বুধবার, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ৩০ মে ২০১২; দুপুর ১২:৫৮ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

জংগী ভাই

ডব্লিউ জামান

মুজিব কোটটা গায়ে দিয়ে আয়নার সামনে দাড়ান মাহাতাব সাহেব । মুখের লম্বা দাড়ি একেবারে মেশিন দিয়ে ছেঁটে এসেছেন সেলুন থেকে । চেহারা সম্পূর্ণ বদলিয়ে গেছে যেন নিজেকেই চিনতে পারছেন না । এয়ারপোর্টে রুমা চিনতে পারবেতো ! গত প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি এ দেশে আছেন ফি বছরে একবার করে বাড়ী ফেরেন । কিন্তু কক্ষনোই বাড়ী ফেরা নিয়ে এত টেনশন হয়নি । বড় মেয়ে জামাই নিয়ে রুমার ঢাকা এয়ারপোর্টে থাকার কথা । এমন চেহারা দেখেকি এয়ারপোর্ট থেকেই হাসাহাসি শুরু করে দেবে ! নাকি রুমা চুপি চুপি বলেই বসবে --- এত জোয়ান সাজার শখ হল কেন গো … আরেকটা বিয়ে করবে নাকি ! মাহাতাব সাহেব এক কানাডিয়ান কোম্পানির রিয়াদ অফিসের একাউন্টান্ট । বয়স ৬০ না ছুলেও সম্পূর্ণ সাদা চুল দাড়িতে ষাটোর্ধ বলে মনে হয় । ফর্সা মুখের উপর লম্বা সাদা দাড়ি, মাঝখানে সেজদা দিতে দিতে কাল দাগ। সব সময় সফেদ কাপড় চোপর পারিধান করতে নবী সাহেব পছন্দ করতেন তিনি ও সেভাবে নবীর ছুন্নত পালন করেন । সে জন্য অফিসের ইয়ং বর্তমানে কাতারে নির্বাসিত বিখ্যাত ইন্ডিয়ান শিল্পী ফিদা মকবুল হুসেনের অনূকরণে আংকেল বলে ডাকে । অফিস, বাসা আর নামাজ রোজা ছাড়া পারে না তাকে । ইসলামের রীতি নীতি পুরাপুরি পালন কারেন ।আজ রাতের ফ্লাইটে তিনি ঢাকা যাবেন দেড় মাসের ছুটিতে । অস্থির এ সময়ে ছুটিতে যেতে ইচ্ছা না থাকলেও হঠাৎ করে তিথলীর বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়ায় যেতে হচ্ছে । বুয়েট থেকে পাশ করা ছেলে কানাডা থাকে , তিথলীরও পছন্দের । ছুটিতে এসেছে, এমন ছেলে রুমা হাতছাড়া করতে চাই না । রিয়াদের উপকন্ঠে সেকেন্ড ইন্ডাষ্ট্রিয়াল এরিয়া, লক্ষ্যাধিক এশিয়ানের বাস এখানে । ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের মানুষের মাঝে ইসলাম ধর্মকে পরিচয় করে দিতে একটা ইসলামিক সংগঠন “প্রমালগেটিং ইসলাম এমং মাইনরিটিস “নামে একটা অফিস খুলেছে, সাথে বিশাল পরিসরে মসজিদ নন মুসলিম কেহ আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে চাইলে এই অফিস থেকে তাকে সাপোর্ট হয় । শুক্রবারে নামাজের পর বিভিন্ন ভাষায় ধর্মীয় লেকচার দেওয়া হয় যা অনেক দূর থেকে শোনা যায় । শ্রীলংকান জিন্নাহর মাধ্যমে এই সংগঠনের সাথে জড়িয়ে পরেন মাহাতাব সাহেব ।

প্রতি শুক্রবারে মাহাতাব সাহেব এখানে বাংলায় লেকচার দেন । সংগঠনের কেহ যদি তার এমন দাড়ি বিহীন চেহারা দেখে ফেলে ! নিজের বোকামিতে অনুতপ্তঃ সে । এভাবে এতদিনের লালন নবীর সুন্নত শুধু মানুষের কথায় কান ঈমানের জোর কি তার দুর্বল হয়ে গেল ! দিয়ে কেটে সাফ করে ফেলা মোটেই ঠিক হয়নি তার ।

