ভাষা খোদার সেরা দান: আল্লাহ তায়ালা মানবকূলকে যত নেয়ামত দিয়েছেন তার মধ্যে ভাষা অন্যতম। মানুষ ভাষার মাধ্যমে অন্যের সাথে ভাব বিনিময় করতে পারে। মনের মণিকোঠায় লুকানো সুখানুভূতি দু:খানুভূতি নিমিষেই পৌছে দেয়া যায় অন্যের কাছে। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে বাকশক্তি দিয়েছেন যা অন্য কোন প্রানীকে দেননি। পশু-প্রানীরা কখনো তাদের মনের বেদনা কারে কাছে বলতে পারেনা; আনন্দ উল্লাস অন্যের সাথে শেয়ার করতে পারে না। কিন্তু আশরাফুল মাখলুকাত মানুষ তাঁদের সব অনুভুতি অন্যের সাথে আদান প্রদান করতে পারে। এ এক অপূর্ব নেয়ামত। আল্লাহ তায়ালার অসংখ্য কুদরত ও নিদর্শন আমাদেরকে পরিবেষ্টন করে আছে। এইসব নিদর্শনগুলোর মধ্য থেকে কথা বলা বা ভাষার নিদর্শনটিই আমরা সারাণ অনুভব করি এবং ব্যবহার করি। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন: “তাঁর নিদর্শনাবলীর অন্যতম হল- আসমান যমীন সৃষ্টি, তোমাদের বিভিন্ন রং, ধরণ এবং ভাষার বিভিন্নতা” (সূরা রূম: ২২)।
আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ায় কোটি কোটি মানুষ তৈরী করেছেন। তিনি নিপূণতার সাথে প্রত্যেকটি মানুষকে অন্য মানুষ থেকে আলাদা তৈরী করেছেন। তাদের মধ্যে দিয়েছেন রংয়ের ভিন্নতা; ভাষার ভিন্নতা; দিয়েছেন রুচীর ভিন্নতা। কোটি কোটি মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন ধরণ, রূপ-সৌন্দর্য্যে ও ভাষার ভিন্নতা দানের মধ্যেই আল্লাহ তায়ালার অপরূপ মহিমা ও কুদরতকে স্যা দেয়। প্রমাণ করে আল্লাহ কতো সুনিপূণ কারিগর। আল্লাহ তায়ালা বলেন: “তিনি (আল্লাহ) মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদেরকে বর্ণনা করার জ্ঞান দিয়েছেন” (সূরা আর রাহমান:৪)।
আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক জাতিকে আলাদা আলাদা ভাষা দিয়েছেন। সব ভাষাই আল্লাহর সৃষ্টি; আল্লাহর দান। সব ভাষাই আল্লাহর কাছে সমান। আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আ.) কে সৃষ্টির পর তাঁকে সব ধরণের ভাষা জ্ঞান শিা দিয়েছেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন: “আর তিনি আদমকে সব কিছুর জ্ঞান শিা দিয়েছেন” (সূরা আল বাক্বারাহ: ৩১)।
এ আয়াতের মাধ্যমে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, সকল ভাষাই আল্লাহর সৃষ্টি। আর ভাষার বিভিন্নতা আল্লাহর অনন্য নিদর্শন।
ইসলামে মাতৃভাষার গুরুত্ব: ইসলাম মাতৃভাষাকে বিশাল গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহর কোন নবী রাসূলই স্বজাতি ছাড়া প্রেরিত হননি। তাঁদের প্রত্যেকেই স্বজাতির ভাষায় কথা বলতেন। নবী-রাসূলগণ মাতৃভাষায় তাঁদের উম্মতদের কাছে আল্লাহর হেদায়েত পৌঁছে দিতেন। আল্লাহ তায়ালা নবী-রাসূলদেরকে যত কিতাব দিয়েছেন তাও দিয়েছেন ঐ সমস্ত জাতির ভাষায় যে ভাষায় তারা কথা বলত। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন: “আমি দুনিয়ায় এমন কোন নবী-রাসূল প্রেরণ করিনি, যারা তাঁদের জাতীয় ভাষা জানত না। যাতে করে তারা তাঁদের জাতিকে নিজ ভাষায় বুঝাতে পারে” (সূরা ইবরাহীম: ৪)।
