বুধবার, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ৩০ মে ২০১২; দুপুর ০১:১৩ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

প্যারিসের পথে পথে

শাওন

প্রথম অংশ

দুপুর ২টায় ফোন বাজল । হাতে নিয়ে দেখি স্ক্রীনে লেখা আরাফাত ভাই । হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে আরাফাত ভাইয়ের কন্ঠ, শাওন আমি তো এসে পড়েছি । আমি বললাম , আসার কথা তো আড়াই'টায় । আগেই এসে পোছালেন ? বলেই বললাম, ওকে যেখানে নামছেন ওখানেই বসে থাকেন , আমি ২০ মিনিটের মধ্যে আসছি ।
গ্যালিনি থেকে ওনাকে রিসিভ করে মেট্রোতে উঠে আমার মনে হলো আমার পেট ছিড়ে পড়ছে । আরাফাত ভাইয়েরও ক্ষুদা লাগছে । তৎক্ষণাত সিদ্ধান্ত নিলাম আগে মেট্রো থেকে বের হয়ে খেয়ে নিই । ঢুকলাম কে এফ সি'তে । মেন্যু : বক্স মাষ্টার ।
এবারই প্রথম মুখ খুললেন তিনি ।
আরাফাত ভাই : যে শাওনে'কে ব্লগে লিখতে দেখেছি সেই শাওন আমার সামনে ?! চিন্তা করতেই কেমন লাগে ! ব্লগ কতটা কাছে এনে দিয়েছে আমাদের ।
আমি হাসি ।
আরাফাত ভাই : এবার বলো ব্লগের কার কার সাথে দেখা হয়েছে তোমার ?
আমি : বলি , সুইডেন থেকে একজন ব্লগার আর আপনি ।
আরাফাত ভাই : হাসিন , জানা, আরিল্ড এদের সাথে দেখা হয়নি ?
আমি : দেশ থেকে আসার পরই তো ব্লগে দেখলাম । দেশে গেলে হয়ত দেখা হতে পারে ।
আরাফাত ভাই : আমার সাথে জানা'র কথা হয়েছে বুঝলে । জানা'র স্বপ্ন ছিলো এই ব্লগ ।
আমি : জানা আপুকে তাহলে সামনে পেলে একটা বিশাল ধন্যবাদ দিতে হবে । এই ব্লগের কারণে কতকিছুই না হলো ।
এভাবেই কথা হতে হতে কখন যে খাওয়া শেষ হয়ে গেলো বোঝাই গেলোনা ।
রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে আরাফাত ভাইকে বললাম : ২টা কাজ করা যেতে পারে এখন । এক, আপনি যদি অনেক টায়ার্ড থাকেন তাহলে বাসায় যেয়ে রেস্ট নেওয়া আর ২য়টি হলো : টায়ার্ড না থাকলে এখুনি ঘুরে ঘুরে দেখা যেতে পারে প্যারিস । তখন আমাদের মাথার উপর ছিলো সুন্দর একটা সূর্য । গরম ছিলো ২০° ।
উনি ঘুরবেন বলেই সিদ্ধান্ত নিলেন । সুতরাং মেট্রোতে উঠে এবার রওনা দিলকাম অ্যানভার্সে । অ্যানভার্সে গিয়ে দেখি শত শত মানুষ সবুজ ঘাসের উপর শুয়ে পড়েছে গরমে । আমরা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলাম । একদম উপরে উঠে দেখি বেশ কয়েকজন বাঙালী । হঠাৎ দেখে চিন্তে পারি ওদের । এ তো পুরা পাগল ! কাজ সারছে । আরাফাত ভাই দেখে বললেন চলো শাওন পরিচিত হওয়া যাক । আমি আগে থেকে সাবধান করে দিলাম ওনাকে , আরাফাত ভাই , পুরা আউলা পাবলিক কিন্তু , দেখেবন , সাবধান । আরাফাত ভাই আমাকে অবাক করে দিয়ে বলে : আমি ঝাউলা পাবলিক । চলো দেখা যাক কি হয় ।
- সালাম ভাইজান , ভালো আছেন ?
আরাফাত ভাই : জ্বি ভালো , আপনারা ?
- আল্লাহর ইচ্ছা । ভাইজান কি করেন ?
আরাফাত ভাই : কাজ, ওকাজ দুটোই করি । দিনে কাজ , রাতে অকাজ ।

