বুধবার, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ৩০ মে ২০১২; দুপুর ০১:০৭ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

পুরনো কলাম

 
তিতুমীরের সংস্কার আন্দোলন (২৬/১১/২০১১)
ঈদুল আজহার পরিপূর্ণতা (২৯/১০/২০১১)
মান্না ও সালওয়া (২৪/০৯/২০১১)
পথপানে (ছোটগল্প) (০৪/০৯/২০১১)
লালুর জন্য (ছোটগল্প) (১৩/০৮/২০১১)
বৃষ্টিভেজা কান্না (ছোটগল্প) (২৩/০৭/২০১১)
বিজ্ঞান, বিজ্ঞানী ও সৃষ্টিকর্তা-২ (২১/০৫/২০১১)
বিজ্ঞান, বিজ্ঞানী ও সৃষ্টিকর্তা (১৪/০৫/২০১১)
সংস্কৃতির বিজয় (০৭/০৫/২০১১)
বাদশা মিয়া (ছোট গল্প) (১৩/১১/২০১০)
পথের বাঁকে (গল্প) (০৯/১০/২০১০)
রক্ত (ছোট গল্প) (০২/১০/২০১০)
আগের লেখা
285


তিতুমীরের সংস্কার আন্দোলন

জুবায়ের হুসাইন

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে সংঘটিত যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ-দৌলার পরাজয়ের পর ইংরেজরা বাংলার বুকে শোষণের হাতিয়ার নিয়ে চিরস্থায়ীভাবে আসন গেড়ে বসে যায়। আর অস্তমিত হয় বাংলার স্বাধীনতার সূর্য। ইংরেজরা নবাবের আসনে বসিয়ে দেয় কুখ্যাত বিশ্বাসঘাতক মীর জাফরকে। অবশ্য ১৭৬০ সালেই ক্ষমতাচ্যুত হয় সে। মারাত্মক কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়ে ১৭৬৫ সালে এই দেশদ্রোহী মৃত্যুবরণ করে।

মীর জাফর সিংহাসনচ্যুত হবার পর বাংলার শাসক হন মীর কাসিম। তিনি ছিলেন একজন যোগ্য ও দক্ষ শাসক। ইংরেজদের প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে শাসন পরিচালনার জন্য নিজস্ব সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন। তার ন্যায়পরায়ণতার আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে দেয়া বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অধিকার রহিত করেন। ফলে ইংরেজদের সাথে তার সংঘর্ঘ অনিবার্য হয়ে ওঠে। ফলশ্রুতিতে ১৭৬৪ সালের ২৩ অক্টোবর বক্সারের এক অসম যুদ্ধে ইংরেজ বাহিনীর কাছে পরাজিত হন তিনি।

মীর কাসিমের পরাজয়ের পর ইংরেজরা আরও বেশি হিংস্র এবং ক্ষুধার্ত হয়ে উঠল। ক্ষুধা মেটানোর জন্য তারা সমগ্র বাংলাকে নিংড়ে চটকে শোষণ করার পরও নেভেনি সে ক্ষুধার আগুন। এই শোষক ষড়যন্ত্রকারী ইংরেজদের সাথে সেদিন হাত মিলিয়েছিল বাংলার উচ্চবর্ণের হিন্দু এবং জমিদাররা। ইংরেজদের কৃপায় জমিদারি ক্ষমতা লাভ করার পর এই শ্রেণীর হিন্দুরাও অত্যাচারী হয়ে ওঠে। তাদের আসমুদ্র ক্ষুধা মেটাতে তারাও সকল সময়ে বাংলার কৃষক, শ্রমিক, তাঁতী প্রভৃতি শ্রেণীর মানুষকে সাধ্য মতো শোষণ করেছে। একদিকে ইংরেজদের অত্যাচার, অপরদিকে হিন্দু জমিদারদের নিপীড়ন, তার পাশাপাশি নীল কুঠিয়ালদের নির্যাতন- এই ত্রিবিধ শোষণের যাঁতাকলে শোষিত বাংলার মানুষ অতীষ্ঠ হয়ে ওঠে। তাদের শাসন আর শোষণ থেকে মুক্তির জন্য এই বাংলার মাটিতে সংগ্রামের অগ্নিশিখা জ্বলে উঠেছে বারবার। এই সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় এসেছেন মজনু শাহ যিনি ‘ফকির বিদ্রোহের’ মাধ্যমে আমৃত্যু লড়ে গেছেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে। তাঁর এই নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম চলেছিল ১৭৬৪’র পর থেকে একটানা ১৮৩৩-৩৪ সাল পর্যন্ত।

সাইয়েদ আহমদ বেরেলভী, হাজী শরীয়তুল্লাহ, সাইয়েদ নিসার আলী তিতুমীর প্রমুখ এই দুঃসাহসী সংগ্রামী নেতা। আমাদের আলোচ্য বিষয় নিসার আলী তিতুমীর ও তাঁর অগ্নিময় সংগ্রামী আন্দোলন।

চব্বিশ পরগনা জেলার চাঁদপুর গ্রামে ১৭৮২ সালে এই মহানায়কের জন্ম। ছোটকালে তিনি ছিলেন খুব হালকা পাতলা। রোগাটে ও দুর্বলতার কারণে সব সময় রোগ ব্যাধিতে ভুগতেন। পরিবারের সবাই এতে খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েন। কিন্তু তাঁর দাদী কবিরাজের পরামর্শ মত বিভিন্ন গাছের লতাপাতার রস নাতিকে খেতে দেন। নিসার আলী সেই তিতা রস ঢক ঢক করে গিলে ফেলেন। একটুও নাক কুচকান না। ব্যস, দাদী তাঁর নাম দেন ‘তিতামীর’। এই ‘তিতামীর’ থেকেই ‘তিতুমীর’ নামের উৎপত্তি।

সমাজের নানান অসঙ্গতি দেখে স্থির থাকতে পারেননি তিতুমীর। তাইতো আজীবন সংগ্রাম করেছেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে। ইংরেজরা এ কারণে তাঁকে আদৌ ভালো চোখে দেখত না। ফলে তারা বাংলার এই দুঃসাহসী বীর সম্পর্কে অনেক মিথ্যা এবং বানানো কাহিনী লিখেছে। তাঁর পরিবার এবং বংশ নিয়েও মিথ্যার ছলচাতুরি করেছে তারা। তারা চেয়েছে তিতুমীরের জীবনেতিহাসকে কলঙ্কিত করতে। কিন্তু ইংরেজদের এই সব প্রচারণা ঠিক নয়। প্রকৃত সত্য হলো, নিসার আলী তিতুমীর জন্মেছিলেন একটি বিখ্যাত এবং নামকরা বিরাট পরিবারে। বহুদূর পর্যন্ত ছিল সেই সাইয়েদ পরিবারটির সুনাম সুখ্যাতি।

আজ আমাদের মাঝে ইসলামের যে আলোটুকু জ্বলছে তা হচ্ছে সুদূর আরব দেশ থেকে আসা অলি-দরবেশদের অকান্ত প্রচেষ্টার ফসল। তাঁদের মধ্যে বিখ্যাত দু’জন হলেন সাইয়েদ শাহ হাসান রাজী ও সাইয়েদ শাহ জালাল রাজী। সাইয়েদ শাহ আব্বাস আলী এবং সাইয়েদ শাহ শাহাদাত আলী নামের দুইজন সহোদর তাঁদের মুরীদ হন এবং মনে-প্রাণে ইসলামকে ধারণ করে তা প্রচার-প্রসারের জন্য চেষ্টারত থাকেন। সাইয়েদ শাহ শাহাদাত আলীর পুত্র সাইয়েদ শাহ হাশমত আলীর ত্রিশতম অধস্তন সাইয়েদ নিসার আলী তিতুমীর, পিতা সাইয়েদ হাসান আলী ও মাতা আবেদা রোকাইয়া খাতুন। কিন্তু এতো বড় বংশে জন্মগ্রহণ করেও তিতুমীরের মধ্যে এতোটুকু ছিল না বংশের অহংকার। তিনি জানতেন বংশের সুনাম-সুখ্যাতি প্রমাণ করতে হয় কাজ দিয়ে, নিজের আচার-ব্যবহার আর মনুষ্যত্ব দিয়ে। তাইতো তিনি নিজেকে তৈরি করেছিলেন যোগ্য করে।

