বুধবার, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ৩০ মে ২০১২; দুপুর ১২:৫৬ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

পুরনো কলাম

 
হিন্দি ভাষায় আসক্তি ও আমার কিছু কথা (১৭/০৩/২০১২)
মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী, যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতি নজর দিন (২০/০৮/২০১১)
দুই ধর্মের মানুষের মাঝে বিয়ে : হুমকির মুখে পরিবার, সমাজ, দেশ (০৬/০৮/২০১১)
আরো একজন স্বপ্নদ্রষ্টা চাই (২৩/০৭/২০১১)
বিজ্ঞাপন নিয়ে না বলা যত কথা (০৯/০৭/২০১১)
ফ্রিল্যান্সিং ও বাংলাদেশ (০২/০৭/২০১১)
ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (EVM) সিস্টেম নিয়ে কিছু কথা (১৮/০৬/২০১১)
দেশপ্রেম জাগাতে প্রয়োজন একটি জ্বলন্ত ম্যাচের কাঠি (২৬/০২/২০১১)
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশের ভবিষৎ (১৭/০৭/২০১০)
আগের লেখা
658


হিন্দি ভাষায় আসক্তি ও আমার কিছু কথা

তৌহিদুল ইসলাম সূচী

ইদানিং বিকৃত উচ্চারণ দ্বারা বাংলা ভাষার অবমাননা প্রতিরোধের ব্যাপারে খুব বেশি তোরজোড় দেখা যাচ্ছে। ফেব্রুয়ারী মাস এলেই এ ব্যাপারটা খুব বেশি দেখা যায়। যে কোন ভাবেই হোক, ভাষার অবক্ষয় প্রতিরোধ করতে হবে। আর এ ব্যাপারে সরকারের পাশাপাশি সক্রিয় মিডিয়াও। বড় বড় অভিজ্ঞ লেখকরা এ বিষয়েও লেখালেখি করছেন অনেক। অনেক দোষারোপ, ভুলত্রুটি চিহ্নিতকরণ এবং অবশেষে উপদেশ। ব্যাস! কিন্তু তাতেই কি সমাধান?

অনেকে ডোরেমন নামক হিন্দি ভাষা শিখার কার্টুনকে দোষারোপ করে বলেছেন, ডোরেমন কার্টুন আসক্তিতে দেশ নাকি সয়ালাভ! শিশু কিশোররা নাকি অতিরিক্তভাবে হিন্দিতে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে। অনেকের আবার হিন্দি সিরিয়াল ও সিনেমার প্রতি অভিযোগ। কেউ কেউ বলছেন, এসব দেখলে শিশুরা বাংলা ভাষার চেয়ে হিন্দি ভাষার প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়ে যাবে। আর তাইতো তারা দেশীয় টিভি চ্যানেল দেখে দেশ প্রেম বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।

হ্যাঁ। আমি তা মেনে নিচ্ছি। এর অনেকগুলোর পিছনে শক্ত যুক্তি আছে। সব ঠিক থাকার পরও কি আমরা দর্শকদের দেশীয় চ্যানেলমূখী করতে পারছি? উত্তরটা আমাদের সকলেরই জানা। অতীতে পারিনি, বর্তমানে পারছি না, এবং ভবিষ্যতেও পারবো না। আমার দৃঢ়তার সাথে বলতে পারার পিছনে অবশ্য মজবুত কারণও আছে। আর আমরা যদি বর্তমানের অবস্থা/পরিবেশ পরিবর্তনে উদ্যোগী না হই তবে কোন সন্দেহ নাই যে, আমাদের সকলকেই হিন্দি ফোবিয়া পেয়ে বসবে...

