|
মিথ্যার প্রভাব
এ. বি. এম. ইয়াকুব আলী সিদ্দিকী |
|
মিথ্যা। মিথ্যা আবার কি? সত্য নয়। মিথ্যা কে বলে মিথ্যাবাদী। মিথ্যা কেন বলা হয়? উত্তর হল – কার্যোদ্ধারের জন্য। মিথ্যা ছাড়া কি কার্যোদ্ধার হয় না? – হয়, তবে দেরীতে। মিথ্যা ফৌজদারী আর সত্য আদালত। অর্থাৎ মিথ্যা ব্যবহার করলে যত তাড়াতাড়ি কাজ সমাধা হয়, সত্য দিয়ে তা হয় না। কাজেই মিথ্যা এ্যালোপ্যাথিক ঔষধ আর সত্য হোমিওপ্যাথিক। অনেক সময় সত্য দিয়ে কার্যোদ্ধার হয় না, মিথ্যা দিয়ে অতি সহজেই হয়। প্রয়োগ কৌশলে মিথ্যা সত্যের চেয়ে অধিক কার্যকরী হয় এবং শিগগীরই ফল লাভ সম্ভব হয়। সত্যের মাথা ন্যাড়া। কারণ তার তেলের একান্ত অভাব – তেল সংগ্রহ করাও তার পক্ষে দুঃসাধ্য। সে জন্য সে অন্যকেও তেল দিতে পারে না বলে তার সমূহ বিপদ। অপর দিকে মিথ্যার মাথা তৈলাক্ত- সে সহজে তেল সংগ্রহ করতে পারে এবং প্রবল বাধা থেকেও সে সহজে পিছলে পড়তে পারে। তাই সত্যবাদী যেখানে মার খায়, অপদস্ত হয়, মিথ্যাবাদী সেখানে বাহাদুরী দেখায়। সত্যবাদী ঘৃণ্য- মিথ্যাবাদী বরেণ্য।
এটা মিথ্যারই রাজত্ব। তাই বলে আমি রাজদ্রোহী বা দেশদ্রোহী নই এবং তা হওয়াও আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি যা বলছি সবই ‘মিথ্যা’। আমি নিজেই মিথ্যাবাদী। তাই বলে এই নয় যে, আমি সত্যি মিথ্যা কথা বলছি। আমি নিজে মিথ্যাবাদী হতে পারি, কিন্তু আমি যা পরিবেশন করছি, তা সবই সত্য কথা। হরপ্রাসাদ শাস্ত্রী বলেছেন, ‘তৈল দ্বারা যত কাজ হয়, অন্য কিছুতে তা নয়’। কিন্তু কেউ কি বলতে পারে যে তৈল কোথায় পাওয়া যায়? সে তেলের উৎপন্ন এই মিথ্যা নামক ঘানী থেকেই।
মিথ্যা স্তোত বাক্যে বশীভুত করে যে কোনো লোকের নিকট থেকে যে কোনো কাজ উদ্ধার করা যায়। মিথ্যা আশায় সূর্যের চারিদিকে ঘুরছে অবিরাম এ পৃথিবী- যুগ যুগান্ত থেকে প্রদক্ষিণ করছে চাঁদ পৃথিবীকে। লাভের কি কিছু সম্ভাবনা আছে বা হয়েছে? না। তবু ঘুরছে। আশায় আশায় ঘুরতে ঘুরতে এমন অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে যে, সে অভ্যাস আর ত্যাগ করতে পারছে না এখনও। তাই এ কথা সত্য যে, মিথ্যাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে সারাটি জগত সৃষ্টিলগ্ন থেকে।
যে সমস্ত গল্প কাহিনী রচিত হয়েছে সব কিছু এই মিথ্যাকে আশ্রয় করেই। মিথ্যার শক্তি প্রখর, আর সত্যের শক্তি স্তিমিত। তাই সত্যের জ্যোতি দিনে দিনে নিষ্প্রভ হতে চলেছে এবং সেখানে মিথ্যার দীপ দাউ দাউ করে জ্বলে উঠছে তার পূর্ণ দীপ্তি নিয়ে।
মিথ্যা মুখরোচক। সবার মন আকৃষ্ট করবার ক্ষমতা এর আছে। সবাইকে পূর্ণ আনন্দ দেয়ার ক্ষমতাও এর রয়েছে। কিন্তু সত্য নিরস, কর্কশ– সবার কাণে যেন বিষের মত লাগে। চাটুকারের চাটুকারিতা আমরা সহজেই বিমোহিত হই-যতই শুনি শোনার আকাঙ্খা ক্রমেই বেড়ে চলে-মার্শালের ক্রমহ্রাস বিধি এখানে খাটে না। কিন্তু সত্য না কথায় রস নেই বলে স্বল্প সময়েই আমরা বিষিয়ে উঠি- মন বসে না, আনন্দ দিতে পারে না বলে। আরব্য উপন্যাস পড়ে যত আনন্দ মেলে ধর্মগ্রন্থ পড়ে তার সিকিও নয়। ধর্মগ্রন্থে আছে পারলৌকিক একঘেঁয়ে আশা-নিরাশার কথা, অন্যদিকে উপন্যাসে আছে ইহলৌকিক বাস্তব জগতের আনন্দ উল্লাস ও পাওয়া না পাওয়ার বেদনার কথা। আমার মনে হয়, মানুষ বাস্তবকে যতটা ভালবাসে পরকালকে ততটা নয়। এজন্যই বোধ হয় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ স্বর্গের অমৃতের চেয়ে মর্তের ধূলি, তৃণ, গুল্মকেই ভালবেসেছিলেন বেশী করে। মানুষ রস সন্ধানী- রহস্যের দ্বারের ভিখারী। তাই মিথ্যাকে মিথ্যা জেনেও তা ত্যাগ করতে পারে না– আরও আলিঙ্গন পাশে আবদ্ধ করে। অন্যদিকে মানুষ সুযোগ সন্ধানী- বড় হওয়া তার স্বভাবজাত ধর্ম। কিন্তু অন্যকে বশ না করে বড় হওয়া যায় না। আবার অন্যকে বশ করতে গেলে মিথ্যা স্তোত বাক্য দ্বারা তাকে নিজের চাইতেও বেশী বড় করে তুলে ধরতে হবে- যাতে সে তার প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং তার প্রার্থনা মঞ্জুর করে। স্তোত বাক্য ছাড়া কারো সর্বনাশ করা যায় না। যদিও করা যায় তাতে বিপদের সম্ভাবনা থাকে ও কষ্ট পেতে হয়।
টাকা দিয়ে যে কাজ হবে না, মিথ্যা দিয়ে তার চাইতে বেশী কাজ হয়। শুধু কথায় চিড়া ভিজে না একথাও সত্য। তবু দেখা যায় সমাজের নিম্ন ম্তর থেকে অফিস-আদালত পর্যন্ত মিথ্যা প্রশংসা এবং তাতে কাজও ত্বরান্বিত হয়। বড় লোক হতে হলে অন্যকে ধোকা দেয়া শিখতে হবে। শত মুখে মিথ্যা দ্বারা নিজেকে সত্যবাদী করে তুলতে হবে নচেৎ কেউই তাকে বিশ্বাস করবে না। কারণ মিথ্যাবাদীকে কেউ বিশ্বাস করে না। তাই বলে এ কথা সত্য নয় যে, যাঁরা বড় লোক আছেন বা হচ্ছেন তারা সবাই ধোকা দিয়ে হয়েছেন বা হচ্ছেন।
কারো সাথে ঝগড়া বা কলহ বাধাতে চাইলেও মিথ্যার প্রয়োজন। কাউকে জব্দ বা অপমান করতে হলে এর আবশ্যকতা অনস্বীকার্য। সত্যবাদীকে অপদস্ত করতে এর ক্ষমতা যথেষ্ট। মিথ্যা না থাকলে পৃথিবীতে ঝগড়াবিবাদ থাকতো কিনা এতে সন্দেহের অবকাশ আছে। মিথ্যার ক্ষমতা বৈদ্যুতিক শক্তির চাইতেও বেশী। কোন মহাপুরুষ বলেছেন, একটি মিথ্য কথা একশ’বার বললে সেটা সত্যে পরিণত হয় এবং একটি জ্বলন্ত বাস্তব সত্যকে একশ’বার মিথ্যা বললে তা মিথ্যায় পর্যবসিত হয়। এখানেও অনুমিত হয় যে, মিথ্যার ক্ষমতা অপরিমেয়। অনেক সময় সৌজন্যের খাতিরে মিথ্যা ভাণ করে পরিস্থিতি অনুসারে শোক বা আনন্দ প্রকাশ করতে হয়। এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ রাষ্ট্রীয় ব্যাপার। কারো উপর কাজের বাহাদুরী দেখানোর প্রকৃষ্ট উপায় এই মিথ্যা। মিথ্যা রটনা, মিথ্যা গালি, মিথ্যা অপবাদ, মিথ্যা লাঞ্ছনায় সমাজ ভরপুর। দূর্বলের উপর সবলের মিথ্যা অভিযোগ গ্রামবাংলায় বিরল নয়। মিথ্যাচারটাও বোধ হয় আধুনিক সভ্যতার একটি বিশিষ্ট অঙ্গ। কাল যাকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলাতে যাচ্ছি, আজও তাকে মিথ্যা ভাণ করে বন্ধু বলে পরিচয় দিয়ে এক থালিতে বসে খাচ্ছি।
শেক্সপীয়রের ‘ম্যাকবেথ’-এ দেখতে পাই ম্যাকবেথ রাজ্যের লোভে রাজা ডানকানকে নিমন্ত্রণ করে এনে রাতে গলায় কৃপাণ বসিয়ে দিয়েছে। মীর মোশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ সিন্ধু’তেও এর প্রমাণ মেলে। আব্দুল্লাহ বিন জেয়াদ এজিদের টাকার লোভে মহাবীর হোসেন (রাঃ) মিথ্যা পত্র লিখে কারবালায় এনে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। সিরাজ সেনাপতি মীরজাফর মিথ্যা অজুহাতে যুদ্ধ না করে বাংলার স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়েছে পলাশীর আম্র কাননে। মিথ্যার যে এত তেলেসমাতি ক্ষমতা অতীত ইতিহাস এর জ্বলন্ত প্রমাণ। আমার মনে হয় মিথ্যাকে কেন্দ্র করেই রচিত হয়েছে ইতিহাস। সূর্য ছাড়া যেমন দিন হতে পারে না, তেমনি মিথ্যা ব্যতিত ইতিহাস রচিত হতে পারে না।
ব্যাপক অর্থে মানুষের আশাই মিথ্যা। মিথ্যা আশা মানুষ পোষণ করে- যা পূরণ করা যাবে না, তাও। কথায় বলে মানুষের আশার শেষ নেই। এই অফুরন্ত আশা নিয়ে মানুষ ধর্মে আবদ্ধ হয়। আশা পূরণ কদাচিৎ যদিও হয় যদি সে পৃথিবী জয় করতে সমর্থ হয়, তবু মৃত্যুকে সে জয় করতে পারছে না বলে সুখী নয়। কারণ তার জীবনটা মৃত্যু দ্বারা সীমাবদ্ধ। সে মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পেতে পারে না। যেদিন সে বুঝতে পারে মিথ্যা আশা সে পোষণ করেছিল, তখন সে বাকী আশাটুকু মৃত্যুর কোলে ছেড়ে দিয়ে নিজেও তাতে আশ্রয় নেয়। তবে একথা সত্য যে, মৃত্যু জীবনকে আলিঙ্গন না করলে জীবনটা এমন মধুর হত না।
যাক সে কথা। শুনতে যদি কারো আপত্তি না থাকে সমাজে নিরীহ ব্যক্তির ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে কিভাবে তাকে অপদস্ত করা যায় এখানে এমনি একটা বাস্তব ঘটনার অবতারণা করছি। ‘কোন এক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক সেবার নামে, শোষণ চালিয়ে যাচ্ছিল। কতিপয় স্থানীয় শিক্ষিত জনসাধারণের তাতে সইল না। তারা যথাস্থানে একখানা দরখাস্ত হাঁকিয়ে দিল। কিন্তু উপরোক্ত পৃষ্ঠপোষক একজন নিরীহ লোককে এর মধ্যে জড়িয়ে বসল এবং তাকে অপদস্ত করতেও কসুর করল না। পরিশেষে দেখা গেল সে এর মধ্যে মোটেই জড়িত নয়’। এমন ঘটনা গ্রামবাংলায় নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। আমার মতে এ শুধু আমার মতে হবে কেন, সবার মতেই মিথ্যার প্রধান উৎস আদালত। আমার ধারণা এক আদালতে বা এজলাসে যত মিথ্যার অবতারণা হয় সারা পৃথিবীর মিথ্যা জড় করলেও বোধ করি অত হবে না।
যুদ্ধের সময়তো মিথ্যার ছড়াছড়ি। জনমত স্বপক্ষে আনবার জন্য মিথ্যার কি সুকৌশল ব্যবহার! প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন বিশ্ব জনমত স্বপক্ষে আনার জন্য স্বগর্বে ঘোষণা করেছিলেন যে, এ যুদ্ধে মিত্রশক্তির জন্য হলে, পৃথিবী হতে উপনিবেশনবাদ চিরদিনের মত দূরীভূত হবে। কিন্তু তা কি হয়েছিল? যুদ্ধে মিত্রপক্ষের জয় হলে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া প্রভৃতি বিজয়ী শক্তিগুলো ভাগাভাগি করে নিয়েছিল বিজিত রাষ্ট্রগুলোকে এবং তারই পরিণতি ঘটানোর জন্য আবর্তিত হতে হয়েছিল হিটলার ও মুসোলিনীকে। কিন্তু তবু কি মিথ্যার প্রবাহে কোন ভাটা পড়েছে?
যুগে যুগে সভ্যতার উৎকর্ষের সাথে সাথে মিথ্যার উৎকর্ষ সাধিত হচ্ছে তালে তালে। সত্যের কি কোনো উন্নতি হচ্ছে? আগেকার দিনে মিথ্যাকে মিথ্যা বলা হত, কিন্তু সে মিথ্যাকে মানুষ ঘৃণা করতে শিখেছে বলে তার নাম আধুনিকীকরণ করা হয়েছে। মিথ্যার বর্তমান নাম অসত্য বা গুল। আজকের যুবকদের মতে মিথ্যা বলায় দোষ আছে, কিন্তু অসত্য বা গুল দোষমুক্ত- নির্দোষ। এ গুলের উৎপত্তিস্থল যথাসম্ভব খ্রীষ্টানদের এপ্রিল ফুল। আমরা অনুকরণপ্রিয় বলে আমরাও এটাকে গ্রহণ করেছি- কিন্তু বিকৃতভাবে। খ্রীষ্টানরা ব্যবহার করে বছরে একদিন আর আমাদের ব্যবহার প্রাত্যহিক জীবনে।
মিথ্যার উৎকর্ষ যতই হোক আমরা ক্ষমতা যতই থাকুক তা মানুষের মন জয় করতে পারে না। মিথ্যা মুখরোচক হলেও শান্তিদায়ক নয়। মিথ্যা দিতে পারে সাময়িক শক্তি কিন্তু সত্য দিতে পারে চিরন্তন শান্তি। মিথ্যার স্থান মুখে কার্যোদ্ধারের নিমিত্ত আর সত্যের স্থান প্রাণের গভীরে- তৃপ্তি লাভের নিমিত্ত। মিথ্যার কার্যোদ্ধার হলেও তা মনকে পীড়ণ করে-সারা জীবন অনুশোচনায় ভরে তুলে। মিথ্যার জয় ক্ষণস্থায়ী আর সত্যের জয় চিরস্থায়ী। মিত্রপক্ষ মিথ্যা প্রচার করে জয়ী হয়ে উপনিবেশ লাভ করলেও তা আটকিয়ে রাখতে পারেনি- বরং এখন কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। আমার বিশ্বাস, এমন একদিন আসবে হয়তো সেদিন খুব দূরে নয় যেদিন পৃথিবী থেকে মিথ্যার প্রলয় ঘটবে সত্যের পূর্ণ দীপ্তি জ্বলে উঠবে সবার ঘরে ঘরে।
লেখকঃ প্রাক্তন শিক্ষক, সাঁথিয়া, পাবনা |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/YakubAliSiddiquee |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| লেখকঃ প্রাক্তন শিক্ষক, সাঁথিয়া, পাবনা |
|
আপনি ভাল থাকুন। নিয়মিত লিখুন আর আমাদের জন্য দোয়া করুন।