|
ফরেস্ট: ন্যাচার এ্যাট ইয়োর সার্ভিস
ভানু ভাস্কর |
|
৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। প্রতি বছরের মত এবারও ঘটা করেই এ দিবস পালন করা হবে, সন্দেহ নেই। পরিবেশ রক্ষা করতে আহবান জানানো হবে বিশ্বের তাবৎ অধিবাসীকে। কোটি কোটি ডলার খরচ হবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে। ধরিত্রীর পরিবেশ রক্ষার জন্য নাচ হবে গান হবে, আরো মেলা কিছুই হবে। কিন্তু পৃথিবীর পরিবেশ দিনে দিনে আর সংকটাপন্ন হবে এবং হচ্ছে; এবং এ ভবিষ্যদ্বাণী করতে পল (জ্যোতিষী অক্টোপাসের নাম) কিংবা পঞ্জিকা কোনটার সাহায্য নেবার দরকার হয়না, শুধু চোখ মেলে তাকালেই চলে। আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য দিনকে দিন নষ্ট হচ্ছে, নষ্ট করছি আমরা মানুষেরাই এবং এ দায় সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে আমাদের ঘাড়েই বর্তায়। মানুষ পৃথিবী শাসন করে এবং শাসক হিসেবে এ পৃথিবীকে সুন্দর করার দায়িত্ব শুধু মানুষেরই। এ পৃথিবীর যা কিছু সম্পদ, তা শুধুমাত্র মানুষেরই ভোগের জন্য। কিন্তু ভোগবাদী মানুষেরা তার প্রতি সদাচারী না হয়ে সীমাহীন ব্যবহারের মাধ্যমে রিসোর্স ধ্বংস করছে এবং দুনিয়াকে এখন ধীরে ধীরে বাসস্থানের অযোগ্য করে তুলছে। সম্মেলনের প্রটোকলগুলি আমাদের পৃথিবীর জন্য না নিয়ে আসতে পারছে কোন সুখের বারতা এবং পৃথিবীর তাবৎ ধনী দেশগুলির জন্য উদ্বেগ উৎকন্ঠার এসব সম্মেলন তামাশার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
সন্দেহাতীত ভাবেই পৃথিবীর উন্নয়নের যে জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিয়েছি আমরা, তার উল্টো ফল স্বরূপ ধ্বংসের সে জোয়ার প্লাবিত করে দিতে যাচ্ছে আমাদের ভবিষ্যতকে। পরিবেশকে আমরাই মারাত্মকভাবে ক্ষতির সমুখে দাঁড় করিয়েছি এবং আজ আমরাই একে রক্ষা করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছি। অবশ্য বইয়ে নিবদ্ধ শব্দ এবং সভা-সেমিনারের চুম্বক অংশের কোন বাস্তব প্রতিফলন নেই এবং দিবস পালনের নামে গৃহীত সিদ্ধান্ত ফাইলেই আটকে থাকে। কিন্তু সবিশেষ উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, রথী-মহারথীদের মিটিং-ফিটিং, হোটেল-বিমান ভাড়া বাবদ খরচ হয়ে যায় কোটি কোটি টাকা। পৃথিবীর পরিবেশ রক্ষার জন্য, একে আগামী দিনের শিশুদের জন্য একটি আদর্শ এবং বাসযোগ্য স্থান করে দেবার জন্য সুকান্তের সে স্বপ্ন ও আহবানে সাড়া দেবার কোন ইচ্ছে আছে বলে মনে হয়না নের্তৃস্থানীয়দের। শুধু প্রচার প্রসারের ফলে পরিবেশের কোন উন্নতি সাধন হবেনা এ কথা ফলাও করে বলা যায়। আসলে পরিবেশ রক্ষার জন্য কর্তাব্যক্তিদের গাফিলতি অনেকাংশে দায়ী। দায়িত্বপ্রাপ্ত হবার পর দায়িত্ব ভুলে যাওয়া আমাদের দেশে একটি অর্গানাইজেশনাল কালচারে পরিণত হয়েছে।
নবীজি বলেছেন পানিতে বা তরল খাবারে ফুঁ না দিতে। এখন আমরা জানি, পানিতে ফুঁ দিয়ে সে পানি খেলে তাতে রোগ বালাই হবার সম্ভাবনা প্রকট। বিজ্ঞানের আশীর্বাদপুষ্ট আধুনিক এ যুগে জানা গেল ফুঁ দিলে বা প্রশ্বাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইড বের হয়। পানিতে মিশে পেটে গিয়ে সমস্যা তৈরী করে। প্রশ্বাসে নির্গত জীবাণুও পানিতে মিশে যেতে পারে। বদ্ধ পানিতে প্রস্রাব ত্যাগ না করার কথা বলেছেন তিনি। কারন তাতে পানি দুষিত হয়। এ কথার অর্থ খুবই পরিস্কার। তিনি (নবিজী) পানি দুষণ করতে নিষেধ করেছেন। আর আমরা আধুনিক এ যুগে এসে প্রস্রাব-পায়খানার দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছি, খালে-বিলে লেকে-সরোবরে। জমির সার জমে ছেড়ে বিল থেকে নদীতে গিয়ে পড়ছে, কলকারখানার তরল নির্গমন করছে বুড়িগঙ্গায়-শীতলক্ষায়। মা শীতলক্ষার বুকে দুগ্ধ নেই, আছে বিষ। দুগ্ধ যে আবার আসবে সেই আশা আজ আর করিনা। খুবই হাস্যকর ঠেকে (সত্যি কি হাস্যকর? নাকি বেদনাময়?) যখন ভাবি অত্যাধুনিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধা (!) সম্বলিত আধুনিক রাজধানী শহরের দু পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে সম্ভবত সারা বিশ্বেরই অন্যতম প্রধান দুষিত দুটি নদী। এই আমাদেরই সেচ্ছাচারিতার কোপানলে পড়ে নদীগুলি মৃতপ্রায়। গ্রীষ্মে নাব্যতা হারায় আমাদের নদীগুলি।
নবীজি বৃক্ষ লাগাতে উৎসাহিত করেছেন সবাইকে এবং এতে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণের কথা বলেছেন তিনি। তিনি নিজে বৃক্ষ রচনা করেছেন। আর আমরা প্রভাবশালীদের নেতৃত্বে গাছ কাটছি। আমরা বৃক্ষ নিধন করে সবুজ পৃথিবী তৈরীর যে স্বপ্ন দেখি তা দারুণ অবাস্তব। আমাদের দেশে এখনো আমরা দেখি, শত শত বৃক্ষ কাটা হয়েছে মন্ত্রী-মিনিস্টারের সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানের তোরণ বানাবার জন্য। সে অনুষ্ঠানে এসে তিনি বা তাঁরা বৃক্ষ রোপন কর্মসূচির শুভ উদ্বোধন করবেন। কি বিচিত্র আমাদের এ দেশ! আজকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে গাছ লাগানো কর্মসূচি পালিত হয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল, গাছ লাগানো অবধি এ কর্মসূচির স্থায়িত্ব। কোন টিভি চ্যানেলে এই আনুষ্ঠানিকতার ভিডিও প্রদর্শিত হলেই শেষ। মন্ত্রী খুশি, রাজনীতিবিদেরা খুশি। কিন্তু গাছগুলির পরিচর্যার কি হবে, কবে বেড়ে উঠবে, ডাল-পালা মেলবে সে খবর নেই। কিছু দিন পর দেখা যাবে গাছের চারা যা লাগানো হয়েছিল, নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রাণীকুলের যে প্রয়োজনীয়তা, তা বলে শেষ করা যাবেনা। বন ধ্বংসের সাথে সাথে প্রাণীগুলিও হারিয়ে গেছে কিংবা অনেক প্রাণীই আজ হারিয়ে যাবার পথে। চিড়িয়াখানার পশুদের খাবার চলে যায় রক্ষকের বাড়িতে। মানুষ কত নিষ্ঠুর হলে মুক্ত বনের আবদ্ধ প্রাণীটির খাবার নিজেই খেয়ে ফেলতে পারে! চিড়িয়াখানায় ধুঁকে ধুঁকে মরছে পশুগুলি। কি অপরাধ করেছে ওরা? কোথায় গেল আমাদের শিক্ষা, কোথায় গেল মানবিকতা।
ছোটকালে পড়েছিলাম একটি দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য ন্যুনতম শতকরা ২৫ ভাগ বন থাকা চাই। সেই থেকে বনভূমি বাড়াবার সরকারী-বেসরকারী সে কি উদ্বেগ, সে কি উৎকন্ঠা! এই ২০১১ তে এসে আমাদের হাতে মোট ভূমির মাত্র ১০ ভাগ বন আছে। ছোটবেলায় যখন পড়েছিলাম, জানতাম দেশে বনভূমি মোট ভূমির ১৭ ভাগ। কমতে কমতে কোথায় গেল সে বন? কোথায় সে সবুজ? সবুজ বিপ্লবের কথা শুনে এসেছি সেই কবে থেকে! কিন্তু সবুজ চোখে পড়েনা। চারিদিকে সরকারী কর্মকর্তাদের সাথে একাত্ম হয়ে বন উজাড় করার প্রতিযোগিতা চলছে আমাদের দেশে। পাঠক আপনি অনুগ্রহ করে একবার বেনাপোল বর্ডারে যান। নো ম্যান্স ল্যান্ডে একবার দাঁড়ান। এবার দু দেশের দিকে চেয়ে দেখুন। বৃটিশদের আমলে লাগানো অতিকায় রেইন ট্রি গুলি আমাদের পাশের দেশকে ছায়া বিতরণ করছে; আমাদের এ দেশ রৌদ্রময়, রুক্ষ, ঊষর, ধুলি ভারাক্রান্ত। দেশে নাকি যত্রতত্র বৃক্ষনিধন রোধকল্পে বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন নীতিগতভাবে অনুমোদন করা হয়েছে। আগে নাকি যে কেউ ইচ্ছে করলে গাছ কাটতে পারতো। এ কেমন কথা? বনের গাছ যে কেউ ইচ্ছে কাটবে, কেউ কথাটি কইবে না? বন কি বাপ-দাদার সম্পত্তি? এই আইন, এই নীতির সফল বাস্তবায়ন কবে হবে ঠাকুর? সে দিন করে আসবে? এ দেশে রক্ষকরাই ভক্ষক সেজে বসে আছেন সে কথা আজ আর অবিদিত নয়।
আজ আমরা পাহাড় কেটে, মাটি খুঁড়ে বিল্ডিং বানাচ্ছি। কোন দেশে আছি রে ভাই, ভাবতে অবাক লাগে। সীতাকুন্ডু, চট্টগ্রাম, বান্দরবন, সিলেটসহ বাংলাদেশের যেখানে টিলা বা পাহাড় জাতীয় কিছু আছে, ভূমিখেকো পশুদের চোখ পড়েছে সেখানে। পাহাড় কেটে সমান করে দিচ্ছে তারা, আবাসন প্রকল্প করবে বলে। কি আশ্চর্যের কথা যে, পৃথিবীর রূপ, বৈচিত্র, পশুপাখির আবাসস্থল, বন ধ্বংস করে এই মানুষেরই থাকার জন্য তৈরী করা হচ্ছে আধুনিক দালান কোঠা। প্রশাসন বলতে কি আর কিছু রেখেছে বাংলাদেশ। পাহাড় কাটার ফলে জীববৈচিত্র যেভাবে নষ্ট হচ্ছে, সে খবর কি আমাদের জানা নেই? তাছাড়া পাহাড় পর্বত পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। আল্লাহ-তা’লা পাহাড় পর্বতকে পৃথিবীর খুঁটি খুঁটি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। পবিত্র কুরআনের বহু আয়াতে পাহাড় পর্বত প্রসঙ্গে বলা হয়েছে। আগামী দিনের শিশুদের জন্য যা রেখে যাবার কথা, ভবিষ্যতের সে বংশধরেরা যদি তা থেকে বঞ্চিত হয়, তবে তারা এবং প্রকৃতি নিজেই আমাদেরকে কোনদিন ক্ষমা করবে না।
এভাবে বৃক্ষ ও পশু নিধন করে, পানি দূষণ করে, বায়ু দুষণ করে, পাহাড় কেটে কিভাবে আমরা আমাদের পরিবেশকে রক্ষা করব? ভবিষ্যত আমাদের জন্য কি নিয়ে অবতীর্ণ হবে সেটা আমাদের বোধগম্য নয়। আমরা এতটাই সেচ্ছাচারী হয়ে পড়েছি যে ভোগবাদিতার কবল থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করা দূরে থাকুক, শিল্পায়ন এবং নগরায়নের নামে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনছি আমরাই। বিপন্ন পরিবেশ, বিপন্ন প্রকৃতি, তাই জীববৈচিত্রও আজ বিপন্ন। লাখ লাখ প্রাণী এই পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বাসস্থানের অভাবে, খাদ্যের অভাবে। আর আমরা মানুষেরা পরিবেশ-প্রতিবেশ-প্রকৃতিকে বাঁচাবার মিথ্যে সঙ্গীতের আসর বসাচ্ছি প্রতি বছর ৫ জুন। পরিবেশ দিবস সন্দেহাতীতভাবেই তাৎপর্যপূর্ণ। এ দিন উপলক্ষে যে সব সেমিনারের আয়োজন করা হয় তা থেকে গৃহীত সিদ্ধান্তসমুহের সত্যিকার অর্থে বাস্তবায়ন ঘটাতে তো হবে। শুধু মুখে মুখে আন্দোলনে কি আর কোন পরিবর্তন আসবে? কখনই না। আমাদের পরিবেশ হুমকির মুখে। আমরা জানিনা সামনের দিনগুলি হয়ত আরো ভয়াবহ হয়ে উঠবে। পরিবেশ দূষিত হওয়া মানে এই পৃথিবীর দূষিত হওয়া এবং এই দুষণ একদিন পৃথিবীকে ধংস করে দেবে। সেই ধ্বংস থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে হবে, আমাদেরকে বাঁচতে হবে। ভবিষ্যত প্রজন্মকে সুন্দর একটা পৃথিবী উপহার দিতে হবে। নবজাতকের কাছে এ হোক আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকার। |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/VanuVaskor |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| সিলেট |
|