আমরা বারবার দেশপ্রেমের কথা বলে দেশীয় চ্যানেলে ফিরে আসার অনুরোধ করছি। তবে, যেসব মানুষ এসব সস্তা কৌশল অবলম্বন করে রাতারাতি জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠতে চান তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, দেশপ্রেম খেলনা পুতুল না যে চাইলেই রাতারাতি তৈরী করা যায়।

প্রথমেই বলছি, ডোরেমন হিন্দি ভাষা শিখার সবচেয়ে সহজ ও চমৎকার একটি পদ্ধতি যা ছোট্ট বাচ্চাদের খুব সহজের মন কাড়তে সক্ষম হয়েছে। আর তাইতো বিশেষজ্ঞদের শত অভিযোগ সত্ত্বেও অভিভাবকরা শিশু কিশোরদের ডোরেমনের নেশা থেকে সরাতে পারছে না। আমাদের দেশের যেসব বুদ্ধিজীবীরা ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ডোরেমনের নেশা থেকে শিশুদের বাঁচাতে চাইছেন, তারা কি কখনো ডোরেমনের পজেটিভ দিকটি চিন্তা করেছেন? কি এমন আছে, যা খুব সহজেই আমাদের দেশের শিশুদের পাগল করতে পারছে? কখনো কি ভেবেছেন, আমাদের ভাষা শিখার পদ্ধতিটাকে ডরেমোনের মতো করার? কখনো কি চিন্তা করেছেন, কোন পদ্ধতিতে গেলে খুব সহজেই একটি অবুঝ শিশুর মনে বাংলা ভাষা শিখার বিষয়টা আনন্দদায়ক হয়? একজন দেশ প্রেমিক হয়ে, বাবা হয়ে, কিংবা দেশের বুদ্ধিজীবী হয়ে হয়তো ভেবেছেন, বাংলা ভাষা রক্ষায় শিশুদের জন্য ডোরেমন দেখার সময় যেকোন মূল্যেই কমিয়ে আনতে হবে। কিন্তু তার বিকল্প হিসাবে আপনার সন্তানকে কি দেবেন, তা কি ভেবে দেখেছেন? সুযোগ্য অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বলেছেন, স্ববিরোধী (আমাদের সংস্কৃতি বিরোধী) জিনিস দেখা বন্ধ করতে হবে, কিন্তু ভাল জিনিস দেখার উৎস তাদেরকে দিতে পারছেন না। তবে কি করে তা সম্ভব? আপানার শিশুর মনের খোড়াকের জন্য তো অন্তত কিছুনা কিছু তো দিতেই হবে...

বাংলা ভাষার পাশাপাশি কেউ যদি অন্য কোন ভাষা রপ্ত করতে পারে, তবে তাতে আমি দোষের কিছু দেখছি না! আমরা অভিভাবক হয়ে শিশুদের ইংরেজি শিখাতে উৎসাহিত করি। কিন্তু ইংরেজির পাশাপাশি হিন্দি ভাষা শিখলে তাতে আপত্তি থাকবে কেন সেটা আমার বোধগম্য নয়। তাই কবি গুরুর সেই উক্তি-
“আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, তার পর ইংরেজি (বা অন্য ভাষা) লেখার গোড়াপত্তন”।

আপনি বার বার আপনার ছেলেকে বলেছেন, ডোরেমন দেখা বন্ধ করতে, কিন্তু করাতে পারছেন না। হ্যাঁ, আপনার ছেলের ডোরেমন দেখা বন্ধ কখনই করতে পারবেন না যদিনা আপনি ডোরেমনের বিকল্প তাকে দিতে পারেন! আমরা শুধু শিশুদের অভিভাবক হয়ে কঠোর রূপটা দেখাচ্ছি, কিন্তু একজন অভিভাবকও যে যোগ্য নেতা (যে সফলতার পথ দেখায়) হতে পারে তা দেখাতে পারছি না। কখনো কখনো বাংলায় ডাবিংকৃত কিছু কার্টুনসহ মিনার কার্টুন আমাদের দেশীয় চ্যানেলগুলো দেখিয়ে থাকে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। একটু ভেবে দেখেন, কোথায় ডরেমোনের কোয়ালিটি আর কোথায় আমাদের? প্রতিদিন ঘন্টার পর ঘন্টা ডোরেমন প্রচারিত হচ্ছে, আর আমাদের বাংলা কার্টুন?

