বুধবার, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ৩০ মে ২০১২; দুপুর ০২:৪২

পড়ুন নির্যাতিত মানুষের কাহিনী..

লিখেছেন ইদ্রিছ আহমদ ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০১২, সন্ধ্যা ০৬:৩৯

দুর্ভাগ্য, আমাদের আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হয়েছে : সাক্ষাৎকারে গোলাম আযম
আলফাজ আনাম ও মেহেদী হাসান
জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির প্রবীণ রাজনীতিবিদ অধ্যাপক গোলাম আযম বলেছেন, ‘১৯৭১ সালে যে আশঙ্কার কারণে আমরা পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলাম, আমাদের সেই আশঙ্কা দুর্ভাগ্যজনকভাবে সত্যে পরিণত হয়েছে। আমরা সব ক্ষেত্রে স্বাধীন নেই। আমরা এখন অনেকটাই যেন ভারতের কুক্ষিগত। ভারত যা চায় আমরা সব দিতে বাধ্য হচ্ছি। আমাদের অধিকার, ন্যায্য প্রাপ্যের কিছুই দিতে চায় না তারা। আর তাদের যা ইচ্ছা তা-ই তারা চায় এবং তা-ই তারা পায়। এ অবস্থা কোনো প্রকৃত স্বাধীন মর্যাদাশীল দেশের জন্য কাম্য হতে পারে না।’ দৈনিক নয়া দিগন্তের সাথে গত শুক্রবার রাতে নিজ বাসায় একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত ট্রাইব্যুনালে অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দায়ের করা চার্জশিটে অর্ধশতাধিক অভিযোগ বিষয়ে তিনি বলেন, এগুলো অভিযোগ নয় বরং অপবাদ। এর একটাও তারা প্রমাণ করতে পারবে না।
সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক গোলাম আযম বলেছেন, বাংলাদেশ বর্তমানে যে ধরনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অতিক্রম করছে তা থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য বিরোধী দল যে আন্দোলন শুরু করেছে তাতে জনগণকে ব্যাপকভাবে সাড়া দিতে হবে। জনগণের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে যদি ক্ষমতা হস্তান্তর করা যায় তাহলে বাংলাদেশের ভালো ভবিষ্যৎ আশা করা যায়। তা না হলে আমাদের এর চেয়েও কঠিন পরিস্থিতি বরণ করতে হবে।
নিচে তাঁর সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো।
নয়া দিগন্ত : ১৯৭১ সালে আপনারা কেন পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন?
অধ্যাপক গোলাম আযম : আমরা ছিলাম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। দুনিয়ার কোথাও সাধারণত এমনটি হয়নি, মেজরিটি অংশ মাইনরিটি থেকে আলাদা হতে চায়। আলাদা তো হতে চায় যারা মাইনরিটি তারা। আমরা কোন দুঃখে আলাদা হতে যাবো? যেহেতু আমরা মেজরিটি তাই আমাদের দায়িত্ব ছিল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং পাকিস্তানে প্রাধান্য বিস্তারের চেষ্টা করা। আমরাই পাকিস্তানের আসল শাসক হবো। সে সুযোগ না নিয়ে আমরা কেন পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যাবো? দ্বিতীয় কথা হলো, পশ্চিম পাকিস্তান ছিল ভারতের বাইরে। আর আমরা পূর্ব পাকিস্তান ছিলাম ভারতের পেটের ভেতরে। আমরা তো আলাদা হয়ে ভারতের আধিপত্য থেকে বাঁচতে পারব না। কাশ্মির নিয়ে পাকিস্তানের সাথে ভারতের দু’বার যুদ্ধ হয়েছে। সেই যুদ্ধে ভারত কিছুই করতে পারেনি এবং দু’বারই তারা পাকিস্তানের সাথে পরাজিত হয়েছে। কিন্তু ১৯৭১ সালে ভারত যখন যুদ্ধ লাগাল, তখন তারা জয়ী হলো এ জন্য যে, এখানে জনগণের কোনো সমর্থন পাকিস্তান পায়নি।
আওয়ামী লীগ যদি রাজনৈতিকভাবে স্বাধীনতা আন্দোলন করে যেত, তাহলে আমরা তাদের সহযোগিতা করতে পারতাম। কিন্তু তারা ভারতে গিয়ে ইন্দিরার কাছে সাহায্য চাইল স্বাধীনতা অর্জনের জন্য। ভারত তার কূটনৈতিক, সামরিক সব শক্তি ব্যবহার করল। এ পরিস্থিতিতে আমরা এটা বিশ্বাস করতে পারিনি যে, ভারতের সাহায্য নিয়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে পারব। ভারত আমাদেরকে স্বাধীন করার উদ্দেশে সাহায্য করেনি। তারা তাদের স্বার্থের কারণে আমাদের সাহায্য করেছে। তাদের স্বার্থ ছিল তিনটা : প্রথমত, পূর্ব পাকিস্তানের নেতারা ভারতকে সুযোগ দিয়েছে পাকিস্তানকে ভাগ করে দুর্বল করার। চিরদুশমন পাকিস্তানকে দুর্বল করা গেল। দুইবার যুদ্ধ করে ভারত পরাজিত হয়েছে। এবার তারা তৃতীয়বার সুযোগ পেয়েছে তার প্রতিশোধ নেয়ার এবং তাকে ভাগ করে দুর্বল করার। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল, যেহেতু বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে ভারতের পেটের ভেতরে সে জন্য তারা বাংলাদেশকে আলাদা করতে পারলে আমাদের ওপর তারা প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। তৃতীয় স্বার্থ ছিল, তারা তাদের পণ্যের বাজারে পরিণত করবে এ অঞ্চলকে।
তাদের সেই তিনটা স্বার্থই উদ্ধার হয়েছে। তিনটা স্বার্থই পূরণ হয়েছে। আমরা এই আশঙ্কা করেই স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারলাম না। আমাদের সেই আশঙ্কা দুর্ভাগ্যজনকভাবে সত্যে পরিণত হয়েছে। আমরা সর্বক্ষেত্রে স্বাধীন নেই। আমরা এখন অনেকটাই ভারতের কুক্ষিগত। ভারত যা চায় আমরা সব দিতে বাধ্য হচ্ছি। আমাদের অধিকার কিছুই দিতে চায় না তারা। আর তাদের যা ইচ্ছা তা-ই তারা চায় এবং তা-ই তারা পায়। এ অবস্থা কোনো স্বাধীন মর্যাদাশীল দেশের জন্য কাম্য হতে পারে না। আমরা এই আশঙ্কা করেছিলাম এবং এই আশঙ্কার কারণেই ১৯৭১ সালে ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান রাখার পক্ষে ছিলাম।
নয়া দিগন্ত : কিন্তু বাস্তবতা হলো পাকিস্তান ভেঙে গেল।
গোলাম আযম : আমরা পাকিস্তানকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য কোনো সুযোগই পাইনি। কোনো পথ পাইনি। বরং তারা এমন সব আচরণ জনগণের সাথে করেছে যে, জনগণ তাদের বিরুদ্ধে চলে গেছে। দুই পাকিস্তানকে তো কোনো সামরিক শক্তির মাধ্যমে একত্র করা হয়নি? সেটা জনগণের ইচ্ছার মাধ্যমে হয়েছে। কিন্তু তৎকালীন শাসকশ্রেণী অস্ত্রবলে পাকিস্তানকে এক রাখার পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ফলে আমাদের করার কিছুই থাকল না।
আমরা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিলাম কথাটার মানে পলিটিক্যালি পাকিস্তান এক থাক সেটা আমরা চেয়েছিলাম। কিন্তু সে জন্য আমরা কী করতে পেরেছি? কিছুই করতে পারিনি। আমাদের কিছু করার সুযোগও ছিল না, সামর্থ্যও ছিল না।
নয়া দিগন্ত : আপনি বলছেন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় স্বাধীনতা অর্জনের পদক্ষেপ নিলে আপনারা আওয়ামী লীগকে সহযোগিতা করতেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও তো চেয়েছিলেন আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে এবং সে জন্য তিনি আপ্রাণ চেষ্টাও চালিয়েছেন। কিন্তু পাকিস্তানের শাসক শ্রেণীই তো সে উদ্যোগ নস্যাৎ করে দিয়ে সামরিক পথ বেছে নিলো।
গোলাম আযম : যুদ্ধ করে দেশকে আলাদা করার চিন্তা শেখ মুজিবুর রহমান করেছেন বলে আমার মনে হয় না। তিনি এ রকম ঘোষণাও দেননি। যদি দিতেন তাহলে নিজে ইচ্ছা করে পাকিস্তানের হাতে গ্রেফতার হতেন না। তিনি দেশ ভাগ করতে চাননি। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা হাতে নিতে চেয়েছিলেন। সেই হিসেবে তিনি পাকিস্তানের কাছে গ্রেফতার হলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের আইনজীবী ছিলেন এ কে ব্রুহি। ১৯৭১ সালের জুন মাসে লাহোরে তার সাথে আমার দেখা হয়। তার সাথে আমার আগেই পরিচয় ছিল। আইয়ুব খানের সময় যখন জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় তখন তিনি আমাদের আইনজীবী ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, দেখেন রোগী যেমন ডাক্তারের কাছে রোগ গোপন করে না তেমনি মক্কেলও উকিলের কাছে কিছু গোপন করে না। আপনারা যদি মনে করেন শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করতে চান, দেশ ভাগ করতে চান সেটি ভুল ধারণা। আমাদের মনে হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক দিক দিয়ে কোনো চেষ্টা করবেন। কিন্তু তাজউদ্দীন সাহেবরা ভারতে গিয়ে সাহায্য চাইল, যার ফলে এ মুক্তিযুদ্ধের পথে যেতে হলো।
নয়া দিগন্ত : অর্থাৎ আপনি বলতে চাইছেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দুই ভাগ হয়ে গিয়েছিল। শেখ মুজিবুর রহমান চেয়েছিলেন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যেতে আবার আওয়ামী লীগের আরেকটি অংশ চেয়েছিল ভারতের সাহায্য নিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের পথে এগিয়ে যেতে।
গোলাম আযম : আমার মনে হয় এটাই সঠিক।
নয়া দিগন্ত : আপনারা চেয়েছিলেন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যেতে। কিন্তু ১৯৭০ সালে তো আওয়ামী লীগ বিজয় অর্জন করেছিল। সে হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হোক- এই অবস্থান কি তখন জামায়াত নিয়েছিল?
গোলাম আযম : আমি বারবার বিবৃতি দিয়েছি। সেগুলো রেকর্ডে আছে। ব্যালটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তার হাতে ক্ষমতা অর্পণ করা দরকার। এমনকি ইয়াহিয়া একবার ঘোষণা করেছিলেন যে, শেখ মুজিবুর রহমান ইজ দি ফিউচার প্রাইম মিনিস্টার অব পাকিস্তান। সংসদের অধিবেশন ডাকা হলো। প্রথম অধিবেশনেই তো সংবিধান গঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু তা হতে পারল না। প্রথম অধিবেশনই মুলতবি করে দেয়া হলো ভুট্টোর ষড়যন্ত্রে। ভুট্টো ঘোষণা করল পাকিস্তানে দুটো মেজরিটি পার্টি। এক দেশে দুটো মেজরিটি পার্ট হয় নাকি? সে বিরোধী দলের আসনে বসতে রাজি নয়। সে শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রস্তাব দিলো যে, আমার সাথে আগে পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট করো। এরপর সংসদ বসলে আমরা যাবো। সে ঘোষণা দিলো আমি তো যাবোই না বরং পূর্ব পাকিস্তান থেকে কেউ এলে করাচি এয়ারপোর্টে ঠ্যাং ভেঙে দেবো। তিনি ঠ্যাং ভেঙে দেয়ার কথা বলেছেন। এভাবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করেছেন ভুট্টো। পাকিস্তান ভাগের জন্য প্রধানত দায়ী ভুট্টো। এরপর ভুট্টোকে সহযোগিতা করার জন্য দায়ী ইয়াহিয়া খান।
নয়া দিগন্ত : পূর্ব পাকিস্তানকে ভাগ করে পাকিস্তানকে দুর্বল করার যে ষড়যন্ত্রের কথা বলা হচ্ছে, ভারত কি আগেই তা করেছিল না তারা উদ্ভূত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছে?
গোলাম আযম : সেটা আমার জানা নেই। কিন্তু আমরা দেখেছি এখানকার নেতৃবৃন্দ তাদের কাছে গিয়ে সাহায্য চাওয়ার পর তারা এ সুযোগ গ্রহণ করেছে।
নয়া দিগন্ত : আপনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। এটাকে কিভাবে দেখছেন?
গোলাম আযম : আমি তো আশ্চর্য হচ্ছি। আমরা তো যুদ্ধই করলাম না। তাহলে আমাদের যুদ্ধাপরাধী বলে কিভাবে? আমরা যুদ্ধাপরাধী হলাম কিভাবে? আমি হিসাব করে দেখেছি ১৯৭১ সালের পর থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত এরা কখনও আমাদের যুদ্ধাপরাধী বলেনি। আমাদেরকে রাজাকার গালি দিয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধী বলেছে। কিন্তু যুদ্ধাপরাধী কখনও বলেনি। তারপর যখন এরশাদের বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াত মিলে আন্দোলন করল তখন তাদের সাথে আমাদের লিয়াজোঁ কমিটি বসেছে। তখনো তারা আমাদের যুদ্ধাপরাধী বলেনি। আমাদের সহায়তা নিয়ে ১৯৯১ সালে যখন বিএনপি ক্ষমতায় এলো তখন আমরা কেয়ারটেকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি জানালাম। কেয়ারটেকার ব্যবস্থার কারণেই তো বিএনপি ক্ষমতায় এলো। যদি এরশাদের অধীনে নির্বাচন হতো তাহলে তো তিনি আবার ক্ষমতায় আসতেন। আমরা দাবি জানালাম যে, এই কেয়ারটেকার সিস্টেমটা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। কিন্তু বিএনপি এতে রাজি হলো না। ১৯৯৪ সালে মাগুরার মহম্মদপুরে উপনির্বাচনে ওই আসনটি বিএনপি দখল করল। ওখানে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি মারা যাওয়ার পর উপনির্বাচন হলো। কিন্তু নির্বাচন সুষ্ঠু হলো না। এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলেন শেখ হাসিনা। তিনি বললেন, আমরা এ সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবো না। কেয়ারটেকার সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কেয়ারটেকার সিস্টেমের জন্য আন্দোলনের ঘোষণা দিলেন। কেয়ারটেকার ইস্যু তো আমাদের ইস্যু ছিল। এ অবস্থায় আমরা যদি চুপ করে থাকি তো আমাদের রাজনীতিই শেষ। সে জন্য আমরা বাধ্য হয়ে আন্দোলনে যোগ দিলাম। এ আন্দোলন শেখ হাসিনার একলা আন্দোলন ছিল না। আমাদের মিলিত আন্দোলন ছিল। আমাদের লিয়াজোঁ কমিটির সাথে তারা নিয়মিত বৈঠক করেছেন। সেসব বৈঠকে কখনও কখনও শেখ হাসিনা অংশ নিয়েছেন। তখন আমরা যুদ্ধাপরাধী ছিলাম না।
তাহলে এ যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আমাদের বিরুদ্ধে কেন আনা হচ্ছে? এর উত্তর তালাশ করতে গিয়ে আমি দেখলাম ২০০১ সালের নির্বাচনটা ছিল চারদলীয় জোটের ভিত্তিতে। বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি আর ইসলামী ঐক্যজোট একত্র হয়ে নির্বাচন করলাম। সিদ্ধান্ত হলো এক আসনে দুই দলের কেউ থাকবে না। সেই ইলেকশনে জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ঐক্যজোট মিলে ৫০টির বেশি আসনে নির্বাচন করেনি। নির্বাচনের পর দেখা গেল আওয়ামী লীগ বিএনপি এবং উভয়ে ৪০ শতাংশ করে ভোট পেয়েছে। বিএনপি শতাংশের সামান্য কিছু ভোট বেশি পেয়েছে কিন্তু তা ওয়ান পারসেন্টও বেশি নয়। কিন্তু ফলাফলে দেখা গেল আওয়ামী লীগ পেল ৫৮, আর বিএনপি পেল ১৯৭। কেমন করে এটা হলো? ৩০০ আসনের মধ্যে আড়াই শ’ আসনে যেখানে দুই ইসলামি দলের পক্ষ থেকে কোনো প্রার্থী ছিল না সেসব আসনে সব ইসলামপন্থীর ভোট বিএনপি পেয়েছে। আওয়ামী লীগ একটিও পায়নি। সমান সমান ভোট পাওয়া সত্ত্বেও এত বড় পার্থক্য কেন হলো? হয়েছে ইসলামপন্থীদের ভোট বিএনপি একতরফাভাবে পাওয়ার কারণে।
এর পর থেকেই আওয়ামী লীগ হিসাব করে দেখল যে, জামায়াত আর বিএনপি যদি রাজনৈতিক ময়দানে এক থাকে তাহলে আওয়ামী লীগ কখনও তাদের পরাজিত করতে পারবে না। বিএনপি আর জামায়াত একত্র হলেই আওয়ামী লীগ ফেল করে। এর অনেক উদহারণ আছে।
যেমন চট্টগ্রামে মেয়র ইলেকশনে হলো। জামায়াতের প্রার্থী ছিল সেখানে। বেগম জিয়ার অনুরোধে জামায়াত যখন প্রার্থী প্রত্যাহার করল তখন লক্ষাধিক ভোট বেশি পেয়ে বিএনপি প্রার্থী পাস করল। সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন সর্বশেষ পরপর দুইবার ইলেকশনে জামায়াত বিএনপি এক হয়ে গেল আর আ’লীগ ফেল করল। এভাবে যেখানেই জামায়াত-বিএনপি এক হয় সেখানেই আওয়ামী লীগ ফেল করে।
২০০১ সালে পরাজয়ের আগে কখনও তারা আমাদের যুদ্ধাপরাধী বলেনি। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলছি। কোনো প্রমাণ তারা করতে পারবে না। এখন সেক্টর কমান্ডারদেরও তারা ব্যবহার করছে। এর আগে তারাও এ দাবি তোলেনি।
মূলত জামায়াতের প্রতি প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ এবং জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে পঙ্গু করে ফেলার জন্যই এ যুদ্ধাপরাধ বিচার চলছে যাতে জামায়াত আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মাঠে কোনো পদক্ষেপ নিতে না পারে। জামায়াতের নেতাদের ফাঁসি দিয়ে তারা জামায়াতকে নেতৃত্বশূন্য করতে চায়। এই সে দিন পাটমন্ত্রী বললেন, বিচারের দরকার নেই। এদের ফাঁসি দিয়ে ফেলো। তারা বিচারকে প্রহসন হিসেবে ব্যবহার করছে। বিচারকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছে। আসল উদ্দেশ্য হলো জামায়াতকে খতম করা।
নয়া দিগন্ত : আপনার বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দেয়া হয়েছে ট্রাইব্যুনালে। সেখানে আপনার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী এবং গণহত্যায় নেতৃত্ব দানের অভিযোগসহ নির্দিষ্ট করে আরো অনেক অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
গোলাম আযম : এগুলো অভিযোগ নয়, আমি একে অপবাদ বলি। এর একটাও অভিযোগ নয় এবং এর একটাও তারা প্রমাণ করতে পারবে না। মাওলানা সাঈদী ও মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে যে মিথ্যা অভিযোগ বানিয়েছে, সেগুলো যেমন, অপবাদ আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে সেগুলোও অপবাদ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নাকি ৩৮ জনকে জেল থেকে বের করে হত্যা করেছি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আমি সে সময় গিয়েছি এ কথা তারা প্রমাণ করতে পারবে না। ১৯৭১ সালে কখনও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যাইনি। আমার তখন কী ক্ষমতা ছিল যে, আমি তাদের অর্ডার দিলাম আর তারা তাদের জেল থেকে ছেড়ে দিলো? আমার হাতে কী ক্ষমতা ছিল যে, যত গণহত্যা হয়েছে তা সব আমার নির্দেশে হয়েছে? গণহত্যা তো করেছে পাকিস্তান আর্মি। এ গণহত্যায় আমি ভূমিকা পালন করলাম কিভাবে?
নয়া দিগন্ত : তাদের বক্তব্য হচ্ছে আপনারা আর্মিকে সহযোগিতা করেছেন?
গোলাম আযম : কেমন করে? সহযোগী হওয়ার তো কোনো সুযোগই ছিল না।
নয়া দিগন্ত : রাজাকার আলবদর এসব বাহিনীর মাধ্যমে আপনারা সহযোগিতা করেছেন বলে অভিযোগ...
গোলাম আযম : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাগজপত্র তালাশ করলে পাওয়া যাবে কিভাবে রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়েছে। পুলিশের যেমন সহযোগী বাহিনী আছে আনসার, তেমনি পাকিস্তান পুলিশের সহযোগী বাহিনী হিসেবে গঠন করা হয়েছিল রাজাকার বাহিনী। তাদের তখন অনেক সহযোগী ফোর্স দরকার ছিল। বর্তমান থানা কর্মকর্তাকে ইউএনও বলা হয়। তখন বলা হতো সার্কেল অফিসার। এসব সার্কেল অফিসারদের মাধ্যমে ইউনিয়ন বোর্ডে ঢোল পিটিয়ে রাজাকার বাহিনীতে জনবল রিক্রুট করা হয়েছে। এটা করা হয়েছে সরকারিভাবে। আমরা করলাম কিভাবে?