১৭৮৬ সালে ৪ বছর ৪ মাস ৪ দিন থেকেই তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু। বিখ্যাত শিক্ষক মুনশী মোহাম্মদ লাল মিয়া তাঁকে আরবি, উর্দু ও ফারসি ভাষা শেখাতেন। বাংলার জন্য ছিলেন পতি রাম কমল ভট্টাচার্য।
বিহার শরীফ থেকে আগত নিয়ামতুল্লাহর তত্ত্বাবধানে তিতুমীর কুরআনে হাফেজ ছাড়াও আরবি ব্যাকরণ, ফারায়েজ, হাদিস, দর্শন, তর্কশাস্ত্র, তাসাউফ, আরবি-ফারসি কাব্য ও সাহিত্যে দক্ষ হন।

১৮২৩ সালে ৪১ বছর বয়সে তিতুমীর হজে গমন করেন। আর এখান থেকেই মূলত তাঁর সংগ্রামী জীবনের শুরু। মক্কায় তাঁর সাথে সাক্ষাৎ ঘটে আর এক সংগ্রামী পুরুষ সাইয়েদ আহমদ বেরেলভীর সাথে। বেরেলভী ছিলেন একজন বিখ্যাত ব্যক্তি। তাঁর সান্নিধ্যে আসার পর তিতুমীরের জীবনের মোড় ঘুরে যায়। সাইয়েদ আহমদ বেরেলভী ছিলেন উনিশ শতকের প্রথম দিকে সমগ্র ভারতে ঘটে যাওয়া স্বাধীনতা তথা জিহাদী আন্দোলনের অগ্রনায়ক। তিনি তখনও সংগ্রাম করে যাচ্ছেন মুসলমানদের স্বাধীনতা, ঈমান এবং তাদের অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য। তিতুমীরও যুক্ত হয়ে পড়লেন এই আন্দোলনের সাথে। তিতুমীরের শিক্ষা, যোগ্যতা, আদর্শ ও আচরণে মুগ্ধ বেরেলভী সংস্কার এবং জিহাদী আন্দোলনের নেতৃত্ব তুলে দিলেন তাঁর হাতে।

চার বছর মক্কায় অবস্থানের পর ১৮২৭ সালে দেশে ফিরেই চমকে উঠলেন তিতুমীর। দেশের করুণ অবস্থা আর মানুষের সীমাহীন দুঃখ দুর্দশা ও শোষণ- নিপীড়নের করুণ চিত্র দেখে শিউরে উঠলেন তিনি। আঁতকে উঠলেন ইংরেজ ও অত্যাচারী হিন্দু জমিদারদের পশুসুলভ আচরণে।
লর্ড মেকল বাংলার সেই বীভৎস করুণ চিত্র সম্পর্কে বলেন:

“ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর স্বার্থে নয়, নিজেদের জন্যই কোম্পানীর কর্মচারীরা এদেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ক্ষেত্রে নিজেদের একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। দেশীয় লোকদের তারা দেশীয় উৎপন্ন দ্রব্য অল্প দামে বিক্রি এবং বৃটিশ পণ্যদ্রব্য বেশি দামে ক্রয় করতে বাধ্য করত। কোম্পানীর আশ্রয়ে প্রতিপালিত দেশীয় কর্মচারীরা সমগ্র দেশে সৃষ্টি করেছিল শোষণ ও অত্যাচারের ভয়াবহ বিভীষিকা। কোম্পানীর প্রতিটি কর্মচারী ছিল তার প্রভুর (লর্ড কাইভ) শক্তিতে শক্তিমান আর এই সব প্রভুর শক্তির উৎস ছিল স্বয়ং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী। কলকাতায় ধন-সম্পদের পাহাড় তৈরি হলো। অপরদিকে তিন কোটি মানুষ দুঃখ-দুর্দশার শেষ স্তরে উপনীত হলো। সত্য কথা যে, বাংলার মানুষ শোষণ-উৎপীড়ন সহ্য করতে অভ্যস্ত; কিন্তু এমন ভয়াবহ শোষণ-উৎপীড়ন তারা কোনকালে দেখেনি।”

লর্ড মেকলের এই বক্তব্য থেকে পরিষ্কার হয়ে ওঠে, তখনকার বাংলার করুণ চিত্রটি ছিল কত বড় ভয়াবহ!
ইংরেজদের সর্বগ্রাসী শোষণ-উৎপীড়নে বাংলার কৃষকরা সর্বস্বান্ত হয়ে গেল। তাঁতীরা নিঃস্ব হয়ে ভিক্ষুকে পরিণত হল। ইংরেজদের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে কুঠিয়ালরা কৃষকদেরকে নীল চাষে বাধ্য করল। কেউ নীল চাষ করতে না চাইলে তাকে বন্দী করা শুরু হল। বাংলার চাষীদের ওপর কুঠিয়ালদের শোষণ আর অত্যাচারের লোমহর্ষক দৃশ্যে ব্যথিত হয়ে এশলে ইডেন বলতে বাধ্য হন:
“ইংল্যান্ডে এমন কোনো নীলের বাক্স পৌঁছায় না যার মধ্যস্থিত নীলে বাংলাদেশের লোকের রক্ত মিশে থাকে না। আর এই রক্ত হলো মুসলিম চাষী সম্প্রদায়ের রক্ত।”

শুকুনের মত লাশের ওপর বসে কোম্পানির কর্মচারীরা নিজেদের হীন স্বার্থ সিদ্ধির জন্যে অবর্ণনীয় অত্যাচার চালায় বাংলার নিরীহ গরিব কৃষক শ্রেণীর মুসলমানের ওপর। মিঃ হান্টার আফসোস করে বলেন :
“একশো সত্তর বছর আগে বাংলার কোনো সম্ভ্রান্ত মুসলমান পরিবারের দরিদ্র হওয়া ছিল এক অসম্ভব ব্যাপার, আর বর্তমানে তাদের পক্ষে ধনী হওয়াই অসম্ভব ব্যাপার।”
ধর্মীয় ও শিক্ষাব্যবস্থাও ছিল খুবই করুণ অবস্থায়। আর এই অন্ধকারের মধ্যেই ধীরে ধীরে আলোর মশাল হয়ে জ্বলে ওঠেন সাইয়েদ নিসার আলী তিতুমীর। ব্রতী হলেন এই জাতির ঘুম ভাঙাতে।

বরাবরের ন্যায় এবারও বিশ্বাসঘাতকতার বীজ রোপিত হলো স্বদেশীদের মধ্য থেকে। আর এই বিশ্বাসঘাতক নরপশুর নাম মতিউল্লাহ। সে ছিল মূলত পুঁড়ার জমিদার কৃঞ্চদেবের বিশ্বস্ত অনুচর। ইংরেজদের ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দিয়ে তিতুমীরের কাজে সে ব্যাঘাত সৃষ্টি শুরু করল। কৃষ্ণদেব হুকুম জারি করল:

১. যারা তিতুমীরের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে ওহাবী হবে, দাড়ি রাখবে ও গোঁফ ছাঁটবে তাদেরকে ফি দাড়ির জন্যে আড়াই টাকা ও ফি গোঁফের জন্য পাঁচ সিকা করে খাজনা দিতে হবে।
২. মসজিদ তৈরি করলে প্রত্যেক কাঁচা মসজিদের জন্য পাঁচশো টাকা এবং প্রতিটি পাকা মসজিদের জন্য এক হাজার টাকা করে জমিদার সরকারে নজরানা দিতে হবে।
৩. বাপ দাদা সন্তানদের যে নাম রাখবে তা পরিবর্তন করে ওহাবী মতে আরবি নাম রাখলে প্রত্যেক নামের জন্যে খারিজানা ফিস পঞ্চাশ টাকা জমিদার সরকারে জমা দিতে হবে।
৪. গো-হত্যা করলে তার ডান হাত কেটে দেয়া হবে-যাতে আর কোনদিন সে গো-হত্যা করতে না পারে।
৫. যে ওহাবী তিতুমীরকে বাড়িতে স্থান দেবে তাকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হবে।

কিন্ত এতে দমে যাননি তিতুমীর। অব্যাহত রেখেছেন তাঁর মিশন। ১৮৩১ সালের মাঝামাঝি শুরু হয় সংঘর্ষ। এতে সত্যেরই জয় হয়। ১৮৩১ সালের ১৭ থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত খণ্ড খণ্ড সংঘর্ষ বাঁধে ইংরেজ সমর্থিত জমিদার বাহিনী ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ তিতুর বাহিনীর মধ্যে। ৬ নভেম্বর জমিদার কৃষ্ণদেব তার বাহিনী নিয়ে পুনরায় নারিকেল বাড়িয়ার মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করে। মূলত ইংরেজদেরকে নানাভাবে প্ররোচিত করে উচ্চশ্রেণীর হিন্দুরা তাদেরকে তিতুমীরের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে থাকে। সফলও হয়। ফলে আলেকজান্ডারের নেতৃত্বে ইংরেজ বাহিনীর সাথে ৪র্থ সংঘাতটি বাধে ১৪ নভেম্বর ১৮৩১ সালে। আত্মরক্ষার জন্য নারিকেল বাড়িয়ায় তৈরি করা হয় ঐতিহাসিক ‘বাঁশের কেল্লা’। মূলত এটাকে ঘিরেই সর্বশেষ সংঘর্ষটি বাধে। ইংরেজদের মুখোমুখি আক্রমণের মুখে টিকে থাকতে পারেনি কেল্লাটি। গোলার আঘাতে শাহাদাতবরণ করেন চিরস্বাধীনতাকামী, অধিকার পুনরুদ্ধারে সদা-সংগ্রামী সাইয়েদ নিসার আলী তিতুমীর। অবশ্য এই যুদ্ধ সম্পর্কে ইংরেজ সেনাপতি মেজর স্কট আফসোসের সাথে মন্তব্য করে বলেন:

“যুদ্ধে আমরা জয়ী হয়েছি ঠিকই কিন্তু এতে প্রাণ দিয়েছেন একজন ধর্মপ্রাণ দেশপ্রেমিক মহাপুরুষ।”
স্কটের এই ছোট্ট মন্তব্যটি অবশ্যই ব্যাপক বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

হিন্দু জমিদার ও ইংরেজদের সাথে তিতুমীরের বারবার সংঘর্ষ হতে কেউ কেউ মনে করতে পারেন তিতুমীর সন্ত্রাসী ও দাঙ্গাবাজ ছিলেন, সশস্ত্র সংগ্রামেই তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। তাদের উদ্দেশ্যে বলব তারা যেনো পূর্বে উদ্ধৃত লর্ড মেকল ও এশলে ইডেনের বক্তব্য দু’টিতে আরেকবার চোখ বুলিয়ে নেন। এছাড়া সেই সময়ের বিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ “সিয়ারে মুতাখ্খারীন” এ বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

মূলত তিতুমীরের আন্দোলনটি ছিল সংস্কার আন্দোলন। তিনি মক্কা থেকে দেশে ফিরে ইংরেজ দস্যু ও জমিদারদের অত্যাচারের নির্মম চিত্র প্রত্যক্ষ করেন। তিনি বুঝেছিলেন দেশবাসীকে সচেতন করতে পারলেই সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এক ভাষণে তিনি তাই বলেন :
“বাংলাদেশের মুসলমানদের ঈমান খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছে। ..... আমি তাদের মধ্যে ইসলামী দাওয়াত পৌঁছুবার দায়িত্ব নিচ্ছি। শুধু তাই নয়, আমি মনে করি, নিম্নশ্রেণীর হিন্দুরাও আমাদের আন্দোলনে যোগদান করতে পারে। কারণ ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, ক্ষক্রিয় ও কায়স্থ জাতির ওপর নিম্নশ্রেণীর হিন্দুরা সন্তুষ্ট নয়। আমরা যদি মুসলমানদেরকে পাক্কা মুসলমান বানিয়ে নিম্নশ্রেণীর হিন্দু ও মুসলমানকে একত্রিত করতে পারি তাহলে আমাদের কাক্সিক্ষত সাফল্য লাভ সহজ হয়ে যাবে।”

একেই তো বলে মানবতাবোধ, দেশপ্রেম। দেশ ও দেশের সাধারণ জনগণকে নিয়ে ভাবনার বহিঃপ্রকাশ এই ভাষণের প্রতিটি শব্দ। ভাষণের পর নিম্নশ্রেণীর হিন্দুরাও তাঁর সহযাত্রী হলো। রুখে দাঁড়ালো অত্যাচারের রিরুদ্ধে।