বুদ্ধিজীবিদের উদ্দেশ্যে বলছি সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে অনেক উদ্দেশ্যমূলক কথা খুব সহজেই ঘন্টার পর ঘন্টা বলা যায় কিন্তু আপনার কথার ১টি লাইন বাস্তবায়ন করা অনেক কঠিন। কখনো যদি কেউ চেষ্টা করে থাকেন, তবেই, কেবল বুঝবেন।

দ্বিতীয়ত আমরা অভিযোগ করে থাকে, হিন্দি সিনেমা বা সিরিয়ালের ব্যাপারে। অনেকে বলে, ভদ্র লোকের ড্রয়িং রুম নাকি হিন্দি সিরিয়াল বা সিনেমার আসর ছাড়া পূর্ণতা পায় না। তবে সেই একই কথা বলতে হয়, আপনার বাড়ন্ত শিশুটি যদি দেখে, আপনার বাসায় হিন্দি চ্যানেল ছাড়া অন্য কোন ভাষার চ্যানেল চলে না, তবে সে বাংলা শিখবে কি করে? কাঁঠাল গাছে যেমন আম আশা করা বোকামি, তেমনি হিন্দি সিরিয়ালে আসক্ত আপনাকে দেখে বেড়ে উঠা আপনার শিশুটির কাছে শুদ্ধ ও পরিপাটি বাংলা ভাষায় কথা বলতে চাওয়াও চরম বোকামি। হ্যাঁ, আমি মানছি। হিন্দি সিনেমাগুলো বাংলা সিনেমার চেয়ে অনেক বেশি মানসম্পন্ন। আর তাইতো হিন্দির প্রতি আমাদের বেশি আগ্রহ। কোয়ালিটিটা সম্পূর্নই নির্ভর করে বাজেটের উপর। আমাদের ভাবতে হবে কোথায় ইন্ডিয়ান ছবির বাজেট আর কোথায় আমাদের? আর যদি এতই কোয়ালিটির উপর আমরা নির্ভরশীল হই, তবে নীতিনির্ধারণকারীরা কেন বড় বড় বক্তৃতাবাজি বন্ধ করে বাজেট বাড়াচ্ছে না? আমি বলছিনা, দেশপ্রেম করতে করতে হিন্দি সিনেমা বাদ দিয়ে বাংলা সিনেমা দেখার নামে অশ্লীলতা শিখুন এবং আপনার বাচ্চাকেও অশ্লীলতা শিক্ষা দিন। আমি আপনাকে শুধু বোঝাতে চাচ্ছি, হিন্দি দেখার পাশাপাশি বাংলা সিনেমার / সিরিয়ালের ভাল অংর্শটুকুও দেখুন।

দেশপ্রেম একদিন কিংবা একমাসের বিষয় না। প্রতিদিনের ত্যাগ, তিতিক্ষা আর সমঝোতার সম্মিলিত রূপই হল দেশ প্রেম। আর বাংলা ভাষার প্রতি প্রেম আলাদিনের কোন আশ্চর্য প্রদ্বীপ না, যা ফেব্রুয়ারী মাস আসলেই সৃষ্টি করা যায়। কিংবা অমর একুশে গ্রন্থমেলায় পাঞ্জাবী পড়ে বই কিনার মতো কিনা যায়! বাংলা ভাষার প্রতি প্রেমটা শিশুর বেড়ে উঠার মতোই প্রাত্যাহিক বিষয়।

আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবিরা সবসময়ই দারুণ দারুণ বুদ্ধি আবিষ্কার করেন। সরকারের নীতিনির্ধারণকারীরা নতুন নতুন কর্মপ্রন্থা তৈরী করছেন। কিন্তু এসব পরিকল্পনার বেশিরভাগই হচ্ছে স্বল্পমেয়াদী। সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে কর্মপরিকল্পনাও পরিবর্তন হয়ে যায়। আর তাইতো আমাদের দেশের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয় না। হলেও তা ধরে রাখা সম্ভব হয় না।

এডুকেশন সিস্টেমের মতো গাছের গোড়া কেটে গাছের পাতায় আপনি যতই পানি, কীটনাশক ছিটান না কেন তা যেমন কোন উন্নতি আনতে পারবে না, তেমনি আপনি প্রাথমিক পর্যায় (পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও আত্বীয় স্বজন, স্কুল; মূলত যেখানে শিশুরা বেড়ে উঠে) থেকে শুদ্ধ বাংলা ভাষার চর্চা আর দেশ প্রেম গড়ে তুলতে না পারলে ভবিষ্যতে তেমন কোন উন্নতি হবে বলে আমি বিশ্বাস করি না।

আর তাইতো নীতিনির্ধারকদের প্রতি বিনীতভাবে অনুরোধ, রাতারাতি দেশপ্রেম সৃষ্টি করার চেষ্টা না করে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করুন। তাতে মূলত দেশেরই উন্নতি হবে।

লেখক: একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে চাকুরীরত।
ই-মেইল: tisuchi@gmail.com
http://www.sonarbangladesh.com/articles/TauhidulIslamSuchi
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
London থেকে Lunik লিখেছেন, ১৯ মার্চ ২০১২; রাত ০৩:১৫
আমি ডোরেমিন দেখিনি। তবুও লেখকের যুক্তিগুলির সঙ্গে দ্বিমত হওয়ার কোন উপায় নেই।
81472
ঢাকা থেকে নোমান লিখেছেন, ২০ মার্চ ২০১২; দুপুর ০১:০৫
যৌক্তিক হলেও লেখাটিতে বুদ্ধিজীবিদেরকে তাচ্ছিল্লের সাথে এক হাত নেওয়া হয়েছে বলে মনে হয়।
81538
ঢাকা থেকে সূচী লিখেছেন, ২২ মার্চ ২০১২; সকাল ১০:১৬
প্রথমত ধন্যবাদ লুনিক সাহেব ও নোমান সাহেবকে। আপনাদের মূল্যবান সময় ব্যয় করে আমার লেখাটি পড়ার জন্য।
জনাব নোমান সাহেব। আমি এ লেখাতে কোন লেখককে এক হাত দিতে চাইনি। আমি শুধুমাত্র মনে করিয়ে দিতে চেয়েছি, 'বলা আর কাজে পরিনত করা' কখনই এক হতে পারে না। আর আমরা যাদের বুদ্ধিজীবি বলছি, তারা শুধু টিভির মঞ্চে বসে বসে সুন্দর সুন্দর মন ভুলানো কথাই বলতে পারে। তাদের কথার একটি বাক্যও বাস্তবে পরিনত করতে পারে না। আর যদি তাই হয়, তবে কি করে এসব বুদ্ধিজীবিদের কাছ থেকে নেয়া উপদেশ আপনি বাস্তবায়ন করতে পারবেন?
সবশেষে আপনাকে একটি হাদিস বলে শেষ করছি।
কোন এক সময় মহানবী (সাঃ) এর কাছে একটি বালক এসে বেশি চিনি খাওয়াতে কি অসুবিধা কি না সেটা জানতে চাইলো। মহানবী (সাঃ) ছেলেটিকে তিনদিন পরে আসতে বলেলেন। তিন দিন পরে ছেলেটি আসলে, মহানবী (সাঃ) ছেলেটিকে চিনি খাওয়া ছেড়ে দিতে বললেন। তখন ছেলেটি মহানবীকে জিজ্ঞাস করলেন, আপনি এই কথাটি তো তিনদিন আগেও আমাকে বলতে পারতেন। তখন, মহানবী (সাঃ) ছেলেটিকে বলল, তুমি যখন এসেছিলে, তখন আমিও চিনি খেতাম। আর এই তিনি দিনে আমি নিজে চিনি খাওয়া বন্ধ করেছি।

এই হাদিস থেকে শিক্ষনীয় বিষয় হচ্ছে, নিজে করতে পারি না এমন কোন উপদেশ অপরকে না দেয়াই ভাল।

ধন্যবাদ
81647
Dhaka থেকে Monjur Mahmood লিখেছেন, ২২ মার্চ ২০১২; রাত ০৮:০৭
Thanks Suchi.
81661
ঢাকা থেকে এস, এম, ইমদাদুল ইসলাম লিখেছেন, ২৪ মার্চ ২০১২; দুপুর ০৩:১৫
হ্যা, ফেব্রুয়ারী মাস এলেই এ ন্যাকামী খুব বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে সরকারী ন্যাকামী। অসচেতন মায়েদের কারণে শিশুরা এভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। মায়ের অবহেলায় তার নিজের বাচ্চার যে কত বড় ক্ষতি হচ্ছে- তা যদি এখুনি মায়েরা উপলব্ধি না করেন, তাহলে ভবিষ্যত প্রজন্ম ভয়াবহ অন্ধকারে তলিয়ে যাবে। আল্লাহ আমাদের এ বিপদ থেকে হেফাযত করুন ।
81724
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy