিছুই খুঁজে পাচ্ছে না সে। এদিকে শাকীলের শরীর জুড়ে মৃদু কম্পন শুরু হয়েছে। মাঝে মাঝে থেমে থেমেই এই কম্পনটা শুরু হয়। সারা শরীর চুলকাচ্ছে ওর। এমন সময় অগ্নী মূর্তি ধারণ করে মা এলেন ওর সামনে।
মাঃ এই তুই কি আলমারী থেকে আমার গহনাগুলো সরিয়েছিস?
শাকীলঃ না! কি বলছো এসব মা? আমি কেন তোমার গহনা সরাতে যাবো?
মাঃ তাহলে কে সরাবে? ঘরে কে আর আছে? আমিতো কোন কাজের বুয়াও রাখিনা?
শাকীলঃ তুমি আমাকে সন্দেহ করছো কেন? কেন কেন আমাকেই কেন তোমার সন্দেহ করতে হবে?
মাঃ সেদিন নাকি তুই আলমারির চাবী নিয়ে ঘুর ঘুর করছিলি রাহেলা বললোম আমাকে? ও তো বাচ্চা মেয়ে, সেকি মিথ্যা বলবে?
শাকীলঃ প্রচন্ড রেগে গিয়ে, আমি রাহেলাকে আজ মেরেই ফেলবো, কি পেয়েছে সে? আমি চাবি ধরেছি বলেই যে আমিই গহনা সরিয়েছি তা এতটুকু বাচ্চা যদি বুঝতে পারে তাহলে সে মিথ্যা কেন বলতে পারবে না।
অবস্থা বেগতিক দেখে মা আর তর্কে গেলেন না। ছেলেকে শান্ত করলেন। অনেক করে বুঝিয়ে তাকে দমালেন।
মা চলে যেতেই শাকীল প্রচন্ড জোরে দেয়ালে একটা লাথি মেরে ফিস ফিস করে বললো “শীট!! সব কিছু গুবলেট হয়ে গেল, এখনতো মার কাছে টাকাও চাইতে পারপবো না” অনেক কষ্ট করে সেদিনটা পার করলো শাকীল। পরের দিন ও আর পারলো না। সোজা মার কাছে গিয়ে বললো “মা আমাকে এক হাজার টাকা দাও”
মাঃ গত সপ্তাহে তোকে এক হাজার টাকা দিলাম, তার আহের সপ্তাহে তোর বাবার পকেট থেকে আরও এক হাজার টাকা নিলি। আজ আবার টাকা কেন চাচ্ছিস? এত্ত টাকা দিয়ে তুই কি করিস?
শাকীল জানে এত্ত সহজে টাকা বের করা যাবে না, সে সোজা ডাইনিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। বললো এত কথা বলতে পারবো না, আমার টাকা লাগবে আমায় তাকা দাও। তা নাহলে আমি সব ভেঙ্গে ফেলবো। এই বলে মুহূর্তের জন্যও সে থামলোনা। এক এক করে গ্লাস ও চায়ের কাল ভাংতে শুরু করলো। অগ্যতা মা তাকে টাকা দিচ্ছি এই আশ্বাস দিয়ে থামালেন। এবং টাকা এনে দিলেন।
এর পর থেকে টাকা চাইলেই বের করে দেয়া ছাড়া আর উপায় নেই। মা খুঁজে পান না কেন শাকীল এমন হয়ে গেল। সে এত্ত টাকা দিয়ে কি করে।
এক দিন মা বাজারে যাবেন বলে রেডি হলেন, টাকার জন্য এসে দেখলেন একটাকাও নেই। না শাকীল আজ টাকা চুরী করে নি। এমনিতেই টাকা শেষ হয়ে গেছে। আর বাজারে যাওয়া হল না। কোন মতে কটা দিন ডাল-ভাতে চালিয়ে নিতে হবে। মাস ফুরালেই তো বেতন পাবেন শাকিলের বাবা।
এমন সময় শাকীল এসে উদয় হল “মা টাকা দাও টাকা লাগবে”। মা ওকে পুরো বিশয়টা খুলে বললেন। শাকীলের যেন কিছুই কানে গেল না। সে সোজা বের হয়ে গেল, ফিরে এল একটা অর্ধেক ঈট নিয়ে। সোজা এসে দাঁড়ালো সোকেসের সামনে। তার পর মাকে উদ্দেশ্য করে বল্ল “টাকা দাও না হয় এই ভাঙ্গা শুরু করলাম”
মা জানেন কি হতে যাচ্ছে, তিনি কোন উপায় খুজে না পেয়ে নিজের কানের দুল দুটো খুললেন। ছেলের কাছে এলেন। ওর হাতে দুল দুটি দিয়ে শুধু এতটুকু বললেন “ শাকীল এই আমার শেষ সম্বল তোকে দিলাম, আমার কোন দুঃখ নেই বাবা! আমার শুধু একটাই দুঃখ তুই কেন এমন হয়ে গেলি? আমি কেন তোকে আর চিনতে পারি নারে?” আর কোন শব্দ নেই, শুধু মায়ের চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া অশ্রু গুলো বলছে “মা কাঁদছেন”
অনেক রাত করে শাকীল ঘরে ফিরলো, মা দরজা খুজে শুধু ছেলের দিকে একবার তাকিয়েই কিছু না বলে সোজা তার রুমে চলে গেলেন। শাকীল এখন অনেকটাই শান্ত। অনেক্ষণ ধরেই আজকে মায়ের শেষ কথা গুলো তার মনে বার বার বেজে উঠছে। সেই সাথে বিগত দিনগুলোর প্রতিটি মুহূর্ত মনে ভেষে উঠছে আর কে যেন তাকে সাশাচ্ছে। মনের অজান্তেই শাকীলের দু চোখ বেয়ে নেমে এল অশ্রু। সে উঠে দাড়ালো। টেবিলে খাতা কলম নিয়ে বসলো। খস খস করে কি যেন লিখলো।
পরদিন মা শাকীলের ঘরে এসে দেখলেন শাকীল ঘরে নেই। পুরো ঘর খুজে তাকে পেলেন না। সব শেষে ওর টেবিলে পেলেন একটা চিরকুট,
মা
আমাকে ক্ষমা করে দিও, যদিও জানি আমি ক্ষমা পাবার অযোগ্য।
মা! তোমার গহনা আমিই সরিয়েছিলাম। আমি তোমার সাথে অমানবিক আচরণ করেছি। তুমি না মা বলেছিলে ইদানিং তুমি আর আমাকে চিনতে পারো না। চিনবে কেমন করে বল? আমিতো এখন অন্য জগতের মানুষ, যেখান থেকে মানুষ হয়ে ফেরা যায় না। আমার ফিরে আসা মানেই তোমার জীবনের আকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা নেমে আসা। তাই আজ আমি চলে গেলাম। ভেবনা মা, আমি খুব ভালোই থাকবো। এই জগতের মানুষগুলো সব কই মাছের প্রাণ। এরা সহজে মরে না।
তোমার কাছে একটা অনুরোধ, মা বাসা ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যাও। এমন কোন স্থানে চলে যাও যেখানকার ঠিকানা আমি জানবো না। তুমি যদি চলে না যাও, একদিন হয়তো আমি টাকার লোভে তোমার আর আদরের বন রাহেলার গলায় ছুরি বসাতে ছুটে আসবো। মা সত্যি বলছি, আমার জগতের মানুষদের কোন ভরসা নেই। এরা টাকার জন্য হেন কাজ নেই করতে পারে না। এখন আমি সুস্থ, আমার মনের সেই পশুটা এখন ঘুমন্ত তাই এই কথা গুলো বলতে পারছি। কিন্তু যখন সেই পশুটা যেগে উঠবে তখন আমি আবার অন্য জগতের মানুষ হয়ে যাব। তা অনুরোধ, মা চলে যাও দূরে কোথাও।
ইতি
শাকীল
অন্যজগতের মানুষ।
লেখকঃ বি বি এ, ফিন। শেষ বর্ষ, ইন্টারন্যশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া
shamimuia@gmail.com
ইন্টারন্যশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া থেকে হাফিজ লিখেছেন,
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১১; দুপুর ১২:৫০
“অন্যজগতের মানুষ নামে” তারিকুর রহমান শামীম এর প্রথম লেখা গল্পটি পড়ে বড়ই পুলকিত হলাম। লেখকের সাথে একমত না হয়ে উপায় নেই যে, ইদানিং আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় মাদক সেবন মহামারি আকারে ধারন করেছে। আর মাদক দ্রব্যগুলো হাতের নাগালে পাওয়া যায় অতি সহজে, যার করনে মাদক সেবন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ধন্যবাদের দাবিদার জনাব তারিকুর রহমান শামীম, অনন্যসাধারণ একটি গল্প লেখার জন্য। ভবিষ্যতে সোনার বাংলাদেশ ম্যাগাজিনে নিয়মিত আপনার লেখা চাই।
49482
২
Bangladeshi থেকে Ali লিখেছেন,
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১১; দুপুর ০১:০০
Shamim Vai Sundor Hoyese
.Please write regularly in SB.
49487
৩
Kualalampur থেকে sharifho লিখেছেন,
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১১; বিকেল ০৪:১২
Nice.....
49629
৪
বাংলাদেশ থেকে আনিস লিখেছেন,
০৩ মার্চ ২০১১; দুপুর ১২:১৮
পড়ে ভালো লাগলো, এভাবেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে যুবসমাজ। আপনার লেখার উত্তর উত্তর উন্নতি কামনা করি। আশাকরি আরও লিখবেন
49873
৫
Finland থেকে Khalid Hasan লিখেছেন,
০৯ মার্চ ২০১১; দুপুর ০৩:৩৯
valo lekhso..
50533
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
ধন্যবাদের দাবিদার জনাব তারিকুর রহমান শামীম, অনন্যসাধারণ একটি গল্প লেখার জন্য। ভবিষ্যতে সোনার বাংলাদেশ ম্যাগাজিনে নিয়মিত আপনার লেখা চাই।