নয়া দিগন্ত : অর্থাৎ রাজাকারদের যেসব অপরাধ আপনাদের ওপর চাপানো হচ্ছে, আপনি বলছেন, সেগুলোও পাকিস্তান আর্মির অপরাধের একটা অংশ?
গোলাম আযম : অবশ্যই সমস্ত কর্মকা ের দায়ভার পাকিস্তান আর্মির।
নয়া দিগন্ত : রাজাকার ছাড়াও পিস কমিটি, আলবদর আলশামস প্রভৃতি বাহিনীও আপনার নেতৃত্বে গঠিত এবং পরিচালিত হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
গোলাম আযম : এ সবই অপবাদ। মার্চের পরে নেজামে ইসলাম পার্টির অল পাকিস্তান সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন ফরিদ আহমেদ। তিনি আমার বাড়িতে এলেন। এসে বললেন যে, আমরা যেসব রাজনৈতিক দলে আছি, একসাথে বসে একটু পরামর্শ করি। আমরা টিক্কা খানের কাছে গেলাম। আমরা বললাম আর্মিকে জনগণের মধ্যে ছেড়ে দিলে তারা বাড়াবড়ি করবেই। কারণ অস্ত্রের একটা নিজস্ব ভাষা আছে। এখন যে পাবলিকের ওপর সেনাবাহিনী জুলুম-অত্যাচার করছে, এর জন্য তারা কার কাছে যাবে? আওয়ামী লীগের লোকজন তো সব ভারতে চলে গেছে। এখন জনগণ আমাদের কাছে আসে। আমরা তাদেরকে কিভাবে সাহায্য করব। মুসলিম লিগের খাজা খায়রুদ্দিন, কৃষক শ্রমিক পার্টির এ এস এম সোলায়মান, জামায়াতের আমি এবং নেজামে ইসলাম পার্টির ফরিদ আহমেদ। এ ক’জন আমরা গেলাম। আমরা বললাম ২৫ মার্চ আপনারা যেটা করেছেন, এর মাধ্যমে আপনারা জনগণকে পাকিস্তানবিরোধী বানিয়ে দিচ্ছেন। তারা বলল, যে বিদ্রোহ শুরু হয়েছে তা দমনের জন্য এটা করা ছাড়া আমাদের উপায় ছিল না। তারা অগ্নিসংযোগ শুরু করেছে। নয়াবাজারে কাঠের দোকানে আগুন লাগিয়েছে। দুই দিন ধরে জ্বলেছে। আমরা এ নিয়ে আপত্তি করলে তিনি বললেন, এ রকম আর হবে না। এটা আমরা করতে বাধ্য হয়েছি বিদ্রোহ দমন করার জন্য। সামনে আর এ রকম হবে না। আমাদের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে বললাম, আমরা এ রকম একটা সুযোগ চাই যে, জনগণ আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ করলে আমরা আপনাদের সাথে যোগাযোগ করে প্রতিকারের চেষ্টা করতে পারি। তখন তিনি ব্রিগেডিয়ার রাও ফরমান আলীকে ডাকলেন। তিনি গভর্নর হাউজে বসতেন। টিক্কা খান গভর্নর হলেও তিনি মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ছিলেন। তিনি বঙ্গভবনে বসতেন না। ক্যান্টনমেন্টে বসতেন। আমরা ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে দেখা করেছি। তিনি রাও ফরমান আলীকে বললেন, ওনাদের সব টেলিফোন নম্বর দিয়ে দেন যাতে তারা যোগাযোগ করতে পারেন। আমার কয়েকটা ঘটনার কথা স্পষ্ট মনে আছে। আমার কাছে কেস আসছে আমি ফরমান আলীকে জানিয়েছি। কাকরাইলে যে সার্কিট হাউজ আছে সেখানে বসতেন ব্রিগেডিয়ার কাসেম নামে একজন। তিনি ব্রিগেডিয়ার কাসেমের কাছে রেফার করে দিলেন। তার কাছে অভিযোগ গেলে তিনি প্রতিকার করতেন। আমরা এ ছাড়া তখন আর কিছুই করতে পারিনি।
এত লোক ভিড় করত আমার বাড়িতে যে, আমি কোনো অবসর পেতাম না। আমার হার্টে সমস্যা অনুভব করলাম। ডাক্তারের কাছে গেলাম। ডাক্তার বললেন আপনার বয়স ৪০ পার হয়েছে। আপনি দুপুরে খাবারের পর অবশ্যই এক ঘণ্টা বিশ্রাম নেবেন শুয়ে। কিন্তু আমি সে বিশ্রাম নিতে পারিনি। লোক আসতেই থাকত। এ ধরনের সাহায্য ছাড়া ১৯৭১ সালে আমরা আর কিছুই করতে পারিনি।
নয়া দিগন্ত : অর্থাৎ আপনি বলছেন পাকিস্তান আর্মির যে নিপীড়নমূলক ভূমিকা ছিল সেগুলো থেকে জনগণকে রক্ষার জন্যই আপনারা কাজ করেছেন।
গোলাম আযম : ততটুকুই আমরা করেছি যতটুকু আমাদের কাছে অভিযোগ আসত। মুক্তিবাহিনী এসে কোনো পুল উড়িয়ে দিলো পাকিস্তান আর্মির চলাচলে অসুবিধা সৃষ্টির জন্য। তখন পাকিস্তান আর্মি এসে ওই গ্রামটা জ্বালিয়ে দিলো। তখন আমাদের সেখানে কী করণীয় ছিল। এ ধরনের ঘটনায় আমরা কিছুই করতে পারিনি। ব্যক্তিগতপর্যায়ে যেগুলো এসেছে সেগুলো আমরা সমাধান করতে পেরেছি।
নয়া দিগন্ত : আপনার আগের কথার জের ধরে এখানে আরেকটি প্রশ্ন করতে চাই। আপনি বলেছেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর আপনি শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানিয়ে বক্তব্য-বিবৃতি দিয়েছেন এবং আপনি এটার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু এ দেশের মানুষের দাবি আদায়ের রাজপথমুখী যে আন্দোলন-সংগ্রাম ছিল, সেখানে কি আপনাদের কোনো অংশগ্রহণ বা কর্মসূচি ছিল?
গোলাম আযম : আমাদের শক্তি ও অবস্থান তখন কতুটুক ছিল? নির্বাচনে আমরা একটি আসনও পাইনি। প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে শুধু বগুড়ায় একটি আসন পেয়েছিলাম। কেন্দ্রে কোনো আসন পাইনি। জামায়াতে ইসলামী তখন খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো রাজনৈতিক দল হয়ে উঠতে পারেনি।
নয়া দিগন্ত : যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের চার্জশিটে আপনার নির্দেশে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৩৮ জন জেলবন্দী হত্যার অভিযোগ ছাড়াও সিরু মিয়া নামে একজনকে আপনার নির্দেশে হত্যা করা হয়েছে বলে নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে।
গোলাম আযম : এ রকম নাম আমি কোনো দিন শুনিনি। আমি কোনো পত্র দিয়েছি তা তারা প্রমাণ করুক। আমি চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি তারা প্রমাণ করুক।
নয়া দিগন্ত : আপনার নির্দেশে ৩৮ জন জেলবন্দীকে হত্যা করার অভিযোগ?
গোলাম আযম : আমি সরকারের কোনো কর্তা ছিলাম না কি যে নির্দেশ দেবো?
নয়া দিগন্ত : ১৯৭১ সালের বিভিন্ন ঘটনা বিষয়ে সংগ্রাম পত্রিকার রেফারেন্স দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে আপনার নামে যেসব খবর ও উদ্ধৃতি প্রচার করে, তা কি সঠিক?
গোলাম আযম : তারা কী প্রচার করে আর আমি কী বলেছিলাম তা না দেখলে বলতে পারব না। আমার কোন্ কথাটাকে তারা আমার বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে তা না দেখে বলতে পারছি না।
নয়া দিগন্ত : আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষপর্যায়ে পরাজয় নিশ্চিত জেনে আপনি লন্ডনে পালিয়ে যান। আপনার বক্তব্য কী?
গোলাম আযম : ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলো। ২০ নভেম্বর রমজান শেষ হলো। ঈদের পরের দিন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় ওয়ার্কিং কমিটির মিটিংয়ে যোগ দিতে আমি লাহোর গেলাম। জামায়াতের হেডকোয়ার্টার তখনো ছিল লাহোর। এরপরে আমি ইয়াহিয়া খানের সাথে দেখা করতে গেলাম। এ কথা বলার জন্য যে, আপনি দেশের প্রেসিডেন্ট, পূর্ব পাকিস-ানে কী হচ্ছে আপনি গিয়ে দেখেন। এ জন্য কয়েক দিন সময় লাগল আমার সেখানে। এভাবে আমি ৩ ডিসেম্বর রওনা দিলাম করাচি থেকে পিআই-এর প্লেনে, এটিই পিআই-এর শেষ প্লেন ছিল। ৩ ডিসেম্বর ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্স থেকে ঢাকা এয়ারপোর্টে বোমা ফেলা হয়েছে। এয়ারপোর্ট বন্ধ হয়ে গেছে। তখন ইন্ডিয়ার সাথে যে সম্পর্ক ছিল তাতে ইন্ডিয়ার ওপর দিয়ে প্লেন আসতে দিত না, পাকিস-ানের প্লেন আসত শ্রীলঙ্কা হয়ে। প্লেন কলম্বো এলো। তিন ঘণ্টা পর প্লেন আবার উড়ল। তখন ক্যাপটেন ঘোষণা করল যে, করাচি এবং ঢাকা এয়ারপোর্টের কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়, যুদ্ধ বেধে গেছে। আমাদের প্লেনকে বলা হলো আমরা তেহরান বা জেদ্দায় গিয়ে যেন আশ্রয় নেই। এইভাবে আমার প্লেন জেদ্দায় চলে গেল। এরপরে ১০ ডিসেম্বর ইন্ডিয়া পাকিস-ান সিজফায়ার করল, একদিন যুদ্ধ বন্ধ থাকবে ঘোষণা করল, যাতে বিদেশীরা চলে যেতে পারে, সেই দিন সেই ১০ তারিখে আমার প্লেন জেদ্দা থেকে করাচি এলো। এভাবে আমি পাকিস-ানে আসি। ৩ ডিসেম্বর আমার প্লেন নামতে পারল না, তারপর জেদ্দায় চলে গেলাম, তারপরে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেল, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। পাকিস্তান থেকে পরে লন্ডন যাই।
নয়া দিগন্ত : আমরা বর্তমান পরিস্থিতিতে আসি। কেয়ারটেকার সরকারব্যবস্থার ধারণা আপনি প্রথম দিয়েছিলেন। এখন এটি বাতিল করা হয়েছে। আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
গোলাম আযম : আওয়ামী লীগ স্থায়ীভাবে ক্ষমতায় থাকার জন্য এটা করেছে।
নয়া দিগন্ত : অনেকে মনে করেন কেয়ারটেকার ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশে ১/১১ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। আপনি কী বলেন?
গোলাম আযম : মোটেই না। ১১ জানুয়ারির ঘটনা তো ঘটেছে কেয়ারটেকার সরকারপ্রধান কে হবে তা নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে মারামারির কারণে। সাবেক প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানকে কেয়ারটেকার প্রধান করা হবে কি হবে না তা নিয়েই তো সমস্যার সৃষ্টি হলো। তিনি যখন এ পদ গ্রহণে রাজি হলেন না তখন ইয়াজউদ্দিনকে কেয়ারটেকারের কর্তা বানানো হলো। আওয়ামী লীগ তো তখন সন্ত্রাসী আন্দোলন করল। তারা এমন সন্ত্রাসী আন্দোলন চালাল যে, সরকার অচল হয়ে গেল। তখন সেনাপ্রধান এর সুযোগ গ্রহণ করেছেন। কেয়ারটেকার সিস্টেমের তো কোনো দোষ নেই। ২০০৭ সালে ১১ জানুয়ারি ঘটনার আগে এর অধীনে তিনটি নির্বাচন হয়েছে। সেগুলো হলো কিভাবে তাহলে?
নয়া দিগন্ত : কেয়ারটেকার সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় যে অভিযোগ তা হলো- গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল যে স্পিরিট তার সাথে এটা সাংঘর্ষিক। অর্থাৎ একটা নির্বাচিত সরকারের প্রতি আস্থার যে জায়গা সেখানে আঘাত করা। আপনার বক্তব্য কী?
গোলাম আযম : আস্থার অভাবের কারণেই তো এটা এলো। এটা করার আগে আমি চিন্তা করে দেখলাম বাংলাদেশ হওয়ার পরে প্রথম নির্বাচন হলো শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে, ১৯৭৩ সালে। সেটা মোটেই ফেয়ার ইলেকশন ছিল না। ছয়টা বাদে সব আসন তারা দখল করল। এরপরে ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমান সরকারের অধীনে যে নির্বাচন হলো সেটা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। কেয়ারটেকার ধারণা রাজনীতিবিজ্ঞানে অনেক আগে থেকেই ছিল। নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে তারা কেয়ারকেটার সরকার হিসেবে পরবর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার আগ পর্যন্ত দৈনন্দিন রুটিন কাজ করত। রাজনৈতিক কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা তাদের থাকত না। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করা তাদের প্রধান কাজ ছিল। সরকার তখন থাকবে নাম মাত্র। এটাই ছিল তখন কেয়ারটেকার সরকার। কিন্তু তা হলেও সেটা ছিল পলিটিক্যাল এবং দলীয় কেয়ারটেকার সরকার। আমি তখন চিন্তা করলাম এই কেয়ারটেকার সরকার যদি নির্দলীয় ও অরাজনৈতিক হয় তাহলে ফেয়ার ইলেকশন সম্ভব। জাস্টিস সাহাবুদ্দীন সাহেবের অধীনে যে দুইটা ফেয়ার ইলেকশন হয়েছে, এ রকম ফেয়ার ইলেকশন অতীতে কখনও হয়নি। এর পরেও হয়নি।
নয়া দিগন্ত : নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার মাধ্যমেও তো এটা করা যেতে পারে।
গোলাম আযম : এটা হতে পারে যদি রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করে। তাদের যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া হয় তাহলে সম্ভব। কিন্তু এখনো সেটা হয়নি।
নয়া দিগন্ত : আপনি বললেন কেয়ারটেকার সিস্টেম নিয়ে সমস্যা হয়নি। সমস্যা হয়েছে পদে কাকে বসানো হবে তা নিয়ে। এখানেও একটি অভিযোগ উঠেছে তা হলো- প্রধান বিচারপতি নিয়োগ নিয়ে রাজনীতি চালু হয়েছে। বিচারব্যবস্থা কলুষিত হচ্ছে কেয়ারটেকার সরকারপ্রধান কে হবেন তা ঠিক করতে গিয়ে।
গোলাম আযম : কেয়ারটেকার সরকার কে হবে তা নিয়ে যদি সমস্যা হয় তাহলে এর প্রধান কে হবেন তা নিয়ে পুনরায় আলোচনা করা যেতে পারে। কেয়ারটেকার সরকার সিস্টেম নিয়ে সবাই মিলে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান বের করা সম্ভব বলে আমি মনে করি। প্রধান বিচারপতি ছাড়া আর কাকে প্রধান করা যায় তা আলোচনা করলে অবশ্যই সমাধান বের করা সম্ভব। আগের পদ্ধতি যদি ঠিক না হয় তাহলে আলোচনা করে সমঝোতা করা হোক। আপত্তি তো নেই কিছু।
নয়া দিগন্ত : বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?
গোলাম আযম : বাংলাদেশে তো রাজনীতি নেই। নির্বাচন কমিশনে যেসব নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল আছে তার মধ্যে জামায়াতে ইসলামী একটা। সংসদে তাদের প্রতিনিধি আছে। এই দলটাকে জনসভা করতে দিচ্ছে না। মিছিল করতে দিচ্ছে না। রাস্তায় দাঁড়াতে দিচ্ছে না। রাস্তায় দাঁড়ালে পুলিশের সাথে ধাক্কাধাক্কি হলে পুলিশের কাজে বাধা দেয়ার নাম করে গণহারে তাদের গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে। মিথ্যা মামলা দিচ্ছে। বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে আসা হচ্ছে। অফিসে বসে মিটিং করলে বলে গোপন বৈঠক করছে। সেখান থেকে তাদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। জামায়াত তো কোনো বেআইনি দল নয়। দলীয় বৈঠক তারা গোপনে করবে না তো কি পুলিশ ডেকে তাদের সামনে করবে? কিন্তু বলা হচ্ছে তারা গোপন বৈঠক করছে, ষড়যন্ত্র করছে। ধরে নিয়ে মিথ্যা মামলা দিচ্ছে। রাজনীতি তো তারা করতে দিচ্ছে না। এমনকি আওয়ামী লীগের ক্যাডাররাও পুলিশের সাথে মিলে জামায়াতের ওপর হামলা চালায়। জনসভায় ভাঙচুর করে। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের আবাসিক হল থেকে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ছাত্রলীগের লোকজন মারধর করে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে জঙ্গি বলে। তারাই ধরে মারে আবার পুলিশের হাতে তুলে দেয়। এটা কোন ধরনের রাজনীতি? রাজনীতি করতে দেয়া হচ্ছে না। এখন দেশে চলছে নির্বাচিত স্বৈরশাসন। বাকশাল টাইপের শাসন চলছে। এটাকে আরো স্থায়ী করার জন্য তারা তাদের দলের অধীনে নির্বাচন করতে চায়। ভারত যা চায় তা-ই তারা দিয়ে দিচ্ছে। শুধু দিচ্ছে না, উৎসাহের সাথে দিচ্ছে। আমার আশঙ্কা আবার তারা ক্ষমতায় এলে এটাকে ভারত না জানি আবার অঙ্গরাজ্য করে ফেলতে চায় কি না।
নয়া দিগন্ত : বিরোধী দল তো সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে।
গোলাম আযম : আমি জনগণের কাছে বলতে চাই- যে ধরনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমরা পড়েছি তা থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য বিরোধী দল যে আন্দোলন শুরু করেছে- তাতে জনগণকে ব্যাপকভাবে সাড়া দিতে হবে। জনগণ যদি আন্দোলনে ব্যাপকভাবে সাড়া দেয় এবং এর ফলে এ সরকারের পতন হয় তাহলে এরপর একটা ফেয়ার ইলেকশন আশা করা যায়। এটি হলেই বাংলাদেশের ভবিষ্যতের সম্ভাবনা আছে। তা না হয়ে যদি আওয়ামী লীগের হাতে এভাবে দেশকে ছেড়ে দেয়া হয় এবং তারা দলীয়ভাবে নির্বাচন করে আবার ক্ষমতায় আসে তাহলে তাদের বাড়াবাড়ি তো আরো বেড়েই যাবে এবং এরপরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষা করাই কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেবে।
নয়া দিগন্ত : আপনার বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। আপনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হতে পারে মামলার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে। আপনার মনের অবস্থা কেমন?
গোলাম আযম : জীবনে অনেকবার গ্রেফতার হয়েছি। মুমিন তো মৃত্যুকে ভয় করে না। যদি অন্যায়ভাবে আমাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয়, তাহলে মনে করব শহীদ হওয়ার গৌরব অর্জন করতে যাচ্ছি। ইসলামি আন্দোলনের একজন কর্মী হিসেবে আমি শাহাদতের মৃত্যু কামনা করেছি সারা জীবন। সুতরাং ভয় কিসের? আমি প্রস'ত আছি।
নয়া দিগন্ত : আপনাকে ধন্যবাদ।
গোলাম আযম : নয়া দিগন্তকেও ধন্যবাদ।










জামায়াতে ইসলামের নায়েবে আমীর খ্যাতিমান আলেম মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দেয়া দ্বিতীয় সাক্ষী রুহুল আমিন নবিনের জেরা আজ রোববার শুরু হয়েছে। জেরায় রুহুল আমিন নবীন স্বীকার করেছেন মামলা বিষয়ে তিনি ৭-৮ মাস আগে অবহিত হলেও জবানবন্দি দিয়েছেন ২০১০ সালের মার্চ মাসে। এ স্বীকরোক্তি অনুযায়ী তিনি মামলার আগেই জবানবন্দি দিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে। মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে মামলা হয় ২০১০ সালের ২০ জুলাই।
রুহুল আমিন নবিন মামলায় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি বিষয়ে বলেন, ২০১০ সালের মার্চ মাসে তদন্ত কর্মকর্তা পিরোজপুর গেলে তার সাথে পরিচয় হয় এবং তখনই তিনি জবানবন্দি দেন।
এ ছাড়া সাক্ষী রুহুল আমিন নবীন গত ৮ ডিসম্বের ট্রাইব্যুানালে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষী দেয়ার সময় নিজের বয়স উল্লেখ করেন ৬১ বছর। কিন্তু আজ তিনি জেরার স্বীকার করেছেন জন্মসনদে তার জন্মতারিখ লেখা আছে ৩০/১১/১৯৫৬। সে অনুযায়ী বর্তমানে তার বয়স দাঁড়ায় ৫৫ বছর। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরুর সময় তিনি সবে মাত্র ১৫ বছরে পা রাখেন। তাকে প্রশ্ন করা হয় তিনি কোন সালে এসএসসি পাশ করেন। জবাবে তিনি বলেন সম্ভবত ১৯৭০ সালে। তখন তার বয়স হয় ১৪ বছর।
রুহুল আমিন নবিন নিজেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স পাস করেছেন দাবি করলেও সার্টিফিকেট দেখাতে পারেননি। সিডরের সময় সার্টিফিকেট নষ্ট হয়েছে বলে দাবী করেন তিনি।
নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবী করলেও রুহুল আমিন ননিব পিরোজপুর জেলার একটি থানারও রাজাকার, আলবদর, পিস কমিটির দায়িত্বরত নেতাদের নাম বলতে পারেননি। তিনি ২০০৫ সালে মুক্তিযোদ্ধা সংসদে অন্তর্ভুক্ত হন বলে জানান।
আজ মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আইনজীবী মিজানুল ইসলাম এবং কফিলউদ্দিন খান সাক্ষী রুহুল আমিন নবিনকে জেরা করেন। তাদের সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম, মুন্সি আহসান কবির, ব্যারিস্টার তানভির আল আমিন প্রমুখ। জেরার সময় আদালত কক্ষে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, তার চার ছেলে, ভাই ও অন্য আত্মীয়-স্বজন উপস্থিত ছিলেন। ( বিস্তারিত আসছে)


দৈনিক সংগ্রামের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রফেসর গোলাম আযম
২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতেই এখন যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে প্রহসন করা হচ্ছে

মগবাজারের কাজী অফিস লেনস্থ বাসভবনে দৈনিক সংগ্রামের সাথে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন ভাষা সৈনিক জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর প্রফেসর গোলাম আযম -আবদুল আজিজ ফারুকী
সামছুল আরেফীন : ভাষা সৈনিক, জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর প্রফেসর গোলাম আযম তার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগকে অপবাদ উল্লেখ করে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেছেন, আমার বিরুদ্ধে কোন একটা অপবাদও তারা প্রমাণ করতে পারবে না। তিনি বলেন, ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতেই এখন যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে প্রহসন করা হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীকে রাজনৈতিকভাবে উৎখাত করতে নেতৃত্ব শূন্য করার জন্য যুদ্ধাপরাধের বিচারের বাহানা শুরু হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী যাতে রাজনৈতিক ময়দানে ভূমিকা রাখতে না পারে এ জন্যই এখন বিচার শুরু করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, পাকিস্তান হওয়ার পর ভারতের আচরণ দেখেই আমরা চিন্তিত ছিলাম। নিশ্চিত ভারতের হাত ধরে আমরা স্বাধীনতা পাবো না। আমরা হয়তো আলাদা হতে পারবো, কিন্তু তারা সত্যিকারের স্বাধীন হতে দিবে না। বাংলাদেশ হওয়ার পর আমাদের সেই আশংকাই সত্য প্রমাণিত হলো। যদি ভারতের সাহায্য ছাড়া স্বাধীনতা যুদ্ধ হতো, তাহলে আমরাই সবার আগে এ যুদ্ধে অংশ নিতাম। তিনি উল্লেখ করেন, মৃত্যু মু'মিনের জন্য ভয়ের জিনিস নয়। আল্লাহ ছাড়া তো কাউকে ভয় পাওয়া জায়েজই নেই।
গত বুধবার রাতে দৈনিক সংগ্রামকে দেয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে, তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু, আন্দোলন, সংগ্রাম, কারাবরণ, স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে তার ভূমিকা, বর্তমানে যুদ্ধাপরাধের বিচার। তিনি খোলামেলা তার বক্তব্য তুলে ধরেছেন।
সাক্ষাৎকারের পূর্ণ বিবরণী নিচে তুলে ধরা হলো:
দৈনিক সংগ্রাম : আপনার রাজনৈতিক জীবন কীভাবে শুরু হয়?
প্রফেসর গোলাম আযম : ছাত্র জীবন থেকেই আমি পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলাম। ১৯৪০ সালের দিকে আমি যখন ৮ম শ্রেণীতে পড়ি তখন থেকেই আমি পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় হই। ১৯৫৪ সালের আগে আমি কোন রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত ছিলাম না। ৫৪ সালে আমি জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করি।
দৈনিক সংগ্রাম : জামায়াতে ইসলামীর প্রতি পাকিস্তান সরকারের ভূমিকা কেমন ছিল?
প্রফেসর গোলাম আযম : পাকিস্তান সরকার তো ১৯৪৮ সালে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করলো। ১৯৫৩ সালে মাওলানা মওদুদীর ফাঁসির হুকুম দিলো। এরপর আইয়ুব খানের আমলে জামায়াতে ইসলামীকে বেআইনী ঘোষণা করলো। সুপ্রিম কোর্ট জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে রায় দিলো। আসলে পাকিস্তান সরকার হামেশাই জামায়াতে ইসলামীকে দমন করার চেষ্টা করেছে।
দৈনিক সংগ্রাম : আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলনে আপনার ভূমিকা কী ছিল? এ সময় অন্যান্য দলের সাথে আলোচনা বা যোগাযোগ হতো কী না?
প্রফেসর গোলাম আযম : স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের সময় বিরোধী দল কয়েকবারই ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করেছে। প্রথম ৫৮ সালে সামরিক আইন জারি করে। এর বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম পার্টি, আওয়ামী লীগ, মুসলিম লীগ ও ডেমোক্রেটিক পার্টি মিলে কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টি (cop) গঠন করে। এরপর ১৯৬৬ সালে পিডিএম গঠিত হয়। এখানেও ওই দলগুলো ছিল। কপের সময় এক মাস একেক দল নেতৃত্বের দায়িত্বে থাকতো। পিডিএম এর সময় পূর্ব পাকিস্তানের সভাপতি ছিলেন এডভোকেট আবদুস সালাম খান। আমি ছিলাম প্রাদেশিক সেক্রেটারি। পিডিএম এর সভাপতি ছিলেন আওয়ামী লীগের নাসরুল্লাহ খান, সেক্রেটারি ছিলেন ডেমোক্রেটিক পার্টির মাহমুদ আলী। এভাবে আরো অগ্রসর হলে এই ৫ দলের সাথে আরো ৩ দল মিলে ডাক (ডেমোক্রেটিক এ্যাকশান কমিটি) গঠিত হয়। নতুনভাবে যুক্ত ৩টি দল হলো অলি খানের ন্যাপ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম আর আওয়ামী লীগের দুইভাগের একটি অংশ কপে ছিল না, তারা এখানে এসে যুক্ত হয়।
সে সময় আমরা এক সাথে আলাপ আলোচনা, সভা-সমাবেশ করতাম। আইয়ুব খানের রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সেও আমরা সব দলের সাথে অংশগ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা দেয়ার কারণে সেই কনফারেন্স ব্যর্থ হয়ে যায়। আইয়ুব খান সেনা প্রধান ইয়াহইয়া খানের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেন। দেশ আবারো মার্শাল ল'র অধীনে চলে যায়।
দৈনিক সংগ্রাম : আপনার গ্রেফতারের কথা শুনা যাচ্ছে। আপনি বলেছেন, আগে বহুবার জেলে গেছেন। কতবার, কী কারণে আপনি জেলে গিয়েছেন?
প্রফেসর গোলাম আযম : ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় প্রথম আমি রংপুরে গ্রেফতার হই। ভাষা আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ততার জন্যই আবারো ১৯৫৫ সালে আমি গ্রেফতার হই। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান সরকার যখন জামায়াতে ইসলামীকে বেআইনী ঘোষণা করে, তখন আমি লাহোরে ছিলাম কেন্দ্রীয় শূরার সভার জন্য। সেখানে আমি আবারো গ্রেফতার হই। এর ২ মাস পর আমাকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়। এ সময় ৫ মাস আমি জেলে ছিলাম। একটা কথা আমি এখানে উল্লেখ করতে চাই, তাহলো জেলে যাওয়ার পর প্রত্যেক বারই আমি উচ্চ আদালতে রিট করে মুক্ত হই।
সর্বশেষ ১৯৯২ সালে আমাকে গ্রেফতার করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে আমার নাগরিকত্ব বাতিল করে। ১৯৯১ সালে বিএনপি আমাকে বিদেশী নাগরিক হিসেবে গ্রেফতার করে। এ সময় আমি ১৬ মাস জেলে ছিলাম। ১৯৯৩ সালের জুন মাসে বিদেশী নাগরিক হিসেবে যে মামলা করে সরকার, এতে তারা হেরে যায়। উচ্চ আদালতের নিদের্শে আমি মুক্ত হই। কিন্তু তখনও নাগরিকত্ব পুনঃবহালের মামলা বাকী ছিল। এ ব্যাপারে দুই বিচারক দুই রকম রায় দেন। এরপর তা তৃতীয় বিচারপতির কাছে গেলে তিনি আমার পক্ষে রায় দেন। সরকার এর বিরুদ্ধে আপিল করে। এক বছর পর ১৯৯৪ সালের ২২ জুন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ৫জন বিচারপতির সমন্বয়ে পুূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে সর্বসম্মতিক্রমে আমার নাগরিকত্ব বহালের আদেশ দেন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের অর্ডারকে বেআইনী ঘোষণা করেন। দীর্ঘ ২১ বছর পর আমি নাগরিকত্ব ফিরে পেলাম। এভাবেই আমি ৪ বার জেলে গেলাম।
দৈনিক সংগ্রাম : ৭০ এর নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমান একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করার পর তার হাতে ক্ষমতা দেয়া হয়নি। সে সময় আপনার ভূমিকা কী ছিল?
প্রফেসর গোলাম আযম : জুলফিকার আলী ভুট্টো ওখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলো কিন্তু একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। এখানে একটা আসনও পায়নি। আর শেখ মুজিবুর রহমান এখানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেন। ইয়াহইয়া খান ঘোষণা করলেন শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে দায়িত্ব দেয়া হবে। কিন্তু এজন্য যে ধরনের প্রক্রিয়া করা দরকার ছিল তা করেননি। এসেম্বলী ডাকা হয়নি। পরে ৭১ সালের ৩রা মার্চ ঢাকায় এসেম্বলী কল করলেন ইয়াহইয়া খান। কিন্তু এতে ভুট্টো আপত্তি করলো। তিনি বিরোধী দলে যেতে রাজি হচ্ছিলেন না। ক্ষমতার অংশীদারিত্ব চাচ্ছিলেন। তার বক্তব্য হচ্ছে পাকিস্তানে দুইটি মেজরিটি দল। এক দেশে দুই মেজরিটি হয় কী করে? ভুট্টো বলছিল, আমি এখানে (পশ্চিম পাকিস্তান) শাসন করবো আর মুজিব ওখানে (পূর্ব পাকিস্তান) শাসন করবে। ভুট্টো শেখ মুজিবকে বলছিল, আগে আমার সাথে রাজনৈতিক সমঝোতা করো, তা না হলে আমরা তো ঢাকার এসেম্বলীতে যাবোই না, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কাউকে যেতে দিবো না। কেউ গেলে ঠ্যাং ভেঙ্গে ফেলবো। এভাবে ভুট্টো একটা সংকট সৃষ্টি করলো। ইয়াহইয়া খান অধিবেশন মুলতবি করলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে কোন ধরনের আলোচনা ছাড়াই ভুট্টোর চাপে ইয়াহইয়া খান অধিবেশন মুলতবি করলেন। এতে শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিবাদ করলেন এবং পাল্টা প্রশাসন কায়েমের উদ্যোগ নিলেন।
আমার স্পষ্ট মনে আছে, ওই সময় পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমানে বাংলাদেশ) সরকার শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে চলে আসলো। এখানে ইয়াহইয়া খানের হাতে ক্ষমতা ছিল না। তিনি ৩২ নম্বরের বাড়ী থেকে সচিবদের দিক নিদের্শনা দিতেন। সচিবরা ওখানে গিয়ে ডিকটেশন নিয়ে আসতেন। ব্যাংক কবে খুলবে, কবে বন্ধ হবে তা তিনিই ঠিক করে দিতেন। তিনি যদি সে সময় স্বাধীনতা ঘোষণা করতে চাইতেন, তাহলে করতে পারতেন। তিনি আলাদা হতে চাইলে ইয়াহইয়া খান তা ঠেকাতে পারতো না। তিনি তো পুরো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি এ দেশের মানুষের দাবি অধিক উসুল করবেন। তবে তিনি মনে মনে আলাদা হতে চাইতেন কিনা তা বলতে পারবো না।
সে সময় আমি বারবার বক্তৃতা বিবৃতির মাধ্যমে বলে আসছিলাম, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার জন্য। প্রথম তো সংবিধান করার কথা ছিল। তা যেহেতু হলো না, তাই আমি বললাম, নির্বাচন তো হলো। নির্বাচিত দলের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিন। আর ভুট্টো যা করছিল, আমি তারও প্রতিবাদ জানিয়েছি।
দৈনিক সংগ্রাম : ২৫ মার্চের ক্র্যাক ডাউনের পরে যে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়, এই স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্পর্কে বা তার প্রস্তুতি সম্পর্কে কিংবা কীভাবে সম্মিলিত চেষ্টায় স্বাধীনতা যুদ্ধ করা যায়। এ ব্যাপারে স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান কি আপনার বা আপনাদের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোন আলোচনা করেছিলেন কিনা?
প্রফেসর গোলাম আযম : সরাসরি যোগাযোগ ছিল না। মুজিব-ইয়াহইয়া সংলাপের সময় শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তাজউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম থাকতেন। ইংরেজী ভালো জানতেন বলে আওয়ামী লীগের স্পোকস ম্যান হিসেবে সৈয়দ নজরুল ইসলামই ইয়াহইয়া খানের সাথে কথা বলতেন। শেখ মুজিবুর রহমান পাশে থাকতেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম রাতে আমাদের এই মহল্লায়ই থাকতেন। ৪৮ সালে আমরা যখন এ জায়গা কিনি তখন সৈয়দ নজরুল ইসলামের সমন্দি ইঞ্জিনিয়ার জামান সাহেব একজন শরীক ছিলেন। জামান সাহেবরা ৭ ভাই ও এক বোন ছিল। সৈয়দ নজরুল ইসলাম তার বোনকে বিয়ে করেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম যখন ঢাকায় আসতেন, তার শ্বশুর বাড়ীর লোকজন তাকে হোটেলে থাকতে দিতেন না। তিনি ঢাকায় আসলে এখানেই থাকতেন। তার সাথে ছাত্রজীবন থেকেই আমার পরিচয়। আমি যখন ডাকসুর জিএস তখন সৈয়দ নজরুল ইসলাম সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভিপি ছিলেন। তার সাথে আমার সম্পর্ক ছিল। ইয়াহইয়া খানের সাথে সংলাপের রাতে জামান সাহেবের বাসায় তার সাথে আমার কথা হতো। ২৪ মার্চ রাতে তার সাথে আমার যে কথা হয়, সে সময় তিনি বলেছিলেন, আমাদের ৬ দফা দাবিকে বলা হয় দেশ ভাগের ষড়যন্ত্র। আমি যদি গোপন রাখার শপথ না নিতাম, তাহলে আপনার মতো বন্ধুকে তা দেখাতাম। ৬ দফার মাধ্যমে আমরা দেশ ভাগ করতে চাই না। আমরা এর মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ রাখতে চাই।
২৫ মার্চ ১০টায় আবদুস সামাদ আজাদের সাথে কথা হয়। পিডিএম এর সময় থেকেই তার সাথে আমার বন্ধুত্ব। আগে তার নামে আজাদ শব্দ ছিল না। পরে তিনি তা যুক্ত করেন। তার বাসা ছিল সাইন্স ল্যাবরেটরীতে। তার সাথে শেষ কথা হয় ওই দিন। তাকে বললাম, আপনারা কী করতে চান? তিনি বললেন, আমরা ইয়াহইয়া খানের কাছে ৬ দফার ড্রাফ্ট হস্তান্তর করেছি। আমরা আসলে পাকিস্তান ভাগ করতে চাই না। দেখি ইয়াহইয়া খানের পক্ষ থেকে জবাব কী আসে? শেখ মুজিবুর রহমানও এর জবাবের অপেক্ষায় ছিলেন।
২৫ মার্চে আর্মি ক্র্যাক ডাউনের পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতা ভারতে চলে যান। শেখ মুজিবুর রহমানও যেতে পারতেন। কিন্তু উনি যাননি। উনি নিজ থেকেই ধরা দেন। গ্রেফতার বরণ করেন। সে সময় যে পরিস্থিতি ছিল, তিনি স্বাধীনতাও ঘোষণা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি এমন কিছু করেননি। তিনি সে সময় যুদ্ধেরও ঘোষণা দিতে পারতেন। গ্রেফতার এড়াতে পারতেন। দুনিয়াতে কী এমন দেশ আছে, যেখানে সেনাপতি যুদ্ধ ঘোষণা করে শত্রু পক্ষের হাতে ধরা দেন? এতে প্রমাণ হয়, তিনি এভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধ চান নি। কিন্তু কী ভাবে চেয়েছিলেন তা ভিন্ন কথা।
শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছিল, তার উকিল ছিলেন একে ব্রোহী। তার সাথে আমার পরিচয় ছিল। কেননা যখন আইয়ুব খান জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করে, তখন তিনি আমাদের আইনজীবী ছিলেন। '৭১ সালের জুন মাসের মাঝামাঝি সময় লাহোর এয়ারপোর্টে তার সাথে আমার দেখা হয়। তিনি বললেন, রোগী যেমন ডাক্তারের কাছে কিছু গোপন করে না ঠিক তেমনি উকিলের কাছেও মক্কেল কোন কিছু গোপন করে না। অনেকে বলে শেখ মুজিবুর রহমান দেশ ভাংতে চায়। এ ধারনণা ঠিক না। তার সাথে আমার খোলামেলা কথা হয়েছে। আমি উকিল হিসেবে সাক্ষী দিচ্ছি তিনি পাকিস্তানকে এক রাখতে চান। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চান।
দৈনিক সংগ্রাম : আপনি সম্প্রতি বলেছেন, আওয়ামী লীগের নেতারা ভারতে চলে গেছে, এ অবস্থায় যুদ্ধ শুরু হলে জনগণের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে, তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন। তা কীভাবে করেছেন?
প্রফেসর গোলাম আযম : আসলে আর্মি যখন জনগণের মাঝে ছেড়ে দেয়া হয়, তখন স্বাভাবিক ভাবেই বাড়াবাড়ি হয়। অনেক সময় জুলুমও করে ফেলে। যে সময় জনগণ প্রতিকারের জন্য রাজনৈতিক নেতাদের কাছে আসে। তখনতো আওয়ামী লীগের নেতারা ভারতে চলে গেছে। নূরুল আমিনের ডেমোক্রেটিক পার্টি, মৌলভী ফরিদ আহমদের নেজামে ইসলাম পার্টি, জামায়াতে ইসলামী এবং এসএম সোলায়মানের কৃষক শ্রমিক পার্টি। আমরা নুরুল আমিন সাহেবের ওখানে একত্রিত হলাম। আমরা বললাম, লোকজন আসছে, আমরা তাদের কীভাবে সাহায্য করবো? এ ব্যাপারে টিক্কা খানের সাথে দেখা করা যেতে পারে। তিনি গবর্নর ছিলেন পাশাপাশি মার্শাল ল' এডমিনেস্ট্রেটরও ছিলেন। তবে তিনি গভর্নর হাউজে বসতেন না। ক্যান্টনম্যান্টে থাকতেন। আমরা ওখানেই তার সাথে দেখা করলাম। এটা ৪ঠা এপ্রিলের ঘটনা। আমরা প্রথমেই ২৫ মার্চের হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ করলাম। কেন সাধারণ মানুষের উপর সেনা বাহিনী নামিয়ে অত্যাচার করা হলো তার প্রতিবাদ জানালাম। এর জবাবে বলা হলো, যেভাবে বিদ্রোহ হয়েছে তাতে এর বিকল্প ছিল না। তবে এ রকম আর হবে না।
আমি ২৬ মার্চ সকালে বের হয়েছিলাম। তখনও অনেক জায়গায় আগুন জ্বলছিল। নবাবপুর রোডে রিক্সার উপর মানুষের লাশ পড়ে থাকতে দেখলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের কোয়ার্টারেও মানুষের লাশ পড়ে থাকতে দেখলাম। অনেক জায়গায়তো কয়েকদিন পর্যন্ত আগুন জ্বলছিল।
আমরা বললাম, লোকজন আমাদের কাছে আসে। নিরাপত্তা চায়। আমরা কীভাবে তাদের সাহায্য করতে পারি। টিক্কা খান ব্রিগেডিয়ার রাও ফরমান আলীকে ডাকলেন। বললেন, সব ফোন নাম্বার দিয়ে দেন। যাতে তারা যোগাযোগ করতে পারে।
এরপর যারাই আমার কাছে এসেছে আমি চেষ্টা করেছি তাদের উপকার করার জন্য। একটা কেস এখনো মনে আছে। শেখ মুজিবুর রহমানের এক আত্মীয়, তার নাম ছিল সাইফুদ্দিন, ডাক নাম সূর্য মিয়া। তিনি ঠিকাদারী করতেন। শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মীয় হওয়াই তার অপরাধ। তাকে ধরে নিয়ে গেলো। তার স্ত্রী আমার কাছে এসে কান্নাকাটি করলেন। আমি রাও ফরমান আলীকে ফোন করলে তিনি ব্রিগেডিয়ার কাসেমের নাম্বার দিলেন। উনি সার্কিট হাউজে বসতেন। আমি তাকে ফোন করে এ ঘটনা জানালাম। এর দুই দিন পর সূর্য মিয়া আমার বাড়ীতে এসে হাজির। তাকে ধরে নিয়ে কোথায় যেন রাখা হয়। তাকে ১০টার সময় জিপে করে সার্কিট হাউজের সামনে এনে এই বলে গাড়ী থেকে ছেড়ে দেয়া হলো, ‘তুই যাহ, কোন এক গোলাম আযম নাকি তোর জন্য সুপারিশ করেছে।' আমি রাস্তায় পড়ে থাকলাম। পরে রিক্সা নিয়ে সোজা এখানে আসলাম। সে বললো, আমি আর বাড়ীতে যাবো না। এখানেই থাকবো। আমার ৪/৫টি সেয়ানা মেয়ে আছে। আমি তাদের ওই বাড়ীতে নিরাপত্তা দিতে পারবো না। তারা আমার এখানে ১ মাস থাকলেন। পরে পাশে আমার ভাই এর বাসায় একটা ফ্ল্যাট খালী হলে সেখানে তারা ৭১ সালের পুরো সময়টাই ছিলেন। এ রকম অনেক কেস আমার কাছে আসে। তাদের আমি আমার সাধ্য মতো সাহায্য করার চেষ্টা করি।
দৈনিক সংগ্রাম : আপনারা ভারতে যাননি কেন? যাওয়া কী সম্ভব ছিল না?
প্রফেসর গোলাম আযম : তারা ভারতে গিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য আবদার করেছিল। তাজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে তারা ইন্দিরা গান্ধীর সাথে দেখা করে। তাজউদ্দিন আহমদের সাথে ছাত্রজীবন থেকেই আমার পরিচয়। আমি যখন ৯ম শ্রেণীতে পড়ি তখন আমি আমার স্কুলে স্কাউটের ট্রুপ লিডার ছিলাম। উনি উনার স্কুলের ট্রুপ লিডার ছিলাম। গাজীপুরে যখন স্কাউটের জাম্বুরী হয়, তখন আমাদের পরিচয় হয়। তারা যখন ইন্দিরা গান্ধীর কাছে যায়, তখন আমরা ঘাবড়ে গেলাম। কারন পাকিস্তান হওয়ার পর ভারতের আচরণ দেখেই আমরা চিন্তিত ছিলাম। নিশ্চিত ভারতের হাত ধরে আমরা স্বাধীনতা পাবো না। আমরা হয়তো আলাদা হতে পারবো, কিন্তু তারা সত্যিকারের স্বাধীন হতে দিবে না। বাংলাদেশ হওয়ার পর আমাদের সেই আশংকাই সত্য প্রমাণিত হলো। ভারতের আচরণে এখন প্রমাণ হয়েছে, তারা আসলে আমাদের স্বাধীনতা চায় না। তারা নিতে চায় দিতে চায় না, হক দেয়া তো দূরের কথা। আমরা নিশ্চিত ছিলাম, ভারতের সাহায্যে আমরা সত্যিকারের স্বাধীন হতে পারবো না। আমরা ভারতে যাবো কীসের আশায়? তাছাড়া সেখানে যাওয়াও আমরা নিরাপদ বোধ করিনি। যদি ভারতের সাহায্য ছাড়া স্বাধীনতা যুদ্ধ হতো, তাহলে আমরাই সবার আগে এ যুদ্ধে অংশ নিতাম।
ভারত ৩ কারণে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহায্য করেছে। এক. চির প্রতিদ্বনদ্বী পাকিস্তানকে দুই ভাগ করে দুর্বল করা। দুই. যেহেতু আমরা তাদের পেটের ভিতরে, তাই এখানে তারা আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। তিন. এ দেশকে ভারতের বাজারে পরিণত করা। তাদের এই ৩টি উদ্দেশ্যই সফল হয়েছে। এর অতিরিক্ত ট্রানজিট বা আরো যা যা চায় তা নিবে। এশিয়ান হাইওয়েও তাদের মর্জি মতো হচ্ছে। উজানে বাঁধ দিয়ে সব নদীর পানি তারা নিয়ে যাচ্ছে। এগুলো হবে জেনেই আমরা স্বাধীনতার জন্যে ভারতে যেতে পারিনি ও মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় হতে পারিনি।
পাকিস্তানের সেনাবাহিনী যখন আত্মসমর্পণ করলো, তখন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানীকে হাজির করা হয়নি। আত্মসমর্পণকারী পাকিস্তানী সেনা বাহিনীর সকলকে গ্রেফতার করে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাদের যত অস্ত্র ছিল, এগুলো পাওনা ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সবগুলোই লুটেপুটে নিয়ে যাওয়া হয়। আর এজন্য বাধা দেয়ার কারণেই সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিলকে জেলে যেতে হয়েছিল। ভারতের এসব আচরণই প্রমাণ করে তারা আমাদের স্বাধীনতার জন্য সাহায্য করেনি, তারা তাদের স্বার্থেই সাহায্য করে।
দৈনিক সংগ্রাম : সরকারের শীর্ষ ব্যক্তি বলেছেন, ভারতের সক্রিয় সাহায্য সহযোগিতা ও সমর্থনে এ দেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হয়েছে। অথচ এই ভারতের মাধ্যমেই সেই সময় প্রকৃত যুদ্ধাপরাধী ১৯৫ জন সেনা কর্মকর্তাকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। তাহলে ৪০ বছর পর ভারত কেন বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য সক্রিয় সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে এসেছে বলে আপনি মনে করেন?
প্রফেসর গোলাম আযম : ১৯৭১ সালের পর ৩০ বছর পর্যন্ত তারা আমাদের রাজাকার, স্বাধীনতা বিরোধী গালি দিলেও কখনও যুদ্ধাপরাধী বলে নি। ২০০১ সালে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার জন্যই এখন তথাকথিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে প্রহসন শুরু করা হয়েছে। ২০০১ সালে নির্বাচন চারদলীয় জোট একত্রিত হয়ে করেছে। এ নির্বাচনে ৫০টির
মতো আসনে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ঐক্যজোট ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা দাঁড়ায়। বাকী ২৫০টিতেই এই ৩ দলের কোন প্রার্থী ছিল না। এ সব আসনে এই ৩ দলের ভোটগলো আওয়ামী লীগ পায়নি। সব ভোট যায় বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে। এ নির্বাচনে ৫৮টি আসন পায় আওয়ামী লীগ। আর বিএনপি ১৯৭টি আসন পায়। তাই আওয়ামী লীগ হিসাব করে দেখেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এক থাকলে তারা জিততে পারবে না। এর প্রমাণও পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন নির্বাচনে। এই সরকারের সময়ই চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ছিল। কিন্তু বেগম জিয়ার অনুরোধে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নেয়। তাই আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেনি। সুপ্রীমকোর্ট বার এসোসিয়েশনের নির্বাচনেও বিএনপি জামায়াতে ইসলামী এক হওয়ার কারণে বিজয়ী হয়। এ বার ১৫ বছর যাবত আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি, সাংবাদিকদের সংগঠন- সব জায়গাই এ অবস্থা। এটা বোঝার পরই জামায়াতে ইসলামীকে রাজনৈতিকভাবে উৎখাত করতে নেতৃত্বশূন্য করার জন্য যুদ্ধাপরাধের বিচারের বাহানা শুরু হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী যাতে রাজনৈতিক ময়দানে ভূমিকা রাখতে না পারে এজন্যই এখন বিচার শুরু করা হয়েছে।
এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপির নেতৃত্বে ৭দল, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দল ও জামায়াতে ইসলামী এক সাথে যুগপৎ আন্দোলন করেছে। লিয়াজো কমিটিতে জামায়াতে ইসলামীর সাথে এক সাথে বসেছে। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে লিয়াজোঁ কমিটির কনভেনার ছিলেন আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। এছাড়া বিভিন্ন সভায় মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা অংশগ্রহণ করতেন। অধিকাংশ মিটিং আবদুস সামাদ আজাদ সাহেবের বাসায় হতো। সে সময় তারা যুদ্ধাপরাধী বলেনি।
১৯৯১ সালের নির্বাচন কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে হলো। বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলো, কিন্তু একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তারা আমাদের সমর্থন নিয়েই ক্ষমতায় বসলো। আমরা কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থাকে সংবিধানে সংযোজনের পরামর্শ দিলাম। '৯১ সালের জুন মাসে আমরা তা বিল আকারে পেশ করলাম। কিন্তু বিএনপি বিল আনতে রাজী হলো না।
কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতি আমিই প্রথম জামায়াতে ইসলামীর কাছে পেশ করলাম। জামায়াত তা গ্রহণ করার পর তা জনগণের সামনে পেশ করা হয়। আমি হিসাব করে দেখলাম, ১৯৭৩ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের সময় প্রথম বাংলাদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে ৬টি ছাড়া সবগুলো আসনই সরকারী দল নিয়ে নেয়। এভাবে অন্য নির্বাচনগুলো নিয়েও কথা উঠে। আসলে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে যদি কেয়ারটেকার সরকার হয়, তাহলে সে নির্বাচন সবদলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। সে সময় প্রধান বিচারপতি ছিলেন বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ। তার অধীনে ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে যে নির্বাচন হলো, সে রকম ফেয়ার নির্বাচন আগে কখনই হয়নি। কিন্তু বিএনপি এ ব্যবস্থাকে সংবিধানে সংযোজন করতে রাজী হলো না। তার মানে পরবর্তী নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনেই হবে। এরই মাঝে ১৯৯৩ সালে মাগুরার মোহাম্মদপুরে আওয়ামী লীগের একজন সংসদ সদস্যের মৃত্যুতে উপ-নির্বাচন হয়। বিএনপি এ আসন নিয়ে নেয়। হাসিনা বিদ্রোহ করলো। এ সরকারের অধীনে আর কোন নির্বাচন নয়, কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। তারা মাঠে নামলো। আমরা দেখলাম এটা আমাদের ইস্যু। আমরাও মাঠে নামলাম। আওয়ামী লীগের সাথে আমরাও বিএনপির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলাম। তখনও আমাদের যুদ্ধাপরাধী বলা হয়নি। কিন্তু ২০০১ সালে নির্বাচনে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে রাজনীতি থেকে জামায়াতে ইসলামীকে উৎখাত করার অসৎ উদ্দেশ্যে এবং বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী ঐক্যবদ্ধ থাকলে আওয়ামী লীগের পরাজয় হবে এই আশংকাতেই যুদ্ধাপরাধী বলা শুরু করলো। সেক্টর কমান্ডার ফোরামকে নামানো হলো।
যুদ্ধাপরাধী ইস্যু শেখ মুজিবুর রহমানই মীমাংসা করে গেছেন। উনি ১৯৫জন পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তাকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু তাদের বিচার না করে ছেড়ে দেয়া হয়। ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের ত্রিপক্ষীয় সম্মেলনে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আর এই ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তাও সে সময় ভারতেই ছিলেন, বাংলাদেশের হাতে ছিল না। তাদের মুক্ত করে দেয়ার সময় শেখ মুজিব বলেছিলেন, কীভাবে ক্ষমা করতে হয় বাঙ্গালী তা জানে। তিনি গৌরব প্রকাশ করে তাদের মাফ করে দিলেন। এরপর যারা সেনাবাহিনীর সহযোগী ছিলো, তিনি তাদের নাম দিয়েছিলেন কলাবরেটেড। তাদের বিচারের জন্য আইন করা হয়। সেই আইনের অধীনে ৩৭ হাজার ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। কয়েকজনকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। পরে তাদেরও সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। তাদের মাফ করে দেয়ার মাধ্যমে তো তিনি নিজেই এই ইস্যু মীমাংসা করে গেলেন। শেখ হাসিনা কী তার পিতাকে মানেন না। রাজনৈতিক প্রয়োজনে তিনি তার পিতার মীমাংসাই নাকচ করে দিলেন। তিনি কী পারবেন, সেই ১৯৫জনকে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে? তাতো পারবেন না। আসলে তাদের বিচার উদ্দেশ্য নয়। পাটমন্ত্রীতো বলেই ফেললেন, বিচারের কী দরকার, ফাঁসি দিয়ে দিলেইতো হয়। রাজনৈতিক কারণেই বিচারের নামে প্রহসন করা হচ্ছে।
দৈনিক সংগ্রাম : আপনার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হচ্ছে, সে সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী?
প্রফেসর গোলাম আযম : এগুলো অভিযোগ নয়, অপবাদ। আমি চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি আমার বিরুদ্ধে কোন একটা অপবাদও প্রমাণ করতে পারবে না। আমি তা কোর্টেও বলবো। তারা যা বলছে, তা আগে প্রমাণ করুক। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হচ্ছে, আমি নাকি বিবাড়িয়ায় কোন জেলারকে চিঠি লিখেছি, তারপর জেলের ভিতর থেকে ৪৮ জন বন্দীকে বের করে হত্যা করা হয়। আমি কী ক্ষমতাসিন ছিলাম? সরকারে ছিলাম? আমার কথা জেল কর্তৃপক্ষ শুনতে যাবে কেন? এ রকম চিঠি তারা দেখাক।
২৫ মার্চ ইয়াহইয়া খান-টিক্কা খান সেনাবাহিনী নামিয়েছে। তারা এ অপারেশনের নাম অপারেশন সার্চ লাইট নাকি দিয়েছে। সেনাবাহিনী নামিয়েছে তারা, তারা কী প্ল্যান করেছে তারাই বলতে পারবে। আমি কে? আমি ছিলাম একটা দুর্বল পার্টির নেতা। '৭০-এর নির্বাচনে আমরাতো কোন আসনই পাইনি। বগুড়ায় প্রাদেশিক পরিষদের একটা আসন আমরা পাই। সে হিসেবে তো তখন একটা দুর্বল দল জামায়াতে ইসলামী। আমিতো সরকারেও ছিলাম না। আমার কথায় অপারেশন হয় কী করে? '৭১ সালে যত গণহত্যা হয়েছে, সব নাকি আমিই করিয়েছি। প্রমাণ করুক তারা। প্রমাণ না করতে পারলে তা অপবাদ।
দৈনিক সংগ্রাম : মাওলানা নিজামী, মুজাহিদসহ জামায়াতের অন্যান্য নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হচ্ছে। এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?
প্রফেসর গোলাম আযম: আসলে সব অভিযোগই মিথ্যা। পয়সায় কেনা সাক্ষী দেয়ানো হচ্ছে। মাওলানা সাঈদীর যখন তদন্ত সংস্থা তদন্তে যায়, তখন আওয়ামী লীগ ও পুলিশ সাধারণ মানুষকে কাছে যেতে দেয়নি। সাজানো ব্যক্তিদের দিয়ে কথা বলানো হয়েছে। এক মুক্তিযোদ্ধাতো বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, মাওলানা সাঈদী এ ধরনের কিছু করেন নি। তিনি যদি করতেন তাহলে তো তিনি ২বার এমপি হতে পারতেন না।
আর দলীয় লোকদের দিয়েই তদন্ত করানো হচ্ছে। তারা নিরপেক্ষ নয়। আর ট্রাইব্যুনালের প্রধান যিনি, তিনিতো ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির গণআদালতের সাথে জড়িত ছিলেন। তখন আমার বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় দেয়া হয়েছিল। সেটাতো আর কার্যকর করার সুযোগ ছিল না। তাই এখন তাকে বসানো হয়েছে তা কার্যকর করার জন্য।
ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম যে মান সম্পন্ন নয়, তা দেশী বিদেশী বিশেষজ্ঞগণ জানিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক বিশেষ দূত ষ্টিফেন র‌্যাপ বাংলাদেশ সফর করে গিয়ে দীর্ঘ সুপারিশ দিয়েছেন। পুনরায় সফরে এসে তা কার্যকর না করায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ইন্টারন্যাশনাল বার এসোসিয়েশন ট্রাইব্যুনালের আইনের ত্রুটি উল্লেখ করে ১৭ দফা সুপারিশ করেছে। এছাড়া বিদেশী বিভিন্ন সংস্থা, মানবাধিকার সংগঠনও এ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সাবেক এটর্নী জেনারেল সোলি জে. সরাবজীও বলেছেন, এ আইনটি মানসম্পন্ন নয়। এর মধ্যে ত্রুটি রয়েছে। হাউজ অব লর্ড্স লর্ড আইবরীতো বলেছেন, তা সংশোধন না করলে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হবে না বলেও তিনি জানিয়েছেন। বাংলাদেশের সুপ্রীম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকেও বারবার সংশোধনের কথা বলা হয়েছে। এই আদালত না আন্তর্জাতিক, না দেশীয়। কেননা, সাক্ষ্য আইনসহ বিচারের ক্ষেত্রে দেশীয় আইনগুলো এখানে প্রয়োগযোগ্য নয়। সিনিয়র আইন বিশেষজ্ঞ বিচারপতি টিএইচখানতো বলেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আন্তর্জাতিক শব্দটা ছাড়া আর কিছুই আন্তর্জাতিক নয়।
দৈনিক সংগ্রাম : আপনি তো বহুবার জেলে গেছেন। এখন বয়স হয়েছে। এ অবস্থায় জেলে যেতে আপনার কোন ভয় আছে? আপনি কী উদ্বিগ্ন?
প্রফেসর গোলাম আযম: মু'মিনের জন্য নিয়ম হচ্ছে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভালোবাসতে পারবে, কিন্তু তার চেয়ে বেশী কাউকে ভালোবাসতে পারবে না। এটাই আল্লাহর নিদের্শ। আর ভয়, আল্লাহ ছাড়াতো কাউকে ভয় পাওয়া জায়েজই নেই। মু'মিন আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পেতে পারে না। আমি উদ্বিগ্ন নই। আমি মৃত্যুকে ভয় করি না। মৃত্যুকে ভয় পাবো কেন? মু'মিনতো মৃত্যু কামনা করে। কেননা মৃত্যুর পর আল্লাহর কাছে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে। তাই মৃত্যুকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
১৯৫৩ যখন মাওলানা মওদুদীর ফাঁসির হুকুম হয়, তখন তার ছেলে তাকে জেলখানায় দেখতে যায়। তখন তিনি তাকে বলেছিলেন, ‘মৃত্যুর ফয়সালাতো দুনিয়ায় হয় না, আসমানে হয়। আল্লাহ যদি আমার মৃত্যুর ফয়সালা দিয়ে থাকেন, তাহলে দুনিয়ার কেউ আমাকে বাঁচাতে পারবে না। আর যদি না দেন, তাহলে যারা আমার মৃত্যুর হুকুম দিবে, তাদেরই মৃত্যু হবে। আর অন্যায়ভাবে মৃত্যু দিলো তো শহীদী মর্যাদা পাবো।' তাকে অনেকে পরামর্শ দিয়েছিল, আপনি সরকারের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা চান। তখন তিনি বলেছিলেন, স্বাভাবিক মৃত্যু হলে বেহেস্তে যাওয়ার কোন গ্যারান্টি নেই। কিন্তু শহীদী মৃত্যুর মাধ্যমে বেহেস্তে যাওয়া নিশ্চিত। আমি কী সরকারের কাছে বেহেস্তে না যাওয়ার দরখাস্ত করবো? সুতরাং মৃত্যুকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। মৃত্যু মু'মিনের জন্য ভয়ের জিনিস নয়।

বিষয়শ্রেণী: বিবিধ
শেয়ার করুনঃ
১০৪ বার পঠিত, ৩ টি মন্তব্য
২ জনের পছন্দ
রেটিং দিতে লগইন করুন
পাঠকের মন্তব্য:
মন্তব্যের জবাব দিতে সমস্যা হলে এখানে ক্লিক করুন এবং নতুন পাতায় মন্তব্য লিখুন
637937
০৫ ফেব্রুয়ারী ২০১২; সন্ধ্যা ০৭:২৪
লুনিক লিখেছেন : এত লম্বা পোষ্ট লিখলে ধৈর্য ধরে পড়তে অনেকেরই অসুবিধা হবে। কিছু বুলেট পয়েন্ট থাকলে ভাল হ'ত। পড়ে দেখার মত অনেক তথ্য রয়েছে। গোলাম আজমকে আমি কট্টরপন্থী বলেই জানতাম - হয়ত কিছুটা প্রচারণার কারণে। তাঁর মন্তব্যগুলি এখানে কিন্তু তেমন কট্টর বলে মনে হ'ল না। আমার প্রতিক্রিয়ায় আমি নিজেই অবাক হলাম কারণ ব্যক্তিগতভাবে আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতায় এবং সেক্যুলার রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তবে আমি মনে করি যে গণতান্ত্রিক প্রকৃয়ায় ভিন্ন মতের প্রতি সহিষ্ণুতা না থাকলে গণতন্ত্র অচল হয়ে যাবে। গোলাম আজম নীতিগতভাবে যে আবস্থান নিয়েছেন (এই আলোচনায় যেটা ফুটে উঠেছে) একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় তিনি তা নিতেই পারেন। ধন্যবাদ।
০৫ মার্চ ২০১২; বিকেল ০৫:৫০
671511

ইদ্রিছ আহমদ লিখেছেন : Thanks
638142
০৫ ফেব্রুয়ারী ২০১২; রাত ১০:২৬
হাসান লিখেছেন : শেয়ার করার জন্য অনেক ধন্যবাদ
মন্তব্য লিখতে লগইন করুন
ইদ্রিছ আহমদ