আমি অন্যদিকে ফিরে হাসি লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করি । আকাশে ফাঁকা , নীলাকাশে উরোধূড়ো মেঘ । আকাশের দিকে কিছুক্ষণ তাকানো যেতে পারে । হাহ হা ( নকল হাসি । এটা হলো আরাফাত ভাইয়ের হাসি , শুনলে বিচিত্র লাগে )
ওয়ালী ভাইয়ের ফোন , শাওন কোথায় তোমরা ? আমি বললাম, সাক্রে করের মাথায় । বললো আমি আসতেছি ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে ।
সাক্রে কর থেকে নিচে নামতে শুরু করলাম একটু একটু করে । আরাফাত ভাইকে বললাম চলেন লিফট দিয়ে নামি । উনি বললেন : নাহ , এভাবে নামতেই মজা লাগছে .
পরে নিচে নেমে ওয়ালী ভাইয়ের সাথে দেখা । আরাফাত ভাইকে ওয়ালী ভাইয়ের কাছে হাস্তান্তর করেআমি রওনা দিলাম বাসার দিকে । মাথার উপরের আকাশ টা তখনও রৌদ্রজ্জ্বল ।

২য অংশ

পরদিন সকাল ৯টায় চলে আসলাম আমি । এসে দেখলাম তখনও গভীর ঘুমে অচেতন আরাফাত ভাই । ঘুম ভাঙাতে কষ্টই লাগছিলো । পরে ভাবলাম ফুল সাউন্ডে মিউজিক দেই , এমনিতেই ঘুম ভেঙে যাবে । মিউজিক অন : ধুম তা না না . . . ধুম তা না না না
আগুনের দিন শেষ হবে একদিন
ঝরণার সাথে গান হবে একদিন
এ পৃথিবী ছেড়ে চলো যাই
স্বপনের সিঁড়ি বেয়ে সীমাহীন

