বুধবার, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ৩০ মে ২০১২; দুপুর ০১:০৩ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

প্রস্তাবিত অর্থ ঋণ আদালত আইন ২০১০: একটি পর্যালোচনা

জিয়া হাবীব আহসান

বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ-এ অর্থঋণ আদালত (সংশোধন) বিল ২০০৯ পরীক্ষাকরণ সংক্রান্ত আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির রিপোর্টটি সম্প্রতি পড়ে দেখার সুযোগ হয়েছে। উক্ত কমিটির সভাপতি মাননীয় প্রবীণ সাংসদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত কার্যপ্রণালী বিধির ২১১ বিধি অনুযায়ী মহান সংসদে উত্থাপিত হয়েছে যা অর্থঋণ আদালত আইন (সংশোধন) ২০১০ নামে অভিহিত হবে তা পাশের পর। এটি একটি শুভ উদ্যোগ। তবে এ আইনকে শুধু একতরফা ভাবে ঋণ খেলাপীদের টাকা আদায়ের আইন হিসাবে না দেখে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার সুযোগও আদালতকে দিতে হবে। এ সংশোধনীতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। যাতে পক্ষগণের মধ্যে Win Win (উইন উইন) মনোভাব নিয়ে আপোষে বিরোধ নিষ্পত্তি করা যায়। জানা গেছে অর্থঋণ আদালত আইন পাস হওয়ার পর হতে এপর্যন্ত (১৯৮৯-২০০৯) এই আইনের আওতায় সর্বমোট ১,০৪,৮৩২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, তম্মধ্যে ৬৭,৩৩৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এতে সর্বমোট ২৯,৪৫৪ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। এ জটিল আইনটি নানা কারনে সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সংশোধনকালে আইনটির ২/১টি দিক বিশেষ বিবেচনায় আনা প্রয়োজন মনে করে এ আলোচনার অবতারনা করেছি।
একটি ভালো আইনের কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে। এর মধ্যে বাদী ও বিবাদীর অধিকার সংরক্ষনের ব্যবস্থা। এক তরফাভাবে সব কিছু অপর পক্ষের উপর চাপিয়ে দেয়া আইন, ন্যায় বিচার ও মানবাধিকার পরিপন্থী। সুবিচারের দাবী সার্বজনীন। বিচার হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের। বাংলাদেশে অর্থ ঋণ আদালত আইন- নামে স্পেশাল ’ল টি প্রণয়ন করা হয়েছিল ১৯৮৯-৯০ সনে। এর লক্ষ্য ছিল ঋণ খেলাপীদের হাত থেকে জনগনের লুন্ঠিত অর্থ উদ্ধার করা। ব্যাংক ও অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করে রাতারাতি দামী দামী গাড়ী বাড়ীর মালিক হওয়া, রাজনীতিকে কালো টাকার ব্যবহার ইত্যাদি বন্ধ করতে এ আইনের একটি মহৎ উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায় এ-আইনটি শুধুমাত্র ব্যাংক ও অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে ব্যবহৃত। এখানে বিবাদীর মৌলিক মানবাধিকার ক্ষুন্ন হয়েছে। ফলে বিচারের নামে একটি মহড়া চলে মাত্র।

এ-আইনে শুধুমাত্র ব্যাংক ও অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান সমূহ ঋণ আদায়ের জন্য মোকদ্দমা দায়ের করতে পারে। ঋণ গ্রহীতা কোন ব্যক্তি অথবা কোন কোম্পানী এই আইনের বিধান বলে ঋণদাতা ব্যাংক বা অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চুক্তিভঙ্গ জনিত বিষয়ে বা অনিয়ম ও প্রতারনামূলক কর্মকান্ডের প্রতিকার চেয়ে কোন দাবী উত্থাপন করতে পারে না। এজন্যে তাকে (বিবাদীকে) মহামান্য উচ্চ আদালতে রীট বা দেওয়ানী আদালতে ঘোষনার মামলা ইত্যাদি দায়ের করতে হয়। ফলে একদিকে মামলার আধিক্য বাড়ছে অপরদিকে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের কারনে অর্থঋণ আদালতে মামলার দ্রুত বিচার স্থবির হয়ে পড়েছে।

২০০৩ সালে এই আইনটিতে কিছু পরিবর্তন আনা হলেও বাদী ব্যাংকের মামলা যদি আইন দ্বারা বারিত, অচল ও অরক্ষনীয় হয় তা খারিজের কোন ক্ষমতাও বিচারিক আদালতকে প্রদান করা হয়নি। ফলে, ভুক্তভোগীদের ভোগান্তির সীমা- পরিসীমা থাকে না। একটা ভালো আইনে বৈশিষ্ট্য এমন হতে পারে না।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে স্থায়ী কমিটি কর্তৃক সুপারিশকৃত ২০০৩ সালের অর্থঋণ আদালত আইন এর অধিকতর সংশোধন কল্পে আনীত বিল-টিতেও ব্যাংক বা অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে মামলা দায়েরের সুযোগ রাখা হয়নি। যা উক্ত আইনে সংযোজন করা উচিৎ। নইলে আইনটি একতরফা চরিত্রের হবে মাত্র। একই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন আদালতে মামলা চললে ন্যায় বিচার ব্যাহত হবে। একই বিষয়ে একই আদালতে মামলার যুগপৎ শুনানী হলে বিরোধ নিষ্পত্তি সহজ হয়।

প্রস্তাবিত সংশোধনিতে এ.ডি.আর বা বিকল্প পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তির বিধান রাখা হয়েছে যা প্রশংসনীয় তবে এ বিধান বাধ্যতামূলক করা হয়নি। পারিবারিক আইন-আদালতের মতো প্রি-ট্রায়েল এবং পোষ্ট ট্রায়েলের ক্ষেত্রে ADR (বিকল্প বিরোধ পদ্ধতি) কে অর্থঋণ আদালত আইনেও বাধ্যতামূলক করলে সুফল অনেক বেশী পাওয়া যাবে।

ঋণদাতা ব্যাংক বা অর্থায়নী প্রতিষ্ঠান কোন একটা চুক্তি (Contract) -এর মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা কোম্পানীর অনুকূলে ঋণ সরবরাহ করে থাকেন। ঐ ঋণ চুক্তির শর্তাবলী ঋণদাতা ব্যাংক ভঙ্গ করেছে কিনা তা পরীক্ষা/বিবেচনার কোন এখতিয়ার বা ক্ষমতা প্রস্তাবিত সংশোধনীতে নেই। (একজনের গ্যারান্টি ফর্ম অন্য ব্যক্তির ঋনের গ্যারান্টার হিসাবে ব্যবহার করতেও দেখেছি)। আদালতকে বিবাদীর বক্তব্য, যুক্তিতর্ক ও প্রমান এর ভিত্তিতে নিরপরাধ ব্যক্তি বা কোম্পানীকে অব্যাহতি প্রদানের ক্ষমতা না থাকতে সুবিচার প্রতিষ্ঠা হবে না।

জোর জুলুমের ভিত্তিতে শুধু টাকা আদায় করা যাবে। কিন্তু দেশের শিল্পোন্নয়ন মারাত্মভাবে বাধাগ্রস্থ হবে। ব্যাংক কর্তৃক অলিখিত চার্জ হকুমেন্টে ঋণগ্রহীতা ও জামিনদারের স্বাক্ষর গ্রহনের দীর্ঘ দিনের বেড প্র্যাকটিস প্রচলিত আছে। এধরনের বদনামা ঘুচাতে হবে। এ অভ্যাস চিরতরে বন্ধ করে দিতে হবে। ঋণখেলাপী প্রতারনা ও আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে যাতে বের হয়ে যেতে না পারে আইনে সে ব্যবস্থার পাশাপাশি বিনিয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে ও স্বচ্ছতার এবং জওয়াব দিহীতার মুখোমুখী হতে হবে।

ঋণখেলাপী/রুগ্ন শিল্প বিবাদীর কারনে না হয়ে যদি বাদীর কারনে হয়, যেমন- ঋণ চুক্তির শর্তাবলী ঋণদাতা ব্যাংক কর্তৃক ভঙ্গ করলে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ (এ্যাক্ট অব গড), সামঞ্জস্যহীন নীতিমালা, রাজনৈতিক সংকট ইত্যাদি কারনে) তাহলে অর্থঋণ আদালত আইনে বিচারকালে রুগ্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কোন যুক্তি বিবেচনার সুযোগ এ-আইনে কিংবা প্রস্তাবিত সংশোধনীতে নেই। ফলে এক্ষেত্রে ঋণ খেলাপী হওয়ার জন্য দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আইনের হাত থেকে রেহাই পেয়ে যাবে। অর্থাৎ আদালতে বাদী ও বিবাদী উভয়ের জওয়াবদিহীতার ব্যবস্থা থাকতে হবে। নইলে আইনটি ভালো আইন বলা যাবে না।

প্রস্তাবিত সংশোধনীতে পত্রিকার মাধ্যমে সমনজারীর বিধান বিলুপ্ত করায় এবং দেওয়ানী কার্যবিধি আইনের নিয়ম অনুযায়ী “সমন” লটকাইয়া জারীর বিধান থাকায় একতরফা ডিক্রির ক্ষেত্রে ‘বিবাদী’ বা ‘দায়িক’ ডিক্রীকৃত টাকার ১০% দায়েরে মিস কেইচ করতে পারবে একতরফা ডিক্রী রদের জন্য। এরদ্বারা মামলা বিলম্বিত হবে। পত্রিকার মাধ্যমে জারীর বিধান চালু থাকলে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হবে, আইনী জটিলতা এড়ানো সম্ভব হবে। তবে কোন কোন পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি যাবে তা বাদী ব্যাংক নির্ধারন করে আদালতকে অবহিত করার বিধান না থাকলে অখ্যাত পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রচারের নির্দেশের কারনে উক্ত বিজ্ঞপ্তি সর্বসাধারণ অবহিত হতে পারবে না। সুতরাং প্রস্তাবিত সংশোধনীতে উপরোক্ত বিষয় সমুহ বিবেচনায় আনলে অর্থঋণ আদালত আইনটি যুগোপযোগী ও মানসম্মত হবে। নচেৎ এর সুফল থেকে জনগন ও রাষ্ট্র বঞ্চিত হবে। আদালতকে শুধু কালেক্টরের ভূমিকায় অবর্তীন করলে হবে না। ন্যায় বিচারকের ভূমিকায়ও অবর্তীন হতে হবে। এছাড়া ন্যায় বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা আদৌ সম্ভব নয়।

লেখকঃ আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী ও প্রাবন্ধিক।
http://www.sonarbangladesh.com/articles/ZiaHabibAhsan
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ লিখেছেন, ২৮ মার্চ ২০১০; রাত ০৯:৩০
ধন্যবাদ নিবন্ধের জন্য। একজন মানবাধিকার কর্মী হিসেবে বাংলাদেশের বর্তমান মানবাধিকার অবস্থা নিয়ে লেখা চাই।
11598
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy