১৯৬৯ এর ১৮ই ফেব্রুয়ারী -- আজ থেকে ৪০ বৎসর আগে । সেসময়ের ২০ বছরের তরুণের মনে এই তারিখটি অম্লান, চিরভাস্বর । এই দিনেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডঃ শামসুজ্জোহা শহীদ হন ।
দিনটির কথা আজও স্মৃতিতে ধরা আছে স্বচ্ছ ছবির মত । এতে কোন দাগ পড়েনি । পলাশ-শিমূল ফোটা ফাল্গুন মাস । মহান একুশে ফেব্রুয়ারীর মাত্র তিনদিন আগেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জংগী শাহীর মরণ কামড়ে ঝরে পড়লেন প্রাণোচ্ছ্বল, সকলের প্রিয় ‘জোহাস্যার’ ।
৬৯ এর প্রারম্ভেই তৎকালীন পূর্বপাকিস্তôান জুড়ে সামরিক একনায়ক আয়ুব খানের বিরুদ্ধে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল । ২০শে জানুয়ারী ঢাকায় আসাদুজ্জামানের শহীদ হওয়ার পর থেকেই সারাদেশ বিwেভে ফেটে পড়েছিল । তীব্র গণআন্দোলনের মুখে সামরিক একনায়ক সরকারের নাভিশ্বাস উঠেছিল । আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সার্জেন্ট জহুরুল হককে ১৫ই ফেব্রুয়ারী ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে গুলি করে হত্যা করা হয় । এখবর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছানোর পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা বন্ধ হয়ে যায় । স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল আর প্রতিবাদ সভায় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা হয়ে উঠে এক ইস্পাতদৃঢ় শপথের জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি । ১৭ই ফেব্রুয়ারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশের লাঠিচার্জে বেশ কিছু ছাত্র আহত হয় । ডঃ জোহা ছিলেন সেই মিছিলের অগ্রভাগে । তিনি সবসময়েই সজাগ ছিলেন যেন তাঁর প্রিয় ছাত্রছাত্রীবৃন্দ বেপরোয়া হয়ে না ওঠে । এতদসত্ত্বেও বিনা উস্কানীতে মিছিলে লাঠিচার্জে কিছু ছাত্রের আহত হওয়া তাঁর স্নেহকোমল ও দায়িত্বশীল মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে । এমনকি ১৭ই ফেব্রুয়ারী মিছিলে লাঠিচার্জের সময় তিনি নিজে ছাত্রদের হয়ে পুলিশের সংগে কথা বলেছিলেন । তাঁর বক্তব্য ছিল -- ‘আমার ছেলেরা তো শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করে তাদের মনোভাব প্রকাশ করছে । এব্যাপারেও কেন তোমাদের আপত্তি ।’ জনৈক ছাত্রের উপর লাঠিচার্জের সময় তিনি নিজে ঢাল হয়ে দাঁড়ান । ছাত্রটির মাথা ফেটে রক্ত পড়ছিল । তিনি নিজে তার মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধে দেন নিজের জামার একাংশ ছিঁড়ে । সেই জামায় ছাত্রটির রক্তের দাগও লেগেছিল ।
১৭ই ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিরারের পাদদেশে এক প্রতিবাদসভায় শহীদ জোহা বলেছিলেন-- ‘আমি ধন্য ! যে ছাত্রের পবিত্র রক্তে আমার জামাটি রঞ্জিত হয়েছে আমি তা যত্নকরে রেখে দিব । অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে যেয়ে যে রক্তদান তা কখনও বৃথা যায় না ।’ তিনি সেই রক্ত রঞ্জিত জামাও সভার সকলকে দেখিয়েছিলেন । বলেছিলেন আমি গৌরববোধ করি এই রক্তরঞ্জিত জামার জন্য । পরদিন অর্থাৎ ১৮ই ফেব্রুয়ারীর কর্মসূচী ছিল ১৪৪ ধারা সরাসরি অমান্য না করে ৩ জন ৩ জন করে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে নীরব প্রতিবাদ মিছিল বের করা হবে ।
১৮ই ফেব্রুয়ারী আগুন ঝরা ফাগুন । সেদিন সকাল থেকেই ফাল্গুনী বাতাস বইছিলো । বেলা ১০টার দিকে প্রায় সব ছাত্রছাত্রীই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে সমবেত হয়েছিল ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দখিণই সুপ্রশস্ত নাটোর রোড । এছাড়া প্রধান ফটকের ঠিক বিপরীত দিকেই সড়কের অপর পার্শ্বে তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানের ট্রান্সমিটার ভবন । ছাত্ররা সব সারিবদ্ধভাবে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার মধ্যে দন্ডায়মান । ৩ জন ৩ জন করে নাটোর রোড ধরে রাজশাহী শহরের দিকে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে । বিপরীত দিকে রেডিও পাকিস্তানের ভবনের সামনে পুলিশ ও একজন সামরিকবাহিনীর লেফ্টেন্যান্ট দন্ডায়মান । সংগে একজন ম্যাজিস্ট্রেট । রাস্তার পাশে খাড়িতে কিছু শুকনো বাঁশঝাড় ছিল । সেখানে একজন ছাত্র হঠাৎ করেই আগুন ধরিয়ে দিল । অন্য কোন হঠকারিতা বা কিছুই নয় । কিন্তু পাঞ্জাবী লেফ্টেন্যান্ট এটাকে ধৃষ্টতা গন্য করে ম্যাজিস্ট্রেট কে বাধ্য করে নিরস্ত্র ছাত্রদের মিছিলে গুলি করার আদেশ দানে । এই পরিস্থিতিতে ডঃ শামসুজ্জোহা, ইতিহাস বিভাগের মরহুম কছিমউদ্দিন মোল্লা এবং বাংলাবিভাগের আব্দুল খালেক দুহাত উর্ধ্বে তুলে পুলিশের দিকে এগুতে থাকেন । এছাড়া ওই অবস্থাতেই ডঃ জোহা ছাত্রদের রাস্তôা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতিহার চত্ত্বরে ঢোকার জন্য বার বার বলতে থাকেন । গুলীর পূর্বমূহুর্তে ডঃ জোহা চিৎকার করে ইংরেজীতে বলছিলেন-- ‘please don’t shoot my students. They are like my sons. I want to talk with’ কিন্তু প্তি লেফ্টেন্যান্ট এতে আরো ক্রোধান্বিত হয়ে নিরস্ত্র ৩ শিকের দিকে গুলি ছুঁড়তে যায় । তাঁরা আত্মরার্তে মাটিতে শুয়ে পড়েন । গুলি ছোঁড়া হয় । অবশ্য গুলি ল্যভ্রষ্ট হয় । এবার লেফ্টেন্যান্ট নিজে এগিয়ে এসে শায়িত তিন শিককে পদাঘাত করে । এরপর ডঃ জোহাকে উল্টিয়ে দিয়ে অশ্লীল গালি দিয়ে বেয়নেট চার্জ করে । ডঃ জোহা মৃত্যুযন্ত্রণায় সেখানে পানি পানি বলে কাতরাতে থাকেন । এরপর অবশ্য সেই লেফ্টেন্যান্ট ও পুলিশবাহিনী ছাত্রদের গুলি করার ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত হয় । এখবর পাওয়ার পর তৎকালীন উপাচার্য প্রফেসর শামস-উল-হক নিজে হেঁটে ঘটনাস্থলে যান । তাঁকে দেখে অবশ্য সেই লেফ্টেন্যান্ট কিছুটা ধাতস্থ হয় এবং ডঃ জোহাকে তুলে নিয়ে শহরের দিকে যেতে থাকে । তখন বেলা ১১ঃ৩০ মিনিটের মতো । পথে তারা গুলি চালিয়ে রাজশাহী সিটি কলেজের ছাত্র নুরুল ইসলামকে হত্যা করে । হাসপাতালে অতিরিক্ত রক্তরণে ডঃ জোহা শাহাদাত বরণ করেন । তখন সময় দুপুর প্রায় ১টা । দুপুর ২টা থেকে রাজশাহী শহর ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সান্ধ্যআইন জারি করা হয় ।
ডঃ জোহার শাহাদাত বরণের খবর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পোঁছার পর সারা ক্যাম্পাসে শোকের মাতম শুরু হয়ে যায় । বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকায় (এস·এম· হলের দËিন ও তৎকালীন জিন্নাহ হলের পূর্বদিকে) জোহাস্যারের বাসায় সবাই সমবেত হয় । তাঁর একমাত্র কন্যা তখন ৩ বছরের শিশু । সবাই সেই অবুঝ শিশুর দিকে তাকিয়ে অশ্রু সংবরণে ব্যর্থ হয় । ভাবী অর্থাৎ মিসেস জোহা তখন সংজ্ঞাহারা ।
পরদিন ১৯শে ফেব্রুয়ারী সকালে বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে সকলের প্রিয় জোহাস্যারের নামাজে জানাযা শেষে প্রশাসনিকভবনের সামনে গোলচত্বরে ইউক্যালিপট্যাস গাছের ছায়ায় তাঁকে সমাহিত করা হয় । তিনি আজ ৪০ বছর ধরে সেখানে শায়িত । ডঃ জোহার ত্যাগ, আদর্শ বৃথা যায়নি । তাঁর এই আত্মত্যাগের পর দু’বছরের মধ্যে স্বাধীনতা ঘোষণা ও কাঙ্তি বিজয় লাভ । পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশের অভ্যুদয় । ২৪ বছরের শাসন, শোষণ শেষে বাংগালী জাতি ফিরে পেল নিজেদের পরিচয় --নিজেদের মর্যাদা ।
আজ জোহাস্যার ঘুমিয়ে আছেন ৪০ বছর ধরে । কিন্তু যে ত্যাগ তিনি করে গেছেন-- মানুষের জন্য এক শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থার, অন্যায়ের কাছে নতি স্বীকার না করার, সবার উর্ধে মানুষ সত্য -- এসব কি বাস্তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি !
না বাস্তôবে কিন্তু প্রায় সবËেত্রই এর বিপরীত পরিলতি হচ্ছে । জন্মভূমি, মাতৃভূমি বাংলাদেশে তো নয়ই -- এমনকি খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও তা দেখতে পাচ্ছি না । তবে আশা করবো অন্তôতঃপ েবাংলাদেশে আমার প্রিয় মাতৃভূমিতে এসব বাস্তôবায়িত হবে । তাহলেই তা হবে প্রকৃত ‘সোনার বাংলা’ ।
আজ শহীদ জোহার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি সুদূর আমেরিকা থেকে । আমি নিজে তাঁর প্রত্যছাত্র না হলেও গৌরববোধ করি সেসময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসাবে এবং তাঁর পরোছাত্র হিসাবে । আমিন !
লেখকঃ প্রবাসী, ফ্লোরিডা, যুক্তরাষ্ট্র, ই-মেইল, shati851@aol.com