এক দাওয়াতে উপস্থিত নারীগোষ্ঠির কথোপকথনের এক পর্যায়ে একজন বললেন, ‘কাল আমাদের দোকানে এক বাংলাদেশী পরিবার এসে অনেক কেনাকাটা করে নিয়ে গেল’। শুনে আরেকজন অত্যন্ত উৎসাহের সাথে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি পরিচয় দেননি যে আপনি বাংলাদেশী?’ তিনি নাক কুঁচকে বললেন, ‘নাহ! কি বলব? ‘আমি বাংলাদেশী’? কেমন ক্ষেত ক্ষেত লাগে!’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাওয়াতে উপস্থিতির বিরক্তির মত এটাও গলাধঃকরণ করলাম। জীবনের অর্ধেকের বেশি দেশের বাইরে থেকেও আমি আমার গায়ে ক্ষেতের গন্ধটা বড় উপভোগ করি, কোথাও কাউকে ফোনে বাংলা বলতে শুনলেও দাঁড়িয়ে তাদের সাথে কথা বলি, CELTA ক্লাস নিতে গিয়ে একজন বাংলাদেশী ছাত্র পেয়ে আমার সেকি আনন্দ! অথচ আমাদের এই ‘দেশী’ ভাইবোনরা গ্রাম থেকে ক্যানাডা...
‘বুঝলে রাহী, আমি যতই নামাজদোয়া করিনা কেন, তোমার আন্টি আর আমার ছেলেমেয়েদের কারণে আমি দোজখেই যাব!’
মজার আলাপ হচ্ছিল নীলার বাবামার সাথে। মধ্যখানে হঠাৎ এমন গুরুগম্ভীর পারিবারিক প্রসঙ্গে নিজের অযাচিত উপস্থিতিতে বিব্রত বোধ করে রাহী- সচকিত হয়ে সফেদ পায়জামা পাঞ্জাবী টুপি পরিহিত, শ্বেতশশ্রূমন্ডিত আংকেলের দুঃখী দুঃখী চেহারা থেকে আন্টির দিকে চোরাদৃষ্টিতে তাকায়- আন্টির হাসি হাসি মুখটা দেখে ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা তিনি কি ভাবছেন।
আংকেল বলতে থাকেন, ‘রাকিবের বিয়েতে তো তুমি আসনি, যে পরিমাণ অপচয় হয়েছে মা, আমি জানিনা আমি...
আমরা যারা চন্দ্রপৃষ্ঠে মানব অবতরণের যুগে জন্মেছি তাদের প্রায় সবারই ছোটবেলায় শখ ছিল নভোচারী হবার। তাই টিভিতে এই বিষয়ে কোন অনুষ্ঠান, কোন বইয়ে মহাকাশযাত্রা বিষয়ে কোন তথ্য, বড়দের আলোচনায় এই নিয়ে কোন কৌতুহল- কিছুই আমাদের অনুসন্ধিৎসার বাইরে ছিলোনা। এমনই এক অনুষ্ঠানে একবার দেখান হোল মহাকাশযাত্রার পেছনে কত মানুষের কি কি অবদান থাকে, অনেকটা সিনেমার হিরো-হিরোইন-ভিলেনের বাইরেও যে কত লোক একটি সিনেমার প্রোডাকশনের সাথে জড়িত থাকে তেমন প্রোগ্রাম। এর একপর্যায়ে দেখানো হোল কিভাবে নভোচারীদের পোশাক তৈরী হয়। বয়স্কা এবং অভিজ্ঞ একদল মহিলা একত্রে বসে একেকটি পোশাক হাতে সেলাই করে তৈরি করেন, তারপর এর একেকটি ফোঁড় পরীক্ষা করে দেখেন ফোঁড়টি মজবুত হল...
বাংলাদেশে দীর্ঘ তিনমাসের ছুটি কাটিয়ে আবুধাবি ফিরেছি। বাবার বন্ধু গিয়ে আমাদের এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে এসেছেন। বাসার দরজা খুলতেই আমরা দু’ভাইবোন লাফিয়ে ড্রয়িং রুমের মধ্যখানে দাঁড়িয়ে আনন্দে হাত তুলে বলে উঠলাম, ‘আহ! কতদিন পর নিজের ঘরে ফিরে এলাম!’ দেখি বাবা আর তার বন্ধুবর পরস্পরের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। আংকেল সুটকেস ঘরে ঢোকাতে ঢোকাতে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘আহারে! ওরা নিজের দেশ থেকে বিদেশে এসে বলে কিনা ঘরে ফিরে এলাম!’ তখন আমার বয়স এগার আর ছোটভাই আহমদের বয়স পাঁচ। ঘটনার irony তখন আমাদের কাছে স্পষ্ট ছিলোনা।
আজ বান্ধবী তানজিনের পরিচালনায় ছোটদের নিয়ে একটি চমৎকার অনুষ্ঠান উপভোগ করলাম। অনুষ্ঠানের theme ছিল honesty. ছোট ছোট শিশু কিশোররা ভারী সুন্দরভাবে honesty বলতে কি বোঝায় এবং নিজেদের জীবনে তারা কখন কিভাবে honestyর পরিচয় দিয়েছে এ’নিয়ে গল্প শোনায়। ছোট্ট সোনামনিদের মুখে সততার শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতা শুনে মনটা ভরে ওঠে।
অনুষ্ঠানের সমাপনীতে বাবামা কিভাবে সন্তানদের সততা শিক্ষা দেবেন এ’বিষয়ে কিছু বলার দায়িত্ব দেয়া হয় আমাকে। বক্তা হিসেবে চলনসই হলেও বক্তৃতা দিতে আমার প্রচন্ড অনীহা, কারণ আমার মনে হয় যে আদর্শের কথা...
শনিবার দুপুরে শেষ ব্যাচের ছাত্রছাত্রীদের বিদায় করতে না করতে এক আপা ফোন করলেন, তারপর আরেকজন। তাঁদের সাথে আলাপ করছিলাম, ‘বুঝতে পারছিনা কেন এত ক্লান্ত লাগছে!’ কন্যার গলার আওয়াজ শুনে পেছনে তাকিয়ে দেখি ভাত তরকারী গরম করে প্লেটে নিয়ে আমার পেছনে পেছনে ঘুরছে, ‘আম্মু, তুমি সকালে নাস্তা খাওনি। এবার টেলিফোন রাখ তো! আগে খেয়ে নাও, তারপর জনসংযোগ কর’। আমার মেয়েটি ছোটবেলা থেকেই ভুলোমনা মায়ের জন্য মায়ের ভূমিকা পালন করে আসছে। মা-মেয়ের এই ভালবাসার বন্ধন এবং পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীলতার অনুভূতিকে বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গ তরজমা করেছেন এভাবে, ‘আহারে! মেয়েটার মা সারাদিন শুয়েবসে কাটায় আর মেয়েটাকে দিয়ে সংসারের সব কাজ করায়!’ এই আচরণে কষ্ট...
ব্লগার মনপবনের স্ট্যাটাস থেকে উদ্ধৃতঃ ‘কেউ যদি আমাকে আল্লাহর জন্য ভালবাসে, আমিও তাকে আল্লাহর জন্য ভালবাসি, কেউ যদি আমাকে আল্লাহর জন্য ঘৃণা করে, আমি তাকে আল্লাহর জন্যই ভালবাসি। কেউ যদি আমাকে ব্যক্তিগত কারণে ঘৃণা করে, তাহলে আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি যেন তিনি সেই ঘৃণার ক্ষতি থেকে আমাকে রক্ষা করেন। কেউ যদি সেই ঘৃণা থেকে আমাকে কষ্ট দেয়, তবে আমি আল্লাহর কাছে দু'আ চাই যেন তিনি সেই কষ্টের বিনিময়ে আমাকে ক্ষমা করে দেন। তবে কেউ যদি ইসলামকে সহ্য না করতে পেরে আমাকে ঘৃণা করে তাহলে আমি তাকে ঘৃণা করি ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ সে ইসলামকে ভালবাসতে না পারে’। ...
দাদার কাছ থেকে এই চিঠিটা পাবার কিছুক্ষণের ভেতর সব আত্মীয়স্বজনের ভেতর প্রচন্ড আলোড়ন সৃষ্টি হোল, ‘Trial ended today and the jury returned a guilty verdict for the charge of Felony Murder In the 1st Degree that carries a Life Sentence with no possible parole!!!!! Justice has prevailed and that scum will never be back on the streets again!!! God is Great!!’
আমি সবসময়ই একটু অন্যরকম। আমার প্রতিক্রিয়াগুলো কেমন যেন অদ্ভুত। আমার কল্পনা এবং স্মৃতিও তাই। আমি কোন চিত্র ঝাপসা...
কাজটা আমিও করি। হয়ত বাচ্চারা গন্ডগোলের চূড়ান্ত করছে, বলে দিলাম, ‘তোমরা যদি কিছুক্ষণ নিজেদের রুমে চুপচাপ বসে থাক তাহলে আব্বু বিকালে বাইরে নিয়ে যাবে’। ঐদিকে বেচারা ঘরকুনো লোকটা জানেই না তার ওপর কি বিপদ আসন্ন।
বিবাহিত মাত্রেই কখনো না কখনো নিজের কথা স্বামী বা স্ত্রীর নাম দিয়ে চালিয়ে দেয়া একটা সচরাচর ব্যাপার- কখনো বাচ্চাদের শাসন করা জন্য, কখনো অনাকাংখিত দাওয়াত এড়িয়ে যাবার জন্য, কখনো স্রেফ নিজের দোষ ঢাকার জন্য। এটাকে তেমন একটা কেউ মিথ্যার মধ্যে ধর্তব্য বলেও মনে...
যশোরের মেয়ে রোজিনা। জীবিকার তাগিদে সে নিজের সন্তানকে যশোরে বোনের কাছে রেখে সুদুর চট্টগ্রামে আমার সন্তানকে বুক দিয়ে আগলে রাখত। নয় বোনের সংসারে পঞ্চম বোন হিসেবে জন্মের পর থেকে অভাব ছাড়া আর কিছুই দেখেনি কোনদিন। সে বলত, ‘আপা, আমার বাবামা আমাদের জন্ম দিয়েছে ঠিকই কিন্তু কোনদিন একবেলার খাবারও দিতে পারেনি, আমরা ছোটবেলা থেকেই মানুষের ক্ষেতে কাজ করে নিজেরাও খেতাম তাদেরও খাওয়াতাম। আমাদের কারো পড়াশোনা হয়নি, কেবল একটা বোন ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পড়েছে আর একটা থ্রি পাশ। জানতাম আমরা মুসলিম, কিন্তু ধর্ম সম্পর্কে বাবামা নিজেও কিছু জানেনা, আমাদেরও কোনদিন শেখায়নি কিছু, কোনদিন এক রাকাত নামাজও পড়তে দেখিনি তাদের। হুজুরের কাছে পড়তে...
ক’দিন আগে বান্ধবীদের এক আসরে জাহান্নাম নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। তারপর থেকে কেবল ঐ আলোচনাই মাথায় ঘুরছে। আর ঘুরবেই না বা কেন যেখানে অনন্ত জীবনের আগেই শুরু হয়ে যায় জাহান্নামের শাস্তি? মৃত্যুর আগমূহূর্ত থেকেই জাহান্নামী তাকে নিতে আসা বীভৎস চেহারার ফেরেস্তাদের দেখে বুঝতে পারে খবর খারাপ। তার রূহ শরীরের আনাচে কানাচে দৌড়াতে থাকে আর ফেরেস্তারা যতক্ষণে তাকে শরীরের ভেতর থেকে টেনে বের করে আনেন ততক্ষণে ক্ষতবিক্ষত রূহের অবস্থা দাঁড়ায় গরম লৌহশলাকা থেকে গায়ের জোরে টেনে ছাড়ানো পশমের মত। পুঁতিগন্ধময় এই রূহ ফেরেস্তারা না পারতে বহন করেন এক রুক্ষ চটসদৃশ বস্তায়, এর ঘষায় ক্ষতবিক্ষত রূহের কি অবস্থা বলাই বাহুল্য কিন্তু মৃত্যু তো...
Advertisement- ছোটবেলায় চার syllable এর এই শব্দটা উচ্চারণ করতে বেশ বেগ পেতে হত। আজকাল দেখি বাচ্চারা অনেক চালাক, এত্ত লম্বা করে না বলে শ্রেফ ‘অ্যাড’ বলে চালিয়ে দেয়। এর বাংলা ‘বিজ্ঞাপন’ (Big+জ্ঞাপন), এই শব্দটাও ওরকমই বাগাড়ম্বরপূর্ণ। এতে ‘জ্ঞাপন’ করার মত সারবস্তু যা থাকে তার চেয়ে বেশী থাকে ‘বিগ’ কথাবার্তা। প্রমাণ চাই?
তখন ক্লাস নাইনে পড়ি, আবুধাবীতে থাকি। টিভিতে একখানা বাসনমাজা সাবানের কেরামতি দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। তেলচটচটা হাড়ির ভেতর একফোঁটা সাবান ‘টিং’ করে দিতেই সব তেল আপনিই সরে...
ক’দিন যাবত এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসবাস করছি। ঘরের তাপমাত্রা ২৩ ডিগ্রী সে, কিন্তু মাইনাস ৪০ ডিগ্রী সে. এর উপযোগী তিনখানা কম্বল গায়ে পেঁচিয়েও মনে হচ্ছে যেন বরফের প্রাসাদে দিনযাপন করছি। রিখটার স্কেলে ন্যূনতম ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটা বন্ধ হচ্ছেনা কিছুতেই। মহাসাগরের উত্তাল তরঙ্গমালার মত ব্যাথার ঢেউ প্রবাহিত হচ্ছে শরীরের প্রত্যেকটি অণু পরমাণুতে। কাশির গমকে মনে হচ্ছে শরীরের ভেতরকার সবকিছু মুখ দিয়েই বেরিয়ে আসবে। নাক যেন প্রমত্তা নদী। চোখের জানালাটা খুলতে গেলেই কপালের ওপরে গাড়ীভাঙ্গা হাতুরীর চাপ। যেকোন শব্দই মনে হয় ব্যান্ডের উন্মাতাল গানের মত শব্দদূষণ। হাত বাড়িয়ে পানির বোতলটা নিতে একঘন্টা চিন্তা করতে হচ্ছে পারব কিনা। বাচ্চাদের কে কোথায় চিন্তা করার...