বুধবার, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ৩০ মে ২০১২; দুপুর ০১:১২ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

বিজ্ঞাপন দিয়ে উপাচার্য নিয়োগ একটি ভ্রান্ত ধারণা

সাহাবুল হক

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়ার জন্য পন্ডিত হওয়ার দরকার নেই, একেবারেই নেই। দরকার ভালো প্রশাসকের। (হুমায়ুন আজাদঃ সাক্ষাৎকার, পৃষ্ঠা নং ১৮) এমনটিই ভাবতেন জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক। এ ধরনের চিন্তা-চেতনা থেকেই হয়তো বর্তমান সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘যোগ্য’ উপাচার্য নিয়োগের জন্য ভালো প্রশাসক খোঁজার চেষ্টা করছেন। আর তাই জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞাপনও দেয়া হয়েছে। সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের জন্য আবেদনপত্র জমাও পড়েছে ৩২৫টি। এখন এখান থেকে বাছাই করে উপাচার্য নিয়োগ দেয়া হবে। শুনেছি এর বাইরেও লোকজন খুঁজছে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়টি। মন্ত্রণালয়ের ‘পছন্দমতো’ লোক পেলেই চাহিদামতো জায়গায় পদায়ন করা হবে। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম উপাচার্য নিয়োগের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়া হলো। একই সাথে সার্চ কমিটি গঠনও একেবারেই নতুন। এক বছর আগে (১৩ মে ২০০৭) শিক্ষা মন্ত্রণালয় সার্চ কমিটি গঠন করে। উপাচার্য নিয়োগের নীতিমালা ঠিক করতেই তাদের একবছরের বেশী সময় লেগে যায়। সার্চ কমিটি গঠনের উদ্দেশ্য ছিল যোগ্যতা এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য,প্রো-উপাচার্য এবং কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ। সার্চ কমিটি গঠনের পটভূমির দিকে একটু দৃষ্টি ফিরাতে চাই। দীর্ঘদিন যাবৎ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠনের বিষয়টি আলোচিত হয়ে আসছিল। সর্বশেষ বিগত সরকারের আমলে মনিরুজ্জামান মিঞা শিক্ষা কমিশন এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন প্রণীত ‘উচ্চশিক্ষার ২০ বছরের কৌশল পত্রে’ সার্চ কমিটি’র মাধ্যমে উপাচার্য নিয়োগের আনুষ্ঠানিক সুপারিশ করা হয়। তবে সার্চ কমিটি গঠন প্রক্রিয়ার ব্যাপারে মনিরুজ্জামান মিঞা কমিশন এবং মঞ্জুরী কমিশনের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আলাদা। বিগত সরকারের আমলে আর সার্চ কমিটি গঠন করা হয়নি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। সেখানে শিক্ষা সচিবকে প্রধান এবং একই মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবকে সদস্য সচিব করে সাত সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হলে নানামুখি বিতর্কের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ ওঠে উপাচার্য নিয়োগপ্রক্রিয়া আমলা নির্ভর হয়ে পড়ছে। এরমধ্যে কমিটির একজন সদস্য (প্রফেসর সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) পদত্যাগ করলে সার্চ কমিটির কার্যক্রম প্রাথমিকভাবে স্থবির হয়ে পড়ে। পরে শিক্ষা উপদেষ্টাকে প্রধান করে সার্চ কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। গত ২০ মার্চ শিক্ষা উপদেষ্টার সভাপতিত্বে সার্চ কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় উপাচার্য নিয়োগ হবে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে। সার্চ কমিটি গঠনের সময় সকলে ভেবেছিলেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৎ, যোগ্য একাডেমিক এবং প্রশাসনিক দক্ষতার অধিকারী শিক্ষকদেরকে উপাচার্য হিসেবে বসানো হবে। যোগ্য লোকদের খুঁজে বের করতেই গঠিত হয়েছিল সার্চ কমিটি। এই কমিটিতে যারা রয়েছেন তারা অনেক পরিচিত, সজ্জন এবং ব্যস্ত লোক। ‘যোগ্য’ লোক খোঁজার ঝামেলা এড়াতে তারা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিলেন। এ পদ্ধতিটিকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি অনেকে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ। বিজ্ঞাপন দিয়ে কি সত্যিকার অর্থে যোগ্য লোক পাওয়া যাবে? সার্চ কমিটির বিজ্ঞপ্তিতে যে সব যোগ্যতা চাওয়া হয়েছে তা হলো ‘পদমর্যাদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বিশিষ্ট গুণাবলীসম্পন্ন পরীক্ষিত ব্যক্তিত্ব, উপযুক্ত নেতৃত্বদানের ক্ষমতা এবং দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার, শিক্ষক সম্প্রদায় ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্বিশেষে সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চমৎকার পারদর্শিতা, সত্যিকার বিদ্যানুরাগ, প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের জন্য কৌশলগত দূরদৃষ্টি।’ সার্চ কমিটির এ বিজ্ঞাপনে যে বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়েছে তা হলো উপাচার্য হওয়ার জন্য শিক্ষক হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। অন্য যে কোন পেশা থেকে এসেও সার্চ কমিটির দাবি পূরণ করলে যে কেউ উপাচার্য হতে পারবেন। যদি এই হয় অবস্থা তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় কেমন চলবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অন্যরা না হয় নাই জানেন, সার্চ কমিটির চার সদস্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তারা তো জানেন কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরিচালিত হয়।