নারিকেল বাড়িয়ায় সেদিন যে সংগ্রাম হয়েছিল তা ছিল তিতুর ওপর চাপিয়ে দেয়া। নিম্নের কথোপকথন হতে বিষয়টির সুস্পষ্ট ধারণা মেলে-
১৮৩১ সালের ১৯ নভেম্বর। হিন্দু জমিদারদের নানা কথায় বিভ্রান্ত হয়ে প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য কর্নেল স্টুয়ার্টকে পাঠায় সরেজমিনে তদন্ত করতে। সঙ্গে নেয় জমিদারের এক চামচাকে- যার নাম রামচন্দ্র। কর্নেল স্টুয়ার্ট নিসার আলীর হুজরাঘরের সামনে গিয়ে দেখল এক ব্যক্তি সাদা তহবন্দ, সাদা পিরহান ও সাদা পাগড়ি পরে তসবিহ হাতে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন। স্টুয়ার্ট অবাক হয়ে রামচন্দ্রকে জিজ্ঞেস করল, “এই ব্যক্তিই কি তিতুমীর? একে তো বিদ্রোহী বলে মনে হয় না?” রামচন্দ্র বানিয়ে বানিয়ে মনগড়া মিথ্যা বলল, “হ্যাঁ, এই ব্যক্তিই বিদ্রোহী তিতুমীর। নিজেকে বাদশাহ বলে পরিচয় দেয়। আজ আপনাদের আসার কারণে ভোল পাল্টে সাধু সেজেছে!” স্টুয়ার্ট রামচন্দ্রের মাধ্যমে তিতুমীরকে আত্মসমর্পণের কথা বলল। অথবা তার বক্তব্য তাদের সামনে উপস্থাপনের নির্দেশ দিলো। কিন্তু রামচন্দ্র সে কথা তিতুমীরকে না বলে উলটো উসকানিমূলক কথা বলল। বলল ইংরেজদের বিরুদ্ধে তরবারি ধরতে। তিতুমীর বলল, “হিন্দুদের মত আমরাও কোম্পানী সরকারের প্রজা। জমিদার নীলকরদের অত্যাচার দমনের জন্য এবং মুসলমান নামধারীদেরকে প্রকৃত মুসলমান বানানোর জন্য সামান্য চেষ্টা করছি মাত্র।” কিন্তু দোভাষী রামচন্দ্র এবারও মিথ্যা কথা বলল স্টুয়ার্টকে। মুহূর্তেই জ্বালিয়ে দিল মহা সংঘর্ষের বিধ্বংসী আগুন। মুখোমুখি হলো কোম্পানি সরকারের সশস্ত্র সৈন্য এবং তিতুমীরের সাথীরা। যুদ্ধে তিতুমীরের পরাজয় হয়। ধ্বংস হয়ে যায় “বাঁশের কেল্লা”।

বাংলার সাধারণ মানুষ আজও নিরাপদ নয়। বিভিন্নভাবে তারা শোষণ ও নির্যাতনের শিকার। এদেশের কৃষককে বাধ্য করা হচ্ছে বিদেশি শস্যবীজ ব্যবহারে। দেশের তাঁত ও কারখানায় প্রস্তুত কাপড়ের পরিবর্তে বিদেশি কাপড় বাংলাদেশের পুরো বাজার দখল করে নিয়েছে। মুসলমানরা নানাভাবে লাঞ্ছিত ও অবহেলিত। নানাভাবে তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত হানা হচ্ছে বারবার। সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭ বিভাগে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ বন্ধের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। মুসলমান নামধারী বিদেশী অর্থে পালিত কিছু বিশ্বাসঘাতকের যোগসাজশে দেশীয় ঐতিহ্য তথা স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব আজ বিপন্নপ্রায়। মীরজাফর, ঘষেটি বেগম ও মতিউল্লাহদের সারি ক্রমশ বাড়ছে। ১/১১-এর প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে ওদেরই হাতে।

চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র এখনও চলছে। তবে বদলে গেছে তার প্রয়োগ ক্ষেত্র এবং কৌশল। আমাদেরকে সেগুলো ফাইন্ড-আউট করতে হবে। এবং নিতে হবে যথাযথ পদক্ষেপ। এক্ষেত্রে তিতুমীরের সংগ্রাম থেকে দৃষ্টান্ত নিতে পারি আমরা। তিতুমীরের অমর দু’টি বাণী হচ্ছে-“লাঙ্গল যার জমি তার।” এবং “প্রত্যেকের শ্রমের ফসল তাকেই ভোগ করতে দিতে হবে।”

ঈমানী চেতনা ও দেশপ্রেমকে মজবুত করতে হবে। সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে সকল ক্ষেত্রে। তবেই সম্ভব হবে তিতুমীরের ভাঙা বাঁশের কেল্লাকে নতুন করে গড়ে তোলা- যে কেল্লার প্রতিটি খুঁটি হবে অত্যন্ত মজবুত, দুর্ভেদ্য নয় বরং অভেদ্য। স্টুয়ার্টদের হাজারো গোলার আঘাতে সে কেল্লার একটি খুঁটিতেও লাগবে না এতটুকু আঁচড়। তাহলেই সার্থক হবে তিতুমীরের সংস্কার আন্দোলন নিয়ে আজকের এই পর্যালোচনা।
http://www.sonarbangladesh.com/articles/ZubaerHussain
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
বনানী থেকে আরিবা আফিফা লিখেছেন, ২৬ নভেম্বর ২০১১; রাত ১০:৩৫
চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র এখনও চলছে। তবে বদলে গেছে তার প্রয়োগ ক্ষেত্র এবং কৌশল। আমাদেরকে সেগুলো ফাইন্ড-আউট করতে হবে। এবং নিতে হবে যথাযথ পদক্ষেপ।.....একমত আপনার সাথে। সুন্দর লিখেছেন। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
72336
india থেকে dirtroad লিখেছেন, ২৭ নভেম্বর ২০১১; দুপুর ০১:৫৩
Its so easy to put blame on the hindu zaminders of course. Lets look at history....the most contemptible name and the most vicious dewan under whose rapacious greed bengal was being plundered was Mohammed Reza Khan. Not a Hindu defintely.

Also Siraj let loose a reign of terror...killed his own tutor Hisen Kuli Khan, beat Nandakumar with a stic, slaped Mahtabchand, threatened Mir Zafar with qatl.... and after all these if they gang up against a very dilikewd nawab we cannot put the cause at the foot of the english or the conspirators.

A look at the history of deccan.. where muslim kings fought muslim kings to grab the thrones of hyderabad, karnataka will make it clear it was a political power game and nothing to do with islam.

Anmd in any way.. how does dope addict, drunkard, lecherous nawabs of bengal neasue up to be chmpions of islam in any way???
72381
ঢাকা থেকে মাজহারুল ইসলাম লিখেছেন, ২৮ নভেম্বর ২০১১; সন্ধ্যা ০৬:১৯
পৃথিবী যতদিন থাকবে, ষড়যন্ত্রও ততদিন হবে। কিন্তু তাই বলে বসে থাকলে চলবে না। দেশ ও মাতৃকার উন্নয়নকল্পে অবশ্যই সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
ধন্যবাদ জুবায়ের হুসাইনকে চমৎকার লেখাটি উপহার দেয়ার জন্য।
72444
লন্ডন থেকে আত্ম গর্বে আবর্জিত লিখেছেন, ২৮ নভেম্বর ২০১১; রাত ০৮:২৪
জি, ঠিক বলেছেন. নিজের মধ্যে শক্ত সচেতনতাবোধ তৈরী করতে হবে... এই বোধটা যেন আমাদের প্রত্যেকের বিবেককে জাগিয়ে রাখে তিতুমীরের মতো.... তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা ভেঙ্গে গিয়েছিল হয়ত দুর্বল সমরাস্ত্র কিংবা পর্যাপ্ত জনবল কিংবা ষড়যন্ত্রের কারণে... কিন্তু নিজের বিবেকটা কিন্তু নিজের কাছে. একবার সেটার ভিত উঠলে কারো কাছেই সে হার মানবে না.
জুবায়ের ভাইকে লন্ডন থেকে অভিনন্দন গঠনমূলক প্রয়াসের জন্য.
72452
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 
লেখক.........

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy