|
নিরক্ষর এক অনন্য কবি প্রতিভার সাথে কিছুক্ষণ-২
অহিদ ছাদের |
|
মানুষের জীবন কতো বিচিত্র! সুখ, সমৃদ্ধি, আনন্দ, হাসি, উল্লাস, গর্ব ও গৌরবের পাশাপাশি মানুষের জীবনে কম বেশী স্থান দখল করে রাখে এগুলোরই বিপরীত অনেক কিছু – দূঃখ, বেদনা, কান্না, অপমান, লাঞ্ছনা ইত্যাদি। এদুটো ধারার অনুভূতিই সব মানুষের জীবনে বড়ো অভিজ্ঞতার সঞ্চয় ও সম্বল। একজন মনোবিজ্ঞানী হয়তো এ দু’ধারার মানবীয় সংবেদনগুলোর পুংখানুপুংখ বিশ্লেষণ করে অনেক তত্ব দাঁড় করিয়ে তার ওপর বিশাল বই রচনা করতে পারেন। এমন অনেক বই বাজারে বহুত আছেও। কিন্তু একজন মনোবিজ্ঞানী না হয়ে কিংবা নেহায়েত গবেষণার প্রয়োজন ছাড়া কেউ এজাতীয় লেখা পাঁচ দশ মিনিট সময় ব্যয় করে ধৈর্যের সাথে পড়বেন তা আমার বিশ্বাস হয়না। অথচ কেউ যখন তার ব্যক্তিগত বাস্তব জীবনের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত এজাতীয় অনুভূতি গুলোকে সহজ সরল ভাষায় বর্ণনা করেন তা মানুষ গোগ্রাসে গিলে, মানুষের মন ছুঁয়ে যায়, মানুষ ঘন্টার পর ঘন্টা মনের অজান্তেই কাটিয়ে দেয় এমন কিছু শুনে বা পড়ে। অভিজ্ঞতা কম বেশী সবার থাকে কিন্তু তা অন্যের মনোগ্রাহ্য করে উপস্থাপন, বিশেষ করে সাবলীল ভাষায় লিখে পেশ করার মতো যোগ্যতা ও কৌশল সবার নাও থাকতে পারে। অক্ষর জ্ঞানের অভাবে একজন প্রাজ্ঞ অভিজ্ঞ ব্যক্তি তার অভিজ্ঞতার সমূদ্র থেকে অন্য অসংখ্য মানুষকে জ্ঞান আহরণ করা থেকে বঞ্চিত রাখে।
আমার পাশের গ্রামের জয়নাল চাচার কথা ধরি যিনি একদম নিরক্ষর হালচাষী। এখোন বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই চাচাকে ছোটোবেলা থেকে দেখে এসেছি অনন্য প্রতিভাময় এমন এক কবি হিসেবে যিনি নিত্য-নৈমিত্তিক কথা-বার্তা, দূঃখ-বেদনার অভিব্যক্তি আর আশেপাশে ঘটে যাওয়া সব ঘটনাকে কতো সুন্দর ছান্দিক ভাষায় অনর্গল বলে যেতে। কথা শুরু করলে মনে হয় একটা বহতা নদীর বহমান স্রোতধারা তর তর করে বয়ে চলেছে অবিরাম। কেউ অনুরোধ করে না থামালে তাঁর সেই আবেগদীপ্ত ছন্দময় শব্দের ফল্গুধারা চলতেই থাকে। তিনি জ্ঞানী-গুণী আর ছাত্রদেরকে অত্যন্ত সমাদর করতেন। আমি একজন ক্ষুদে ছাত্র হিসেবে উনার অনেক স্নেহের পাত্র ছিলাম। ছোটবেলায় যখন গ্রাম্য কাঁচা রাস্তা দিয়ে পায়ে হেঁটে দূর-দূরান্তে যেতাম মাঠের ভেতর দিয়ে, তিনি লাঙ্গল থামিয়ে ছুটে এসে আমাকে দাঁড় করিয়ে কবিতার ভাষায় কতো কথা বলে আর দো’আ করে মন ভরিয়ে দিতেন। বিদেশ বিভূঁইয়ে থাকাকালে প্রায় পনের-বিশ বছর তাঁর সাথে আমার দেখা হয়নি। কতো নিষ্ঠুর এ জীবন, এ জীবনের বাস্তবতা! ভেবেছিলাম হয়তো তিনি আর বেঁচে নেই। তাঁর উপর আমি ইতোপূর্বে একটা স্মৃতিচারণমূলক লেখা লেখা লিখেছিলাম এবং সেখানে তাঁর বেঁচে না থাকার আশংকা ব্যক্ত করেছিলাম। সে লেখার নীচে আমার ছোটোভাই মন্তব্য লিখে আমাকে আশ্বস্ত করেছে যে তিনি এখোনো বেঁচে আছেন।
গত কুরবানীর ঈদের ছুটিটা দেশে গিয়ে কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলাম পারিবারিকভাবে। সব মিলিয়ে দেশে থাকতে পারবো দশ দিন। এই দশ দিনকে আবার তিন ভাগে ভাগ করে আমাকে স্ত্রী ও দুই কন্যাসহ দেশের তিন তিনটা জায়গায় যেতে ও থাকতে হবে। যশোরে নিজ গ্রামের বাড়ি, সিলেটে শ্বশুরালয় এবং মাঝখানে ঢাকা। এই স্বল্প কয়েকদিনের জন্য দেশে গিয়ে সব ব্যস্ততার মধ্যে সবচেয়ে বড়ো অভিপ্রায় ছিলো জয়নাল চাচার সাথে দেখা করা। আত্মীয়-স্বজন ও অন্যান্যদের ভীড়ে গ্রামের বাড়িতে চারদিন অবস্থানের সময় খুউব পেরেশানে এবং আশংকায় ছিলাম তাঁর সাথে বুঝি সাক্ষাতটা মিস হোয়ে যাবে। দেখতে দেখতে ঈদের দিন হাজির। ঈদের পরের দিন বিকেলেই যশোর ছেড়ে চলে যেতে হবে সিলেটে। ঈদের দিন অত্যন্ত অসুস্থ হোয়ে পড়লাম ঘুম থেকে উঠার সাথে সাথে। উঠে বসার বা দাঁড়ানোর শক্তিটুকুও গায়ে ছিলোনা। ঈদের দিনে অনেক কাজ, অনেকের সাথে দেখা সাক্ষাত। অথচ সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে এক নির্জন কক্ষে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম। অনেকেই দেখা করতে এসেছিলো। আমি সম্মত হয়নি, আমার অবস্থা ছিলো ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। কালকে আমাকে সিলেটের উদ্দেশ্যে যশোর ছাড়তেই হবে, কাজেই যে কোনো মূল্যে এই অসুস্থতা অতিক্রম করে কিছুটা হোলেও আমাকে সবল এবং দীর্ঘপথ ভ্রমণের উপোযোগী হোতে হবে। পরিপূর্ণ নীরবতা এবং বিশ্রাম ছাড়া আমার কোনো উপায় ছিলোনা। ধরেই নিলাম জয়নাল চাচার সাথে দেখা করার একান্ত ইচ্ছে স্বত্তেও এবার হবেনা। আর তো সময়ও নেই। আমাকে আর সময়াভাবে পেরেশান হোতে হয়নি এবং মানসিকভাবে কষ্ট করতে হয়নি। তিনিই সহসা আমার সামনে হাজির। যখোন কানের গোড়ায় ফিসফিসানি শুনলাম জয়নাল চাচা এসেছেন, তখোন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম মরতে রাজি কিন্তু উনার সাথে যেনো আমার বিন্দুমাত্র বেয়াদবি না হয়। লাঠি ভর দিয়ে কোমর ক্যুঁজো করে ঢিক ঢিক করতে করতে সালাম দিয়ে তিনি আমার বিছানার পাশে হাজির। এ যেনো আল্লাহর এক অলৌকিক ব্যবস্থা। ঈদের দিনের চরম অসুস্থতার বিনিময় আল্লাহ আমাকে এভাবে দিলেন।
আমি আবেগ আপ্লুত হোয়ে সম্মান দেখানোর জন্য একটু মাথা উঁচু করে উঠার ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। আমার অবস্থা বুঝতে পেরে তিনি নিজ হাতে আমার মাথাটা মৃদু বল প্রয়োগ করে বালিশে শুইয়ে দিয়ে আমার বালিশের পাশেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। বাড়িতে মানুষ গিজগিজ করছে। আমার স্ত্রী অন্যান্যদের মতো ঈদের দিনের স্বাভাবিক ব্যস্ততায় বেষ্টিত। মাঝে মধ্যে আমার কাছে এসে খোঁজ খবর নিয়ে যাচ্ছে। তার একটা বাড়তি দায়িত্ব ছিলো সার্বক্ষণিক পাহারা দেয়া যাতে কেউ হঠাৎ না বলে না কয়ে দরজা খুলে ঢুকে আমার বিশ্রামে ব্যাঘাত না ঘটায়। জয়নাল চাচার ঢোকার সাথে সাথে আমার স্ত্রী হাজির। লম্বা পাকা দাঁড়ি, মাথাটা টুপি ও হাজীরুমালে ঢাকা এই অপরিচিত বৃদ্ধের এভাবে অনুপ্রবেশে প্রথমে আমার স্ত্রী হয়তো বিছুটা বিরক্ত বোধ করেছে। কিন্তু এমন এক ফেরেস্তাতূল্য অশীতিপর বৃদ্ধকে কিছু বলার সাহস তার নেই। সে নির্বাক আমার দিয়ে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জয়নাল চাচা জিজ্ঞেস করলেন, এই মা টা কিডা (কে) গো? আমি বললাম, চাচা এই হোচ্ছে আপনার বেটার বউ (বউমা)। আর যাবে কোথায়, চাচা তো মহা পেরেশান বউমার সম্মানে। কি না কি করবেন কুল কিনারা খুজে পাচ্ছেননা। আমার স্ত্রীর তখোনো ঘোর কাটেনি, বেশ অস্বস্তি বোধ করছে সে। আমি তাকে বললাম, এই দেখো, ইনি জয়নাল চাচা। আমার সেই ছোটোবেলার প্রিয় জয়নাল চাচা। আমার ইতোপূর্বের লেখাটা পড়ার পর থেকে জয়নাল চাচার প্রতি আমার স্ত্রীর আগ্রহ আমার আগ্রহকে হার মানিয়েছে। এমন এক মহা গুণধর ব্যক্তি কিনা আজ বিনা নোটিশে সামনে হাজির! সে স্বপ্ন দেখছে না তো! এ জাতীয় নিরক্ষর গন্ড মূর্খ অথচ অলৌকিক প্রতিভার যশে খ্যাত ব্যক্তির সাথে এই তার প্রথম সাক্ষাত। সে ঈদের দিনের যাবতীয় মিষ্টি মিঠায় আর অকৃত্রিম সেবা যত্নে কয়েক মিনিটের মধ্যেই চাচার কবি মনকে জয় করে নিলো।
জয়নাল চাচা আবেগে উচ্ছ্বাসে দুই হাত উপরে তুললেন। তাঁর মুখ দিয়ে ছন্দ কবিতার বান বের হোচ্ছে। চোখের পানিতে চোয়াল ভিজে যাচ্ছে। তিনি মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করছেন। দোয়া করছেন আমার সুস্থতার জন্য, আমার এবং আমার স্ত্রী সন্তানদের সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য। বার্ধক্যজনিত কারণে চাচার মুখের শব্দগুলো অধিকাংশই আমার স্ত্রীর কাছে অস্পষ্ট মনে হোচ্ছে, কিন্তু সে ভাষা বুঝার চেয়ে ছন্দে বিমুগ্ধ। কি করে এভাবে অনর্গল ছন্দে ছন্দে সব কথা বলা সম্ভব? এ যেনো এক জাদুকরি শক্তি। সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছে আর তড়িঘড়ি করে মোবাইলের ক্যামেরা অন করে চাচাকে রেকর্ড করছে। স্বল্প সময়ে অপরিকল্পিতভাবে ধারণকৃত ভিডিও চিত্রের কিছু অংশ যা আমার ফেইসবুকে যুক্ত করা হোয়েছে তার দুইটি লিংক এখানে সম্মানিত পাঠকদের দেখার সুবিধার্থে কপি করছি।
আজ জয়নাল চাচাকে স্মরণ করে বুকের ভিতর রক্ত ক্ষরণের মতো এক ধরণের ব্যথার খোঁচা অনুভব করছি। কে জানে আমার জয়নাল চাচার অক্ষর জ্ঞান থাকলে তিনিও হয়তো একজন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কিংবা আরো বড়ো কিছু হতে পারতেন। নিভৃত এক পল্লীর অনুন্নত গ্রামে পড়ে থাকার অপরাধে তার কাছে কোনদিন কোন কবি, সাহিত্যিক, সংবাদকর্মী বা ইলেক্ট্রনিক মেডিয়ার লোকও পৌঁছাননি। তাই আমরা তার কতো অজানা, অব্যক্ত অথবা ব্যক্ত কিন্তু অলিখিত অভিজ্ঞতার সম্ভার থেকে বঞ্চিত।
(আগের লেখাটি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুনঃ http://www.sonarbangladesh.com/article.php?ID=1312) |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/WohidSader |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
অহিদ ছাদেরের জন্ম যশোরের চৌগাছা উপজেলার মাঠ চাকলা গ্রামে। বাপ-মায়ের নয় সন্তানের মাঝে তিনি পঞ্চম। একাডেমিক জীবনে তিনি জাতীয় পর্যায়ের সকল পরীক্ষায় শীর্ষ স্থান দখল করে মালয়েশিয়া সরকারের বৃত্তি নিয়ে সেদেশের International Islamic University Malaysia (IIUM) তে আইনে অনার্স (LLB) এবং তুলনামুলক আইনে মার্স্টারস (Master of Comparative Laws) ডিগ্রী অর্জন করেন। পরে তিনি আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় (Harvard University) থেকে কর্পোরেট ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইনে আরেকটি মার্স্টারস (LLM) ডিগ্রী লাভ করেন।
কর্মজীবনে অহিদ ছাদের শুরুতে নিউ ইয়র্কে একটা ল ফার্মে কাজের পাশাপাশি নর্থ আমেরিকার জনপ্রিয় মুসলিম সংগঠন ICNA কর্তৃক প্রকাশিত জার্নাল The MESSAGE International এর Editor-in-Chief হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (IDB) এর জেদ্দাস্থ হেডকোয়ার্টারে Legal Officer (আইন কর্মকর্তা) হিসেবে কাজ করেন। এছাড়া তিনি বাহরাইনে অবস্থিত একটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক (United International Bank) এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং হেড অফ লিগ্যাল এ্যান্ড কমপ্লায়েন্স পদে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি কাতার সরকারের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান Qatar Investment Authority তে আইন উপদেস্টা (Legal Counsel) হিসেবে দায়িত্বরত।
প্রবাস জীবনে তিনি বাংলাদেশের গ্রাম্য হতদরিদ্র মানুষের দূঃখ-কষ্ট লাঘব ও জীনব যাপনের মানোন্নয়নের জন্য বিভিন্ন সেবা ও উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পছন্দ করেন। ইমেইল, chowgachha@gmail.com। |
|