অবাক লাগে তারা কিভাবে বিজ্ঞাপন দিয়ে উপাচার্য নিয়োগের বিষয়টি সহজেই অনুমোদন করলেন। উন্নত দেশে হয়তো বিজ্ঞাপন দিয়ে উপাচার্য নিয়োগ করা হয় । কিন্তু এ দেশের প্রেক্ষাপট তো সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে উপাচার্য নিয়োগ হয় ‘রাজনৈতিক পছন্দ’ এবং ‘অপছন্দের’ ভিত্তিতে। যোগ্যতা যাই থাক ক্ষমতাসীন রাজনীতিকদের আশীর্বাদ পেলেই মওকা মেলে। বিগত বছর গুলোতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের কৃতকর্মের ফল হচ্ছে আজকের সার্চ কমিটি। বুঝলাম দায়িত্বপ্রাপ্ত উপাচার্যদের কেউ কেউ দারুণ অনিয়ম এবং দুনীতি করে শিক্ষক সমাজের মুখে চুন কালি দিয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দিয়েছে। মাথায় ব্যাধি বাসা বেঁধেছে তাই মাথা কেটে ফেলতে হবে, না মাথায় যাতে আর ব্যাধি বাসা না বাঁধে সেটির চেষ্টা করতে হবে। কোনটি? আরো বুঝলাম উপাচার্য পদটি নিয়ে অনেক রাজনীতি হয়। সে ক্ষেত্রে রাজনীতিকে কিভাবে দূরে রাখা যায় সে বিষয়টি না ভেবে ভাবা হয়েছে অন্যটি। যা একেবারে ভ্রান্ত ধারণা হিসেবে পরিগনিত হয়েছে। ভ্রান্ত ধারণা বললাম এই কারণে যে সার্চ কমিটির সাম্প্রতিক কর্মকান্ডে অনেক ধরনের অসঙ্গতি লক্ষণীয়। প্রথমতঃ বিজ্ঞাপন দিয়ে উপাচার্য নিয়োগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যাদের সামান্য পরিমাণ সন্মানবোধ আছে তারা কখনই আবেদন পত্র জমা দিয়ে উপাচার্য হতে যাবেন না। দ্বিতীয়তঃ আবেদনপত্র জমাদানকারীদের বাইরেও উপাচার্য পদে নিয়োগ দানের জন্য ‘বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ’দের খোঁজা হচ্ছে । পত্রিকায় দেখা এ সংবাদ যদি সত্য হয় তবে কেনই বা বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছিল? তা হলে কি আমরা ধরে নিব না যে এটি ছিল একটি ‘আই ওয়াশ’ মাত্র। তৃতীয়তঃ বিজ্ঞাপন অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বাইরের লোকজনও (শর্তপূরণ করে) উপাচার্য হওয়ার সুযোগ পাবে। এর পিছনে কি অন্য কোন কারণ বিদ্যমান রয়েছে?

সবশেষ কথা হলো ভালো এবং সৎ উদ্দেশ্য সামনে রেখেই সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু প্রথমেই আমলানির্ভর হয়ে পড়ার কারণে তা বেশি দূর এগোয়নি। পরবর্তীতে বিজ্ঞাপন দিয়ে নতুন করে সার্চ কমিটি আবার বিতর্কের জন্ম দিলো। এ বিতর্ক থেকে বের হয়ে সার্চ কমিটি উপাচার্য নিয়োগে কার্যকর কি ব্যবস্থা গ্রহণ করে সেটিই এখন দেখার বিষয়।

[লেখকঃ প্রভাষক, পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট, email,shahabu14@yahoo.com
http://www.sonarbangladesh.com/articles/sabu
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy