বুধবার, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ৩০ মে ২০১২; দুপুর ০১:৫৫

A true God loving scientist Galileo & the Barbaric killing of Christian Catholic Church(বিজ্ঞান বনাম ধর্ম নাকি বিজ্ঞান বনাম গীর্জা???)

লিখেছেন মরফিউস ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০১২, রাত ০৯:৫৪

ধর্ম ও বিজ্ঞানের_আরো সঠিকভাবে বলতে গেলে চার্চ ও বিজ্ঞানের মধ্যে বিরোধ এবং বিরোধ নিরসনের প্রচেষ্টা নিয়ে রচিত একটা রহস্য উপন্যাস বা থ্রিলার হচ্ছে ড্যান ব্রাউনের 'অ্যাঞ্জেলস অ্যান্ড ডিমনস'। বইটি আন্তর্জাতিকভাবে সাড়া জাগানো এবং বহুল বিক্রীত। একদিন সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ঘটনার ঘনঘটা নিয়ে উপন্যাসটি রচিত। চরম নাটকীয়তায় পরিপূর্ণ এবং রহস্য উদ্ঘাটনে রুদ্ধশ্বাসে ছোটার এক অনন্যসাধারণ কাহিনী এ উপন্যাসটি। উপন্যাসের বিরাট অংশজুড়ে আছে টান টান উত্তেজনা ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। সুইজারল্যান্ডে অবস্থিত পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বৈজ্ঞানিক গবেষণাকেন্দ্র সার্নে কর্মরত এবং অ্যান্টিমেটারের আবিষ্কারক ধর্মযাজক থেকে পদার্থবিদ বনে যাওয়া লিওনার্দো ভেট্রা নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। হত্যাকারী হত্যার ক্লু বা সূত্র হিসেবে ধর্মযাজক পদার্থবিদের বুকে ইল্যুমিনাটি নামে একটা রহস্যমণ্ডিত প্রতীক-চিহ্ন প্রোথিত করে রেখে যায়। তদুপরি হত্যাকারী দুর্ভাগ্যকবলিত এই ধর্মযাজক বিজ্ঞানীর একটা চোখ চুরি করে নিয়ে যায়, যা আরো বড় ঘটনার ইঙ্গিতবহ। সার্নের পরিচালক শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী ম্যাক্সমিলান কোহলার এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য শরণাপন্ন হন পুলিশের নয়, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মীয় প্রতীকবিদ্যার অধ্যাপক রবার্ট ল্যাংডনের। অ্যান্টিমেটার প্রকল্প সম্পর্কে সার্নের পরিচালক এবং রবার্ট ল্যাংডনকে অবহিত করেন লিওনার্দো ভেট্রার পালিতকন্যা এবং পদার্থবিদ মিডা ভিট্টোরিয়া ভেট্রা। তিনিও সার্নে কর্মরত এবং তাঁর বাবার সহযোগী। হত্যাকাণ্ডের জন্য 'ইল্যুমিনাটি' বা আলোকিত মানুষরা দায়ী না 'অ্যান্টিমেটার'-এর আবিষ্কারের মধ্যেই এই হত্যার কারণ নিহিত_তা পরের ঘটনাপ্রবাহ থেকে জানা যাবে। আমরা প্রথমে 'ইল্যুমিনাটি' এবং তারপর 'অ্যান্টিমেটার' নিয়ে আলোকপাত করব।

কোহলার এবং ল্যাংডনের কথোপকথন থেকে 'ইল্যুমিনাটি' সম্পর্কে যা জানা যায় তা নিম্নরূপ :

'ইল্যুমিনাটি' শব্দটির অর্থ হচ্ছে 'আলোকিতজনরা'। এটি প্রাচীন ভ্রাতৃত্ব জাতীয় কোনো কিছুর নাম।... ইতিহাসের শুরু থেকে বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে একটা গভীর ফাটল বিদ্যমান। গিওর্দানো ব্রুনোর মতো স্পষ্টভাষী বিজ্ঞানীরা বৈজ্ঞানিক সত্য প্রকাশের জন্য চার্চ কর্তৃক হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। খ্রিস্টান ধর্ম সব সময় বিজ্ঞানকে নিগৃহীত করেছে। তবে ১৫০০ সালে একদল মানুষ রোমে চার্চের নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে থাকে। ইতালির অত্যন্ত আলোকিত কিছু মানুষ_পদার্থবিদ, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ_চার্চের অশুদ্ধ বা ভুল শিক্ষার বিষয়ে নিজেদের উদ্বেগ ভাগাভাগি করার জন্য গোপনে মিলিত হতে শুরু করেন। তাঁরা শঙ্কিত যে 'সত্যের' ওপর চার্চের একচ্ছত্র অধিকার বিশ্বজুড়ে শিক্ষার মাধ্যমে আলোকায়নকে হুমকির মুখে ফেলে দেবে। তাঁরা প্রতিষ্ঠা করেন পৃথিবীর প্রথম বৈজ্ঞানিক থিঙ্কট্যাংক (বিজ্ঞানীদের সমাবেশ), যাঁরা নিজেদের 'ইল্যুমিনাটি' (আলোকিতজনরা) হিসেবে অভিহিত করেন। ইল্যুমিনাটি হচ্ছে বৈজ্ঞানিক সত্য অনুসন্ধানে নিবেদিত ইউরোপের সবচেয়ে শিক্ষিত মনের অধিকারীরা।

অবশ্য ইল্যুমিনাটি বা আলোকিতজনরা ক্যাথলিক চার্চের নিষ্ঠুর শিকারে পরিণত হন। কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের চরম গোপনীয়তার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা নিরাপদ ছিলেন। কথা ছড়িয়ে দেওয়া হতো সঙ্গোপনে এবং সমগ্র ইউরোপ থেকে শিক্ষিতজনদের অন্তর্ভুক্ত করে ইল্যুমিনাটি ভ্রাতৃত্ব জন্মলাভ করে। বিজ্ঞানীরা রোমের একটা অতি গোপন স্থানে নিয়মিত মিলিত হতেন, যাকে তাঁরা আলোকিত চার্চ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ইল্যুমিনাটির অনেকে সহিংসতার মাধ্যমে চার্চের উৎপীড়ন মোকাবিলা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের সবচেয়ে শ্রদ্ধাভাজন সদস্য তাঁদের এ কাজ থেকে নিবৃত্ত করেন। তিনি ছিলেন একজন শান্তিবাদী এবং একই সঙ্গে ছিলেন ইতিহাসের অত্যন্ত বিখ্যাত একজন বিজ্ঞানী।

বিজ্ঞানী নন এমন ব্যক্তিরাও সেই দুর্ভাগ্যকবলিত জ্যোতির্বিদকে চেনেন, যিনি চার্চ কর্তৃক কারারুদ্ধ হয়ে প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছিলেন। তাঁর 'অপরাধ'_তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে পৃথিবী নয়, সূর্যই হচ্ছে সৌরজগতের কেন্দ্র। যদিও তার উপাত্ত অখণ্ডনীয়, তবুও জ্যোতির্বিদকে দুঃসহ শাস্তি দেওয়া হয় তাঁর এই বক্তব্যের জন্য যে গড মানবজাতিকে প্রতিস্থাপন করেছেন এমন কোনো স্থানে, যা তাঁর বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র নয়। তাঁর নাম হচ্ছে গ্যালেলিও গ্যালিলি। হ্যাঁ, গ্যালেলিও ছিলেন একজন ইল্যুমিনেটাস বা আলোকিত ব্যক্তি। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন একজন ভক্তিমান ক্যাথলিকও। তিনি বিজ্ঞান সম্পর্কে চার্চের অবস্থান নরম করার চেষ্টা করেছিলেন এ ঘোষণার দ্বারা যে বিজ্ঞান বিধাতার অস্তিত্বে বিশ্বাস ধীরে ধীরে ক্ষয় বা দুর্বল করে না, বরং শক্তিশালী করে। তিনি এমনও লিখলেন যে তিনি যখন তাঁর টেলিস্কোপের ভেতর দিয়ে ঘূর্ণমান গ্রহগুলোর দিকে তাকান, তখন তিনি গ্রহসংগীতের মধ্যে বিধাতার কণ্ঠস্বর শুনতে পান। তিনি এই অভিমত পোষণ করতেন যে বিজ্ঞান ও ধর্ম পরস্পর শত্রু নয়, বরং মিত্র_দুটি ভিন্ন ভাষায় একই গল্প বলা। সুসামঞ্জস্য ও ভারসাম্যের গল্প...স্বর্গ ও নরক, রাত ও দিন, গরম ও ঠাণ্ডা, গড ও শয়তান। বিজ্ঞান ও ধর্ম উভয়েই বিধাতার সুসামঞ্জস্যে আনন্দ উপভোগ করে...আলো ও আঁধারের মধ্যে চলছে অবিরাম প্রতিযোগিতা। দুর্ভাগ্যক্রমে চার্চ চাননি বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে সংযোগ।

কারণ এই সংযোগ চার্চের দাবিকে নস্যাৎ করে দিত যে একমাত্র চার্চের মাধ্যমেই গডকে জানা-বোঝা যায়। সুতরাং চার্চ প্রচলিত ধর্মমতের বিরুদ্ধবাদী হিসেবে গ্যালিলিও বিচার করেন। চার্চ তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেন এবং স্থায়ীভাবে গৃহবন্দি করেন।

গ্যালিলিওর গ্রেপ্তার ইল্যুমিনাটি বা আলোকিতদের বিপ্লবের দিকে ঠেলে দেয়। ভুল হতে থাকে। চার্চ চার সদস্যের পরিচিতি জানতে পারেন, যাঁদের আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু চার বিজ্ঞানী নির্যাতন সত্ত্বেও কিছুই প্রকাশ করেননি। তাঁদের বুকে জ্বলন্ত লোহা দিয়ে ক্রস চিহ্নে চিহ্নিত করা হয়। তারপর এই বিজ্ঞানীদের বর্বরোচিতভাবে হত্যা করা হয় এবং তাঁদের মৃতদেহ রোমের রাস্তায় ফেলে রাখা হয়। ইল্যুমিনাটিতে যাঁরা যোগ দিতে চান, তাঁদের জন্য এই হত্যাকাণ্ড এবং মৃতদেহ প্রদর্শন ছিল একটা সতর্কীকরণ। চার্চের এই কার্যক্রম চলাকালে অবশিষ্ট ইল্যুমিনাটি ইতালি থেকে পালিয়ে যায়।

ইল্যুমিনাটি বা আলোকিতজনরা গভীর আত্মগোপনে চলে যান, যেখানে তাঁরা ক্যাথলিক নির্যাতনের মুখে পালিয়ে যাওয়া বিভিন্ন উদ্বাস্তু গ্রুপের সঙ্গে মিলিত হতে থাকেন। এই গ্রুপের মধ্যে আছেন অতীন্দ্রিয়বাদী, আল-কেমিস্ট অকালিস্ট, মুসলমান ও ইহুদি। কয়েক বছর ধরে ইল্যুমিনাটি বা আলোকিতজনরা নতুন সদস্য সংগ্রহ করতে থাকেন। ফলে একটা নতুন ইল্যুমিনাটি আত্মপ্রকাশ করে, যেটা অন্ধকারাচ্ছন্ন ইল্যুমিনাটি গভীরভাবে খ্রিস্টানবিরোধী ইল্যুমিনাটি। তাঁরা খুব শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। তাঁরা রহস্যময় আচার-অনুষ্ঠান অবলম্বন করেন। তাঁরা ভয়ংকর গোপনীয়তা রপ্ত করেন। আবার কোনো একদিন জেগে উঠে ক্যাথলিক চার্চের ওপর প্রতিশোধ গ্রহণ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তাঁদের শক্তি এমন এক পর্যায়ে পেঁৗছে যে যখন চার্চ তাঁদের পৃথিবীতে একক, সবচেয়ে ভয়ংকর খ্রিস্টানবিরোধী শক্তি হিসেবে গণ্য করেন। ভ্যাটিকান এই ভ্রাতৃত্বকে শয়তান হিসেবে নিন্দা করে। শয়তান ইসলামী শব্দ (আবার শয়তান শব্দটির মূল হচ্ছে ইংরেজি শব্দ (ঝধঃধহ)। এর অর্থ হচ্ছে 'বিপক্ষ' বা 'প্রতিদ্বন্দ্বী'...গডের বিপক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বী।

পরিশেষে রবার্ট ল্যাংডন সার্নের পরিচালক ম্যাঙ্িিমলান কোহলারকে বললেন, 'আমি জানি না কিভাবে এবং কেন এই প্রতীকচিহ্নটি এই মানুষটির বুকে এল। তবে আপনি তাকিয়ে আছেন বহু আগে হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী শয়তানি ভক্তিচিহ্নের দিকে।' বলা বাহুল্য, প্রতীকচিহ্নটি হচ্ছে 'ওখখটগওঘঅঞও' বা আলোকিতজনরা।

বিষয়শ্রেণী: বিবিধ
শেয়ার করুনঃ
২০১ বার পঠিত, ৭ টি মন্তব্য
৬ জনের পছন্দ
রেটিং দিতে লগইন করুন
পাঠকের মন্তব্য:
মন্তব্যের জবাব দিতে সমস্যা হলে এখানে ক্লিক করুন এবং নতুন পাতায় মন্তব্য লিখুন
636950
০৪ ফেব্রুয়ারী ২০১২; রাত ১০:১৭
জেদ্দা বাসি লিখেছেন : "তিনি এমনও লিখলেন যে তিনি যখন তাঁর টেলিস্কোপের ভেতর দিয়ে ঘূর্ণমান গ্রহগুলোর দিকে তাকান,
তখন তিনি গ্রহসংগীতের মধ্যে বিধাতার কণ্ঠস্বর শুনতে পান।

তিনি এই অভিমত পোষণ করতেন যে বিজ্ঞান ও ধর্ম পরস্পর শত্রু নয়,
বরং মিত্র_দুটি ভিন্ন ভাষায় একই গল্প বলা।

সুসামঞ্জস্য ও ভারসাম্যের গল্প...স্বর্গ ও নরক, রাত ও দিন, গরম ও ঠাণ্ডা, গড ও শয়তান।

বিজ্ঞান ও ধর্ম উভয়েই বিধাতার সুসামঞ্জস্যে আনন্দ উপভোগ করে...আলো ও আঁধারের মধ্যে চলছে অবিরাম প্রতিযোগিতা।

দুর্ভাগ্যক্রমে চার্চ চাননি বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে সংযোগ। "


পড়ে খুব ভালো লেগেছে।
ধন্যবাদ।
০৪ ফেব্রুয়ারী ২০১২; রাত ১০:২৫
629566

মরফিউস লিখেছেন : আমার ব্লগ বাড়িতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ
637244
০৫ ফেব্রুয়ারী ২০১২; রাত ০৩:৩৫
ইউসুফ মামুন লিখেছেন : পড়ে বেশ ভাল লাগলো। কিন্তু কিছু কিছু প্রয়োজনীয় শব্দ সঠিকভাবে পড়তে না পেরে কেমন যেন অতৃপ্তি ও থাকলো। যেমন লাস্ট লাইনে "বলা বাহুল্য, প্রতীকচিহ্নটি হচ্ছে 'ওখখটগওঘঅঞও' বা আলোকিতজনরা"।
637285
০৫ ফেব্রুয়ারী ২০১২; সকাল ০৬:২৩
রেহনুমা বিনত আনিস লিখেছেন : অনেক কিছু জানা হোল, ধন্যবাদ
২০ ফেব্রুয়ারী ২০১২; বিকেল ০৫:৩৭
651121

মরফিউস লিখেছেন : আমার ব্লগ বাড়িতে বেড়াতে আসার জন্য অনেক TnQ
638715
০৬ ফেব্রুয়ারী ২০১২; সকাল ১১:৩৪
ডাঃ নোমান লিখেছেন : বইটি পড়েছিলাম তবে আপনার প্রবন্ধে নতুনভাবে দেখলাম ।
মন্তব্য লিখতে লগইন করুন
মরফিউস