আল্লাহ তায়ালা সর্বশেষ মহগ্রন্থ আল কুরআন অবতীর্ণ করেছেন আরবী ভাষায়। কেননা আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (স.) ছিলেন আরবের মানুষ। আরবের ভাষা ছিল আরবী তাই আল্লাহ তায়ালাও আরবী ভাষাকেই তাঁর কিতাবের ভাষা হিসেবে মনোনীত করেছেন। নবী (স.) যদি অন্য কোন অঞ্চলে জন্ম নিতেন তাহলে নিশ্চয়ই আল্লাহ ঐ অঞ্চলের অধিবাসীরা যে ভাষায় কথা বলত সে ভাষাতেই কুরআন নাযিল করতেন এ কথা নির্ধিদ্বায় বলা যায়।
নবী (স.) সব সময় মাতৃভাষার গুরুত্ব দিতেন। তিনি ভিণদেশে কোন সাহাবীকে দা‘ওয়াতী কাজে প্রেরণ করলে তাঁদেরকে ঐ অঞ্চলের ভাষা শিা করে নিতে নির্দেশ দিতেন। কেননা মানুষেরা স্বজাতের ভাষায় যতটুকু ইসলামের বাণী হৃদয়াঙ্গম করতে পারবে তা তারা অন্য ভাষা দিয়ে পারবে না। যায়েদ ইবনে ছাবিত (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: নবী (স.) আমাকে বললেন: “আমার নিকট বিভিন্ন ভাষায় চিঠি-পত্র আসে; আমি চাইনা সবাই তা পড়–ক। তুমি কি হিব্র“ অথবা সুরয়ানী ভাষা শিখতে পার? অত:পর আমি মাত্র সতের দিনে ঐ ভাষা শিখে ফেললাম” (কানযুল উম্মাল, হাদীস নং ৩৭০৫৯)।
নবী (স.) এর ভাষা জ্ঞান: নবী (স.) এর ভাষা জ্ঞান ছিল অত্যন্ত উঁচু মানের। তিনি নিরর হয়েও যে কথাগুলো বলে গেছেন তা আজও বিস্ময় হয়ে রয়ে গেছে বিশ্ব সাহিত্যিকদের কাছে। তাঁর শব্দ চয়ন, ভাষা শৈলী, সাহিত্যরস ও ভাব ছিল অপূর্ব। তাঁর কথা শিতি, অশিতি, কবি-সাহিত্যিক, পন্ডিতসহ সকল শ্রেণীর মানুষকে মুগ্ধ করত। নবী (স.) সব সময় বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলতেন। তিনি বলেন: “আমি আরবের মধ্যে সবচেয়ে শুদ্ধভাষী” (মিশকাত)।
শুধু আমাদের প্রিয় নবী (স.) নয় সব নবীগণই শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতেন। তাই নবীদের কথামালা মানুষের হৃদয় কেড়ে নিতে সক্ষম হত।
আমাদেরকেও বিশেষ করে দায়ী ইলাল্লাহদের খাটি শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে হবে। জাতীয় ভাষায় শুদ্ধভাবে কথা না বলতে পারলে আলেম ওলামাদেরকে কেউ মূল্যায়ন করবে না। সভা সমিতিতে ডাকবে না। নবী (স.) এর চারিত্রিক গুণাবলী যেভাবে মানুষদের কাছে টানত তেমনি তাঁর কথামালাও মানুষের মন কেড়ে নিত। মনে রাখতে হবে, আমরা যদি আমাদের আচার আচরণ ও কথা বার্তার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মন জয় করতে না পারি তাহলে ইসলাম প্রতিষ্ঠা শুধু স্বপ্নই থেকে যাবে; কখনো প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।
বাংলা ভাষায় ইসলাম প্রচারের প্রয়োজনীয়তা: ইসলামের সুমহান আদর্শকে বাংলাভাষী মানুষের কাছে পৌছে দিতে বাঙ্গালী মুসলমানের বাংলা ভাষায় বুৎপত্তি অর্জনের বিকল্প নেই। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (স.) ছিলেন আরবের অধিবাসী তাই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে আরবী ভাষায়। আল-কুরআনের বাণীসমূহ ও রাসূলের হাদীসকে তাই বাংলা ভাষায় মানুষের কাছে পৌছে দিতে হবে। আমাদের ভাষা আরবী নয়। মুসলমানদের আরবী ভাষা জানা আবশ্যক হলেও আরবী ভাষী না হওয়ার কারণে সকলের পে তা জানা সম্ভব নয়। তাই যারা আরবী ভাষা জানেন তাদের কর্তব্য হচ্ছে, কুরআন, হাদীস ও ইসলামী ফিকহ, তাফসীর, বিধি-বিধান ও ইসলামী সাহিত্যকে বাংলা ভাষায় এদেশের মুসলমানদের হাতে পৌছে দিতে হবে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলমান ধর্মপ্রাণ; কিন্তু তাঁদের অনেকেই ইসলামের সঠিক জ্ঞান রাখেন না শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় ইসলাম ধর্মের সঠিক চেতনা তাঁদের কাছে পৌছে দেয়ার অভাবে। একসময় ফার্সি ভাষাকে অমুসলিমদের ভাষা মনে করা হত। রুমী, জামি, শেখ শাদীরা সে ভাষায় অসংখ্য কবিতা, সাহিত্য রচনা করে ফার্সি ভাষাকে জয় করে ফেলেন। এতে ইসলামের বিশাল উপকার হয়। আল্লামা ইকবাল উর্দু ভাষায় যে সাহিত্য রচনা করেছেন তা ইসলামী সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। বাংলা ভাষায়ও আমাদের প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ, গোলাম মোস্তফাসহ অনেকেই তাদের কবিতা ও সাহিত্যে ইসলামকে তুলে ধরেছেন। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। বর্তমানে আলেম ওলামাদের অনেকেই লেখালেখি করেন; কিন্তু তা নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের ওপর। কবিতা, রচনা, উপন্যাস, গল্প ও সাহিত্যে ইসলামপন্থি লেখকদের অনুপস্থিতি চোখে পড়ার মত। এ সুযোগে ইসলাম বিরোধী বাম পন্থী লেখকগণ সাহিত্যের পুরো জগতকে দখল করে নিয়েছেন। তারা তাদের খুরধার লেখনীর মাধ্যমে আমাদের মুসলিম সমাজে সেক্যুলারিজমের বীজ বপণ করছে। এ সমস্ত সাহিত্য পড়ে অধিকাংশ যুবক-যুবতীরা ধর্ম বিরোধী চেতনা নিয়ে বেড়ে উঠছে। সমাজে চরিত্রহীনতা দেখা দিয়েছে। অশ্লীলতা, বেহায়াপণা, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন, সুদ-ঘুষসহ নানান ধরেনের অপরাধ বেড়েই চলছে। টিভি সিনেমাহলে যত নাটক সিনেমা দেখানো হয় তা অধিকাংশই ধর্মহীনদের রচিত। এখানে ইসলামপন্থীদের পদচারণা নেই বললেই চলে। এখানে যে বিশাল শূণ্যতা বিরাজ করছে তা যদি ইসলামী ভাবধারার সাহিত্য দিয়ে পূরণ না করা যায় তাহলে ভবিষ্যতে মুসলিম জাতি হিসেবে স্বকীয়তা নিয়ে টিকে থাকা দূরহ হবে।
৫২‘র ভাষা আন্দোলন ও ভাষার জন্য শাহাদাত বরণ: বাংলাদেশের মুসলমানগণ ভাষার জন্য যে আত্মত্যাগ করেছেন পৃথিবীর ইতিহাসে তা বিরল। ছালাম, জব্বার, বরকতেরা মাতৃভাষার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে আমাদেরকে করেছেন ধন্য। সম্পদের জন্য, স্বাধীনতার জন্য এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষ দেশে দেশে লড়াই করে কিন্তু মাতৃভাষার জন্য লড়াইয়ের ইতিহাস শুধু বাংলাদেশীরাই তৈরী করেছে। এ লড়াইয়ে যারা শাহাদত বরণ করেছেন তাঁরা সবাই মুসলমান। ভাষা শহীদদের এ আত্মত্যাগের মর্যাদা দিতে হবে। আমাদের মাতৃভাষা যাতে বিজাতীয় সংস্কৃতি দিয়ে ভরে না যায় সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। ইসলামী মূল্যবোধকে বাংলা ভাষায় অন্তর্ভূক্ত করে একে আরো সমৃদ্ধ করতে হবে। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, ভাষার জন্য শাহাদাত বরণকারীরা বাংলা ভাষাকে আমাদের কাছে আমানত রেখে গেছেন। এ আমানতকে রা করার দায়িত্ব আমাদের। বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করা, রণাবেন করা ও সর্বস্তরে এর ব্যবহার নিশ্চিত করা আমাদের কর্তব্য।