গান শুনে হুড়মুড় করে লাফিয়ে উঠলো । আমি বলি কাহিনী কি ? উনি বললেন , এই গান তুমি পেলে কই শাওন ? এটা তো আমার প্রিয় একটা গান ।
আমরা যখন বের হলাম তখন বাজে ১১টা কয়েক মিনিট । তখন আমরা বের হয়েছি মিউজিয়াম লুভর'এর উদ্দেশ্যে । মেট্রো তখন হু হু করে ছুটে চললো ।
লুভরের সামনের গেটে এসে আরাফাত ভাই বললো : এই তাহলে লুভর মিউজিয়াম যেখানে মোনালিসার ছবি আছে ! আমি হাসি , বলি ছবিটি দেখার পর সেরকম কিছু মনেই হবেনা আরাফাত ভাই ।
মিউজিয়ামের ভেতরের দিকটায় ঢুকলে দেখা যাবে ৩টি কাচের পিরামিড । সবথেকে বড় পিরামিডের মধ্য দিয়ে ঢুকতে হয় সেন্টারে । নিচে নামলাম তখন দেখা যায় ৪দিক ৪ রকম গ্যালারি । আমরা আগাতে থাকলাম মোনালিসার ছবি দেখে ।
ঢুকতে যেয়ে বাধল আসল সমস্যা । টিকিট কাটতে হবে । আরফাত ভাই বললো : মে হু না , কয়ি বাদ নেহি । আমি হাসি আর উনার কর্মকান্ড দেখি । উনি এগিয়ে গিয়ে ইংলিশে যেটা বোঝালেন সেটি হলো : ভাইজান, দেখেন আমি সাংবাদিক । কার্ড এই যে । কার্ড থাকলে ফ্রি ঢোকা যায় । সুতারং কোনো প্রবলেম না করে ঢুকিয়ে দিন ।
আমি হা হা করতে থাকি , কারণ ঐ টিকিট চেকার কিছুই বোঝেন নি । ইংলিশ যে বুঝবে এটা আমি জানতাম । পরে আমি এগিয়ে গিয়ে ফ্রেন্চে বুঝিয়ে বললাম ঘটনা । উনি মাথা ঝাকিয়ে প্রথমবারেই না করে দিলেন । বললো : এই কার্ডে হবেনা । আরাফাত ভাই বললো ; কি যে বলেন না ভাই , হয়ে আরো কত কি থাকবে ! আমি হাসতেই থাকি ।
ঠিক পরের জনের কাছে যেয়ে আমি বুঝিয়ে বলি । সেও একি কথা বললো । আরাফাত ভাই বললো ; শালা বাটপার ।
পরে না পেরে টিকিট কিনলাম । টিকিট কেনা হয়ে গেলে আরাফাত ভাই বললো , শাওন লাস্ট চেষ্টা দেখা জাক কি হয় । এইবার কাজ হয়ে গেলো । শুধু কাজ হলোনা , আমি সাথে আছি বলে আমারেও ঢুকিয়ে দিল ।
আমি হা করে চেয়ে থাকি , ১৮€ খরচ করার পর যদি বলে টিকিট লাগবে না এমনিতেই হবে তাহলে মেজাজ কতটা খারাপ হয়ে যায় চিন্তা করার মত না । আরফাত ভাই শুধু বললো : ব্যবস্থা একটা করতেই হবে ।
যাহোক , পরে আমি মোনালিসার ঘর যেদিকে সেদিকে এগোতে থাকি ।
ঘরের মধ্যে আনলাম আরাফাত ভাইকে । ছোট্ট একটি ঘরে শত শত মানুষ । আর সোজাভাবে তাকালে দেখা যায় বুলেট প্রুফ কাচ দিয়ে ঘেরা ছোট্ট একটি ছবি । মোনালিসার ছবি । ছবি দেখে আরাফাত ভাই হতাশ গলায় বললো : এই জিনিস দেখার লাইগা তুমি ১৮€ খরচ করে আমাকে এখানে আনলে শাওন ?
আমি হাসতে হাসতে বলি , আমি তো আগেই বলেছিলাম ।

ফটাফট কয়েকটা ছবি তুলে বের হয়ে আসলাম । বেশিক্ষণ আর থাকা যাবেনা । ক্ষুদায় পেট চু চু করছে তখন । আর সময় ও বেশি নেই । খাওয়ার পর উদ্দেশ্য আইফেল টাওয়ার ।
ওখান থেকে বের হয়ে ম্যাকডোতে ঢুকলাম । ঢোকার নামমাত্র ইচ্ছা আমার ছিলোনা । আরাফাত ভাইয়ের জন্য ঢুকলাম । দুপুরের খাবার টা ধীরে ধীরে শেষ করলাম । খাবারের মধ্যে গল্প করতে থাকলাম দেশ আর রাজনৈতিক আলাপ নিয়ে । হাহা , নিজেকে অনেক বড় মনে হতে থাকে ।
ম্যাকডো থেকে বের হয়ে আর ই আর সি ধরে রওয়না দিলাম টাওয়ার আইফেলের উদ্দেশ্যে । নামলাম ঠিক পাশে । উঠেই টাওয়ারের মাথা দেখা যায় । বাজে তখন বিকাল সাড়ে ৬টা । আমি সেটা দেখেই আরাফাত ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিলাম । আকাশে তখন কালো ঘন মেঘ ।

৩য অংশ

পরদিন যখন বের হলাম তখন বাইরে ঝিরি ঝিরি বর্ষা । আজ যেহেতু আরাফাত ভাইয়ের শেষ দিন তাই চিন্তা করলাম ভার্সাইতে নিয়ে যাই । আমি কাওকে ঘোরালে তাকে একদম শেষে নিয়ে যাই ভার্সাইতে । আর সেই বলে : এখানে একদম শেষে আনার জন্য জরিমানা করা হবে শাওন তোমাকে ।

প্যারিসের বাইরে খোলামেলা আকাশে , বিশুদ্ধ বাতাসে , সবুজের মেলাতে আর সামনের নিস্তব্ধ পানিতে কেউই নিজেকে সংবরণ করতে পারেনা । আরাফাত ভাইও পারলো না । উনি বলেছিলো : ইশ শাওন , আমি পাগল হয়ে যাবো তো !
এর আগে আমি এখানে এসেছি মাইনাস -৫° ঠান্ডাতে । চারদিক বরফে সাদা । উপর থেকে বরফ পড়তেছিলো । চারদিক সাদা । পানি গুলা বরফ হয়ে গিয়েছিলো ।
এসেছি ৩০° গরমে । চারদিন হিমেল বাতাস । আকাশে সূর্যের কড়া তেজ ।
এসেছি রাতের জোৎনাভরা আলোতে । উপরে খোলা আকাশ । এক কোণে চাঁদ উকি দেয় । গাছের ডালপালার ভেতর থেকে তাকালে কেও আর শান্ত থাকতে পারবে না ।
এবার আসলাম ঝিরি ঝিরি বৃষ্টিতে । আসলাম আর ই আর সি ধরে । আর ই আর সি আবার বাংলাদেশের গরুর গাড়ির ন্যয় দ্রুত চলে । অনেক গতি ! দুতলায় উঠে চলে আসলাম ৩০ মিনিটের মধ্যে । আসার সময় ট্রেনের মধ্যে ফটো সেশনের কাজ সারলাম !
যখন বিশাল খোলা ময়দানে এনে ছেড়ে দিলাম তখনও মনে হয় আরাফাত ভাই কিছু বুঝে ওঠেনি ভেতরের দিকটায় কি আছে । আরাফাত ভাই মেইন গেটে দাড়িয়ে কিছু ফটো তুললো ঝপাঝপ । এবার আস্তে আস্তে ভেতরে আসলাম । আরাফাত ভাই তখুনি বলে উঠলো : শাওন আমি তো পাগল হয়ে যাব । তুমি এখানে একদম শেষে আনলে কেনো ?
আমি হাসতে থাকি ।
এলোমেলো ঘরতে লাগলাম । তখন বর্ষায় ঝাপটায় একটা অনয়রকম অনুভূতি । আমাকে আরাফাত ভাই বলে উঠলো : কি ভাবো শাওন ? অন্যমনষ্ক মনে হচ্ছে ? আমি হেসে বলো : না তো কিছু না ।
আসলে ঈশিকে সেসময় খুবই মিস করছি । তখনই একটা জেদ চেপে বসলো ঈশি প্যারিসে আসলে আগে এখানে নিয়ে আসবো ওকে ।
এর মধ্যে আরাফাত ভাই আমাকে ফাটাফাটি একটা প্রস্তাব দিয়ে বসল । আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম । নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলাম না । নিশ্বাস তখন বন্দ ছিলো ! পরে আরাফাত ভাই নিজেই বললো : দেশে গেলে সব ঠিক করে দিবো । আমি শুনে নাচতে থাকি ।
বেশ খানিক্ষণ এলোমেলো ঘোরাঘুরি করার পর চলে আসার সময় হলো । তখন বিকেল । আর বৃষ্টি পড়েই যাচ্ছে ।
ওখান থেকে সোজা আসলাম নটর ড্যাম গীর্যাতে । প্যারিসের অন্যতম প্রধান গীর্যা । সামনে থেকে অনেক উচু । ওখানে কিছুক্ষণ থাকলাম । এবার বিদায় নেওয়ার পালা ।
মেট্রো হুশে ছেড়ে দিয়ে বিদায় দিয়ে চলে আসলাম । আরাফাত ভাই বুকের কাছে টেনে নিলেন । বললো : ঋণ করে রাখলে শাওন । আমি হুশ করে একটা শব্দ করলাম ! ফিরে উলটো দিক তাকালাম । উনি হাত নেড়ে বিদায় জানালেন ।
বিদায় আরাফাত ভাই , আবার দেখা হবে অন্য কোথাও অন্য কোনো খানে ।

http://www.sonarbangladesh.com/articles/shaon
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy