প্রথম পর্ব
আমার বোনের শ্বশুর দীর্ঘ রোগ ভোগের পর মারা যান। (ইনালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন ) তার মৃত্যু পরবর্তী কালীন দোয়া অনুষ্ঠানে আমাকেও দাওয়াত দেয় আমার বোন জামাই। যেয়ে দেখি কোথায় দোয়া অনুষ্ঠান? এতো বিরাট ব্যাপার স্যাপার।
বাবা যতো দিন অসুস্থ্য হয়ে জীবিত ছিলেন ততদিন তার ছেলে মেয়েরা তাকে সেবা যত্ন করার খুব একটা সময় সুযোগ করে উঠতে পারেন নি। তাই তার মৃত্যুর পর চল্লিশার মাধ্যমে সেই ঘাটতিটুকু বুঝি পুষিয়ে নিতে চাচ্ছেন। বড় বড় দুইটি গরু আর তিনটি খাসি জবাই হয়েছে, চাল কতো মণ তা আমার জানা নেই। দওয়াত দেওয়া হয়েছে প্রায় পাঁচশতরও বেশি মানুষকে। হাফেজি মাদ্রাসা থেকে ২০/২৫ জন তালেবে এলেম আনা হয়েছে যারা দুলেদুলে কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করছে। এদের পড়া দেখে বোঝা যাচ্ছে এইভাবে বিভিন্ন জায়গায় যেয়ে কুরআন পড়ায় এরা অভ্যস্ত। দূরের কাছের সব আত্মীয় স্বজনের উপস্থিতিতে বাড়িতে যেনো একটা আনন্দের ঢেউ খেলে যাচ্ছে। কারো মধ্যে এতটুকু শোকের বালাই নেই।
অতগুলো গরু খাসি জবাই আর গোশত তৈরী করতে সারা রাত জাগতে হয়েছে কিছু মানুষকে। তাই তাদের জন্য ভি,সি,ডির ব্যবস্থা করা হয়েছে। তারা রাতভর সিনেমা দেখেছে আর কাটাকাটি রান্না-বান্নার কাজ করেছে। একজন মাওলানা সাহেব আছেন, তিনি ঘুরে ঘুরে সবকিছু তদারকি করছেন। খাওয়া দাওয়ার আগেই মিলাদ পড়ালেন। দোয়া করলেন কবরবাসীদের জন্য। তারপর গোরস্থানে যেয়ে কবর জেয়ারত করলেন নারী পুরুষ সবাইকে নিয়ে। খাওয়ার পর মাওলানাকে বিদায় করা হলো লুঙ্গি ও পাঞ্জাবী দিয়ে। তাছাড়াও টাকা চাল ও প্রচুর পরিমাণে গোশত দেওয়া হয়েছে। এই অনুষ্ঠানের নাম হলো চল্লিশা বের করা। অনুষ্ঠান শেষ করতে এদের খরচ হলো প্রায় ৫৫/৬০ হাজার টাকা। আমার বোনজামাইকে একটু বোঝানোর চেষ্টা করে বললাম, তোমরা যে কাজটা করছ তা মোটেও ইসলাম সম্মত নয়। সে আমাকে বুঝিয়ে বলল, এসব কথা এখানে বলা যাবে না ।এটাই আমাদের এখানকার নিয়ম। বাপ দাদার কাল থেকে চলে আসছে এই সিষ্টেম। আমার বাবাও এইভাবে তার বাবার চল্লিশা বের করেছে। এখানকার সবার ধারণা চল্লিশা বের না করা পর্যন্ত আত্মা শান্তি পায় না। কেঁদে কেঁদে বাড়ির আনাচে কানাচে ঘুরতে থাকে।
আমি শুধু বললাম, তুমি অর্থসহ কুরআন পড়েছ, হাদিস পড়েছ, তুমিও কি এসব বিশ্বাস করো? দুলাল হেসে বলল, আমার বিশ্বাস অবিশ্বাসে কিছু আসে যায় না। আমার কথা কেউ মানবে না। এই যে আমাদের মাওলানা সাব উনি কী কুরআন হাদীস পড়েন নি? কী করব বলেন? তাই আমিই এদের কথা মেনে চলি। হাসতে হাসতে চলে গেলো দুলাল। আল কুরআনে কী এদের কথাই বলা হয়েছে? তারা বলে আমাদের বাপ দাদাদের যা করতে দেখেছি আমরা তো তাই করবো। কিংবা এরা কী সেই লোক? তাদের জন্য সমান; তোমরা তাদের সতর্ক কর বা না করো- তারা মেনে নেবে না।
আল্লাহ তাদের হৃদয় ও কানে মোহর মেরে দিয়েছেন। (সূরা বাকারা-৭)
নাকি এর জন্য আমরাই দায়ী যারা ‘দায়ীইল্লাল্লাহ’ বলে দাবী করি অথচ তাদের কাছে সঠিক দাওয়াতটা পৌঁছাতে পারি নি।
আমাদের দেশের প্রায় সব জায়গাতেই এই অনুষ্ঠান বিভিন্ন নামে প্রচলিত আছে। যার প্রকৃত নাম শ্রাদ্ধ। যা হিন্দুদের শেষকৃত অনুষ্ঠান। হিন্দুরা যাকে জল বলে আমরা তাকে বলি পানি। এ যেন ঠিক তেমনি। হিন্দুরা বলে শ্রাদ্ধ আর আমরা বলি চল্লিশা জেয়াফত, কুলখানী। যে নামেই ডাকি না কেন জিনিস একই। এই অনুষ্ঠান সম্পূর্ণভাবে হিন্দুদের। এর সাথে ইসলামের সামান্যতম সম্পর্ক নেই। সাওয়াবের তো প্রশ্নই আসেনা। রাসূল (সা.) এর কাছে এক ব্যক্তি এসে বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার মা মারা গেছেন, আমি এখন কী করবো। রাসূল (সা) বললেন; তোমরা মায়ের জন্য দোয়া করো আর তার আত্মীয় স্বজনের সাথে ভালো ব্যবহার করো।
হযরত ওমর (রা) এর মৃত্যুর পর তার পুত্র আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর দূরের এক বেদুইন পল্লীতে গেলেন বেশ কিছু উপঢৌকনাদি নিয়ে বেদুইন সর্দারের কাছে। সর্দার চিনতে না পেরে বললেন, কে বাবা তুমি ? আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর সালাম দিয়ে বললেন, আমি হযরত ওমর (রা) এর পুত্র। আমি ছোট বেলায় বাবার সাথে আপনার এখানে এসেছি। আমার বাবা মারা গেছেন, আপনি আমার বাবার বন্ধু ছিলেন। বাবার হক আদায় করার জন্য আপনার কাছে এসছি। বৃদ্ধ সর্দার আব্দুল্লাহকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন। হযরত ওমর (রা) এর জন্য অনেক দোয়া করলেন। এই আমল রাসূল (সা) শিখিয়েছেন।
আল্লাহ পাক একটা দোয়াও শিখিয়েছেন ‘রাব্বির হামহুমা কামা রব্বা ইয়ানি সগীরা’। অর্থ- ‘হে আল্লাহ আমার বাবা মাকে তুমি তেমনি আদরে রাখ যেমন আদর যত্নে শৈশবে তারা আমাকে লালন-পালন করেছে।’ আর বাবা মা জীবিত থাকতে তাদের সাথে করণীয় সম্পর্কে বলা হয়েছে ‘পিতা মাতার সাথে ভালো ব্যবহার করো। যদি তোমাদের কাছে তাদের কোনো একজন বা উভয়ে বৃদ্ধ অবস্থায় থাকে। তাহলে তাদের কে উহ্ পর্যন্ত বলো না এবং তাদের কে ধমকের সুরে জবাব দিয়ো না বরং তাদের মর্যদা সহকারে কথা বলো। আর দয়া ও কোমলতা সহকারে তাদের সামনে বিনম্র থাকো।’ (সূরা বনী ইসরাইল-২৩)
কিন্তু বাবা মা- এর মৃত্যুর পর এই ভোজ অনুষ্ঠানের কথা আল্লাহ কিংবা রাসূল (সা.) কোনো দিন বলেননি। শুধু বাবা মা বলি কেন? যে কোন আত্মীয় স্বজন মারা গেলে এই ধরনের অনুষ্ঠান করা জঘন্যতম বিদায়াত। এই অনুষ্ঠানে কোনো একটা কাজের সাথেও ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। এই অনুষ্ঠানের মধ্যে আমরা কয়েকটি কাজ দেখতে পাই-যাকে আমরা আপাত দৃষ্টিতে ভালো কাজ মনে করি। যেমন
১. গরু খাসি জবাই করে ঢালাও ভাবে মানুষকে একবেল খাওয়ানো।
২. হাফেজ দিয়ে কুরআন খতম করানো।
৩. সবাই মিলে কবর জেয়ারত করা।
৪. মীলাদ পড়া।
৫. মাওলানা সাহেবকে তুষ্ট করা।
এই কাজগুলো কুরআন ও হাদীস দিয়ে বিশ্লেষণ করে কাজগুলো সঠিক না বেঠিক তা বোঝা যাবে। প্রথমেই বুঝতে হবে ইবাদাত কাকে বলে? মনে রাখতে হবে রাসূল (সা.) যেভাবে যে কাজ করেছেন সেভাবে সেই কাজ করার নাম ইবাদাত। আর ইবাদাতের বিপরীত কাজ হলো বিদায়াত। অর্থাৎ রাসূল (সা.) যে কাজ করেননি করতে বলেননি সেই কাজ সাওয়াবের আশায় করার নাম বিদায়াত।
১. অতএব কারো মৃত্যুর পরে এইভাবে অনুষ্ঠান করে মানুষকে খাওয়ানোর মধ্যে সওয়াব তো নেই বরঞ্চ এই সব অসুষ্ঠানে যেভাবে বেপর্দা হয় তা কি কেউ ভেবে দেখে?
২. টাকা দিয়ে হাফেজ দ্বারা কুরআন পড়িয়ে নেওয়ার মধ্যে কি করে সাওয়াব হতে পারে ? কুরআন যে পড়ে তার সওয়াব হয়। কিন্তু সাওয়াব কি কখনও বিক্রি করা যায়? আর টাকা পাওয়ার নিয়তে যে কুরআন পড়ে তার তো সোয়াব হয়ই না, তা আবার অন্যকে দেবে কি? একজনে খাবে আর অন্য একজনের পেট ভরবে এ যেমন সম্ভব না তেমনি একজনে কুরআন পড়বে আর অন্য একজনকে তার সাওয়াব বখশিস করবে তাও কিছুতেই সম্ভব না। কুরআন পড়ানোর এই পদ্ধতিটা সম্পূর্ন বিদায়াত।
৩. কবর জেয়ারত করলে কবরবাসীর কোনো উপকার হয়না। কবরবাসীর জন্য দোয়া করতে হলে যে কোন জায়গা থেকেই করা যায়। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কবর জেয়ারত করো তাহলে তোমাদের মন নরম হবে।’ অর্থাৎ যে কবর জেয়ারত করবে তার মৃত্যুর কথা স্মরণ হবে, মন নরম হবে এবং নিজেকে অন্যায় ও পাপ থেকে দূরে রাখতে পারবে।
৪. মীলাদ শব্দের অর্থই হলো জন্মদিন। মিলাদুন্নবী মানে নবী (সা.) এর জন্মদিন। কারো মৃত্যু দিনকে জন্মদিন বলার মতো হাস্যকর আর কী হতে পারে? এই অনুষ্ঠান আল কুরআন কিংবা রাসূল (সা.) এর হাদীস থেকে পাওয়া যায় না। এই কাজটাও বিদায়াত।
৫. তারপর থাকল মাওলানা সাবকে তুষ্ট করা। মাওলানা সাবকে তুষ্ট করতে যা যা করা হয় তাতো রীতিমতো হারাম। হিন্দু ধর্ম থেকে চুরি করা কাজ। হিন্দুরা যেমন কেউ মারা গেলে শ্রাদ্ধের পর ব্রাহ্মণকে যে দান দক্ষিণা দেয় আত্মার মুক্তির জন্য, ঠিক সেই কাজটাই করছি আমরা মুসলমান নামধারীরা। আর এই তথাকথিত মাওলানারা এই সব ধরে রেখেছে। এরা কী না বুঝে এসব কাজ করছে? নাকি বুঝে সুঝে জাহান্নামের আগুনে পেট ভরছে, জানি না। ইবাদাত মনে করে এতোগুলো বিদায়াত ও কবিরা গুনাহ করে আত্মতুষ্ঠি লাভ করে আমরা আমাদের দেশে সমাজে সগৌরবে মুসলমান হিসাবে টিকে আছি। অনেকে আবার বোঝে, এগুলো ইবাদাত নয়। আল কুরআন কিংবা হাদীসে এসব নেই শুধু সমাজ এবং প্রচলনের জন্য করে। তারা বিবেকের কাছে একটু প্রশ্ন করুন তো এই সব বিদায়াতের মধ্যে নিজেকে নিমজ্জিত রেখে আল্লাহপাকের দরবারে মুসলমান হিসেবে পরিচয় দেওয়া যাবে তো? পাওয়া যাবে তো রাসূল (সা.) এর শাফায়াত? নাকি শেষ পর্যন্ত মিলবে ‘ছুহকান-ছুহকান ’ দূর হয়ে যাও দূর হয়ে যাও। চলবে. ..
হাসানাহ রাদিয়া লিখেছেন : সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। সুন্দর লেখা। আসলে অনেক কিছুই হচ্ছে মুসলিমদের মধ্যে যা সত্যিকারের ইসলাম নয়। আর কম জানা হুজুর আর মোল্লারাই ইসলামকে ধ্বংস করেছে আমাদের এই অঞ্চল এবং অন্যান্য অঞ্চলেও। তারা নিজেরা কম জানছে এতে কোনো আপত্তি নেই কিন্তু অন্যকেও জানার সুজোগ না দিয়ে ইসলামের মধ্যেও পুরোহীত ও যাজকতন্ত্র ঢুকিয়ে দিচ্ছে। অথচ আল্লাহ সুবহানাহু' ওয়া তা'লা প্রত্যেকটি মুসলিমকে (হোক নারী কিংবা পুরুষ) ইন্ডিভুজুয়াল্যি জ্ঞান অর্জনের তাগাদা দিয়েছেন। ইকরা' শব্দটি খাস নয়- এটি আম-- যা সকল পেশা-শ্রেনী, ধনী-গরীব, নির্বিশেষে সকলের জন্য প্রযোজ্য।
কি করবে বলুন?? এরা যে সবাই গরীব-- তাই খাবারের লোভ সামলাতে না পেরে সত্য বলতে ভয় পায়। এদের অবস্থান জাহান্নামের সবচেয়ে নিকৃষ্টতম অবস্থানেই হবে।
কীবোর্ড
Bijoy UniJoyPhoneticEnglish
নাম:
মন্তব্য:
তথ্য পাঠানো হচ্ছে, অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন
২
5896
০৪ অগাস্ট ২০১০; রাত ০৩:৩৯
সত্যের সন্ধানে লিখেছেন : সমাজের বন্ধন বড় কঠিন। অনেকে জেনেও এ কাজ কথা থেকে বিরত থাকতে পারছে না। পাছে লোকে কিছু বলে সেই ভয়েও অনেকে এসব করছে। আর কিছু মানুষ আছে, যারা প্রচুর অর্থের মালিক। সমাজে প্রভাব ফেলতে অনেক বড় করে ৪০শা করে । সবাইকে দেখিয়ে দেয় আমাদের এত টাকা আছে। প্রদর্শনী ছাড়া এখানে আর কিছুই দেখিনা।
নীলাকাশ লিখেছেন : "হিন্দু ধর্ম থেকে চুরি করা কাজ। হিন্দুরা যেমন কেউ মারা গেলে শ্রাদ্ধের পর ব্রাহ্মণকে যে দান দক্ষিণা দেয় আত্মার মুক্তির জন্য, ঠিক সেই কাজটাই করছি আমরা মুসলমান নামধারীরা।"
- আমি বইপত্র ঘেঁটে যতদূর জেনেছি, সাবেক হিন্দু ধর্মেও (উপনিষদে) এই সব দান দক্ষিনা-র কথা বলা নেই। কেবল-মাত্র মৃতের স্মৃতিচারন ও তাঁর আত্মার উদ্দেশ্যে প্রার্থনার কথা আছে।
এই সব ধর্মব্যাবসায়ীরা সব ধর্মের ক্ষেত্রেই একই চরিত্রের। এরা ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষকে তার মৃত্যুর পরেও যথাসম্ভব শোষন করে।
কীবোর্ড
Bijoy UniJoyPhoneticEnglish
নাম:
মন্তব্য:
তথ্য পাঠানো হচ্ছে, অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন
৫
43296
২৪ সেপ্টেম্বর ২০১০; দুপুর ০২:২৯
Zahid লিখেছেন : ধন্যবাদ। Online এ বাংলায় কুরআনের অনুবাদ পড়তে নিচের লিংকটি দেখুন। এতে বাংলায় search করার সুবিধা আছে।
আলোক লিখেছেন : অনেক দেরীতে হলেও আপনার লেখাটি পড়লাম, আসলে আমি ব্লগে এসেছি অল্প কিছুদিন আগে। যাই হোক, আপনার এই লেখাটির বিদআত প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য জানতে পারলাম।
ধন্যবাদ।
কি করবে বলুন?? এরা যে সবাই গরীব-- তাই খাবারের লোভ সামলাতে না পেরে সত্য বলতে ভয় পায়। এদের অবস্থান জাহান্নামের সবচেয়ে নিকৃষ্টতম অবস্থানেই হবে।