প্রাণ প্রিয় ছোট মেয়ে তিথলী। ওর বিয়েতে কোনো রকম রিস্ক নিতে চাননা মাহাতাব সাহেব। মেয়েটা চোখের সামনে দিয়ে হাসতে হাসতে জামাই এর হাত ধরে কানাডা চলে যাক ! আর দশজন বাবার মত তিনিও চান না ছেলেমেয়েরা নিজ দেশে থেকে বড় হোক । এ দেশে ওদের ভবিষৎ কি ? ষ্টুডেন্ট পলিটিক্স, ড্রাগস, মাস্তান, পুলিশ কিংবা এক্সিডেন্ট, রেপ, আত্মহত্যা আর মিথ্যার বেসাতি। এর মধ্যে ঘুরপাক না খেয়ে যা বাবা তোরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যা । পশ্চাৎপদতা আর ৪০ বছরের ঘৃণা ছিটানো পরিত্যাগ করে তোদের মত করে এদেশটাকে গড়বে না ।

৭১ সালে মাহাতাব সাহেব এস এস সি পরিক্ষার্থী ছিলেন, ভারতে পালিয়ে না গিয়ে দেশের ভিতরে থেকেই যতদুর পারেন সাহায্য করার চেষ্টা করেছেন মুক্তিবাহিনীর বিচ্ছু গুলিকে । যাতায়াতের সুবিধার জন্য স্থানীয় পোরসভার চেয়ারম্যান তখন শান্তি কমিটিরও চেয়ারম্যান, তার কাছ পরিচয় পত্র যা পাকিস্তানি আর্মির কাছে ডান্টি কার্ড নামে প্রচলিত ছিল তা জোগার করেছিল । কার্ড দেবার সময় চেয়ারম্যান সাহেব সজাগ করে দিয়ে বলেছিলেন – বাবা, তোমাকেতো তবু বলছি ‘মুক্তি’ হলে এই এরিয়ায় মধ্যে এয়কশনে যেও না, যা করার দূরে গিয়ে কর । না হলে এলাকার লোকগুলিকে বাঁচাতে পারবনা । বয়সের ভারে নুব্জ ওই ভদ্রলোকের নামে যুদ্ধাপরাধী কেইস হয়েছে যে কোনো সময় এরেস্ট করা হতে পারে। তা শুনে আনোয়ারের হুমকি হাল্কা নিতে পারেনি মাহাতাব সাহেব । ভ্রষ্টাচার আর মিথ্যাচারের এ সময়ে আনয়ারেরা অনেক কিছুই করতে পারে । সময়ের ব্যবধানে আনোয়ার তাকে যুধাপরাধী কিংবা জঙ্গী বলে ফাসানোর যে হুমকি দিয়েছে তা করে দেখাতেও পারে ।

মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক হয়ে যাচ্ছে শত্রু পক্ষের চর, সেখানে ইসলামিক বই , কোরান হাদিস থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশি বিদেশি ইসলামি চিন্তাবিদদের লেখা বই, সিডি , ক্যসেট সংগ্রহ করেছেন তিনি । মদিনা ইউনিভার্সিটি, আল-আজহার ইউনিভার্সিটি প্রকাশিত কিংবা জাকির নায়েকের লেকচার, দেলোয়ার হোসেন সাইদীর কোরানের তফসির যেখানে যা পেয়েছেন নিয়ে এসে ঘর ভর্তি করেছেন আর রুমা ধুলা বালি ঝারপোচ করে সযত্নে তা আগলিয়ে রেখেছে । এগুলিই তাকে জংগী বলে প্রমাণ করতে যথেষ্ট সহায়ক হবে আনোয়ারের পক্ষে । হয়ত একদিন টিভির সামনে তাকে হাত কড়া পরিহিত দেখা যাবে, সামনে তার বাসা থেকে আনা বই এর স্তুপের উপর বড় করে লেখা “ জেহাদী ডিবির কোনো কর্মকর্তা টিভির সামনে মুচকি হাসী উপহার দিতে দিতে বলছে “ অনেক গুরুত্তপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে “কিংবা পাসপোর্টের পাতা ওল্টায়েই খুজে পাবে যেমন ভাবে ইঙ্কোয়ারি টিম কোনো জেলায় পা রাখা মাত্রই বুঝতে পারেছেন সে জেলায় কে কে যুদ্ধাপরাধী, কাকে কোথায় কিভাবে হত্যা করা হয়েছে ইত্যাদি । বর্তমানের করিৎকর্মা বাহিনী তো আগের মত নাই । দিন বদলের সাথে সাথে ওদের ও এখন ছেলেকে মেয়ে আর মেয়েকে ছেলে বানানো ছাড়া সবই কারতে পারে মাশাল্লাহ । তাই মাহাতাব সাহেবের মত সহজ সরল মানুষের পক্ষে কোনো রাস্তা ছিল না ।

আনোয়ার আওয়ামী লীগের স্থানীও নেতা । উপজেলা কমিটির সেক্রেটারি, অনেক প্রভাব । টি সাহেব সমিহ করে । অনেকদিন থেকে মাহাতাব সাহেবের সাথে ওর শত্রু তা চলে আসছে একটা জমি দখল নিয়ে। এবারে ক্ষমতার সবটুকু সদ্ব্যবহার করতে চায় আনোয়ার । বাড়ীতে এসে রুমাকে ভদ্র ভাবে বলে গেছে – “ ভাবী, মিমাংসা করে ফেলতে বলেন না হলে যুদ্ধাপরাধী কিংবা জংগী নামে একবার ভিতরে ঢুকলে কিন্তু জামিনও হবে না। এটাই মাহাতাব সাহেবের দুশ্চিন্তা । এই সময় ছুটিতে না যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কিন্তু তিথলীর বিয়ের সব আয়োজন ঠিক হয়ে যাওয়াই যেতেই হচ্ছে । কলীগদের সাথে পরামর্শ করে শেষে তরুন আই টি ইঞ্জিনিয়ার কল্লোলের কথা মত মুজিব কোট বানাতে দিল রিয়াদের বাথা মার্কেটের ঢাকা টেইলার্স এ । দাড়ি ছেটে ফেলাতে মুখটা পাতলা লাগছে । প্রথম প্রথম রুমা দাড়ি নিয়ে বিরক্ত হয়ে বলত – দূর ছাতা ! এগুলি কালই কেটে ফেলবে তো ! একটু শান্তি করে কিস ও করতে পারি না ! রুমার কথাগুলি মনে হতেই এক বছরের ক্ষুধা যেন মাথাচাঁড়া দিয়ে উঠল মাহাতাব সাহেবের । আর মাত্র কটা ঘন্টা, তার পরই রুমাকে পাবে বুকের মধ্যে, মেয়ে জামাই বাড়ীতে উপস্থিত থাকলে হয়ত রাজী হতে চাইবে না, রাত পযর্ন্ত অপেক্ষা করতে বলবে । তার তর সইবে না, জোর করে রুমাকে টেনে নিতে হবে রুমের মধ্যে । ভাবতে ভাবতে পুলকিত হন মাহাতাব সাহেব । মন থেকে আনোয়ারের ভয় দূর হয়ে যাই । মনে মনে কল্লোলকে ধন্যবাদ খুব বুদ্ধিমান ছেলে । সব সময় সুন্দর সুন্দর আইডিয়া থাকে ছেলেটার মাথায় । তিথলীর বিয়ে না হয়ে গেলে কল্লোলকে প্রস্তাবটা দেওয়া যেত । দুজনকে মানাত ভাল । নিজের মনে কথাগুলি বলে মুজিব কোটের বোতাম আটকান । এই কোট টা তাকে নিজ দেশে নিরাপত্তা দিবে ! এক দেশে জন্ম হয়েছিল তার । লাগেজ নিয়ে রিয়াদ এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওয়না দেন মাহতাব সাহেব।
http://www.sonarbangladesh.com/articles/WZaman
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy