সেকালে কবি আবদুল হাকিম চরম ক্ষুব্ধ হয়ে দৃঢ় কন্ঠে বলেছিলেন , ‘ যে জন বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী / সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় না জানি। / দেশী বিদ্যা ভাষা যার মনে না জুড়ায় / নিজ দেশ ত্যাগী কেন বিদেশ না যায় ? ’ আর এ যুগের পল্লীকবি জসিম উদ্দিন দুঃখ রাগ ক্ষোভে বেদনাভরা হৃদয়ে লিখিত গান সুললিতকন্ঠে গাইলেন কন্ঠশিল্পী আবদুল লতিফ , ‘ ... কইতো যাহা আমার দাদায় , কইছে তাহা আমার বাবায় / এখন কও দেখি ভাই মোর মুখে কি অন্য কথা শোভা পায় ? / ওরা কথায় কথায় শিকল পরায় আমার হতে পায় / ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায় ।’ কিন্তু শত চেষ্টা করেও কেউ আমাদের মুখ থেকে বাংলা ভাষা কেড়ে নিতে পারে নাই। বাঙালী তো বীরের জাতি। মহাবীর সিকান্দারও বাংলা আক্রমণ করতে সাহস করেন নাই। তার শংকা ছিল বাংলার হস্তী বাহিনীর মুকাবিলা তিনি করতে পারবেন না। এ যুগেও চ’ড়ান্ত পর্যায়ে হানাদারেরা পরাভ’ত হয়েছে। এ জাতি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বিজয়ী হয়েছে এবং কায়েম করেছে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। মুক্তিযোদ্ধা গণ-পরিষদ সদস্যগণ রচনা করেছেন সংবিধান। এর ৩ নং অনুচ্ছেদে ঘোষণা করেছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা। এর মধ্যে কোন অস্পষ্টতা নাই। সেই সাথে ৭(২) অনুচ্ছেদে আরো ঘোষণা করেছে সংবিধানের সাথে অসমঞ্জস্যপূর্ণ সকল আইন বাতিল হবে। ১৫২(১) অনুচ্ছেদে আইনের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে আইন অর্থ কোন আইন , অধ্যাদেশ , বিধি , প্রবিধান , উপ-আইন , বিজ্ঞপ্তি ও অন্যান্য আইনগত দলিল এবং বাংলাদেশে আইনের ক্ষমতা সম্পন্ন যে কোন প্রথা বা রীতি। মাননীয় সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগ অষ্টম সংশোধনী মামলার রায়ে সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদকে পরশ পাথর (touchstone) বলে অভিহিত করেছেন। সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদের বিধানাবরী পূর্ণরূপে কার্যকর করা এবং এতদ সংক্রান্ত বিষয়ের জন্য বিধান প্রণয়ন করে ১৯৮৭ সালে জাতীয় সংসদ ‘বাংলাভাষা প্রচলন আইন , ১৯৮৭’ পাশ করে। এই আইনে সুস্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে বিদেশের সাথে যোগাযোগ সংক্রান্ত ব্যতীত বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারী অফিস আদালত , আধা-সরকারী ,স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান সমূহের সকল কার্যাদি বাংলা ভাষায় করতে হবে। এর বরখেলাপ করে বাংলাভাষা ব্যতীত অন্য কোন ভাষায় কৃত সকল কার্যাদি বে-আইনি ও অকার্যকর বলে গণ্য হবে। কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারী এই আইন অমান্য করলে সে অসদাচরণের দায়ে সরকারী কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপীল বিধি অনুসারে অভিযুক্ত এবং সাজা প্রাপ্ত হবে। অতএব রাষ্ট্রীয় সকল কর্মে বাংলা ভাষাকে পরিহার করার সাংবিধানিক ও আইনগত কোন সুযোগ আদৌ নাই।
১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্রে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও উর্দূ করা হয় । অফিস আদালতে ও শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে প্রচলিত ছিল ইংরাজি ভাষা। বলা বাহুল্য ঐ সময় বাংলাদেশ পাকিস্তানের একটি প্রদেশ ছিল এবং এই অঞ্চলের শাসনতান্ত্রিক নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান। ইংরাজি থেকে রাষ্ট্রভাষায় উত্তরণের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল । ১৯৬২ সালের শাসনতন্ত্রেও প্রায় একইরূপ বিধান ছিল রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে। ঐ সময় জনপ্রিয় আওয়াজ ছিল ‘ অফিস আদালতে বাংলাভাষা চালু কর ’; ‘ শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে বাংলাভাষা চালু কর ’। ছাত্র-ছাত্রী , তরুণ-তরুণীরা তাদের চলন-বলন, আচার-আচরণ , সাজসজ্জা , বেশভ’ষায় বাঙালীয়ানা ফুটিয়ে তুলতে ছিল অত্যন্ত সচেতন। এ বিষয়ে যে যত পারদর্শী ও সফল হতো সেই ক্ষেত্র ভেদে ছিল আদর ¯েœহ সম্মান শ্রদ্ধা ও ভালবাসার পাত্র। আজকে কিন্তু দিন বদলে গেছে। সাংবিধানিক ও ভৌগলিক স্বাধীনতা পেলেও আমরা কিন্তু মানসিকভাবে পরাধীনতার শিকল স্বেচ্ছায় পরেছি। বিজাতীয় কৃষ্টি সংস্কৃতিতে আজ আমরা আচ্ছন্ন হয়ে গেছি। পোশাক-আশাক , খাবার-দাবার , শিল্প-সঙ্গীত, বিনোদন , ভাষার ব্যবহার সর্বক্ষেত্রেই আমরা বাঙালীয়ানা সযতেœ পরিহার করে বিজাতীয়তার দিকে প্রবলভাবে ঝুঁকে পড়েছি। নিজেদের সন্তানদেরকেও সেভাবে চলতে উদ্বুদ্ধ করছি। তা করতে আমরা খুবই গর্ব অনুভব করি। বাঙালীয়ানা আমাদের কাছে আজ গেঁয়ো ব্যাপার। বাঙালীয়ানা পরিত্যাগ করে বিজাতীয়তা অর্জন করতে পারলেই আমরা নিজেদের সভ্য ভাবী।
বিজয় অর্জনের পরই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তুলতে সারাদেশের সর্বস্তরের মানুষ তৎপর হয়ে গিয়েছিল। প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে এ বিষয়ে কার্যকরী অবদান রাখতে সচেষ্ট হয়ে পড়েছিল। বাংলা পরিভাষা তৈরী হয় , প্রণীত হয় বিষয়ভিত্তিক অভিধান। পাঠ্য বইও অনুদিত ও প্রনীত হয়। চারদিকে বাংলাভাষা চালুর রব পড়ে যায়। অফিস আদালত ও দফতর সমূহ এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সাইন বোর্ড সমূহ বাংলায় লেখা হয়। গাড়ির নম্বর প্লেট লেখা হয় বাংলায়। তারপর আকস্মিকভাবেই এগুলো বদলে যায়। এখন অবস্থা এমন হয়েছে যে পরিচয়জ্ঞাপক কার্ড , প্যাড , সীল মোহর , বিয়ে বা জন্ম দিনের দাওয়াতপত্রও লেখা হচ্ছে ইংরাজিতে। অনেক ক্ষেত্রে বাংলা হরফের বদলে ব্যবহৃত হচ্ছে রোমান হরফ । এ মানসিকতাকে ধিক্কার দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কিই বা করার আছে।
মনে রাখতে হবে ভাষা কিন্তু শোষণের হাতিয়ার। বাংলাভাষার অপ্রতিরোধ্য বিজয়ে বিদেশী শোষকেরা প্রমাদ গুনতে থাকে। তাদের শোষণের পথ হতে থাকে রুদ্ধ । তাই তারা সুকৌশলে আমাদের চিন্তা চেতনায় বিজাতীয়তা ঢুকিয়ে দিয়েছে। আমরাও সাময়িক সুবিধা ও আরাম আয়েশের আশায় প্রলোভনের সে ফাঁদে পা দিয়েছি।
আজকে আমরা পরিতাপের সাথে দেখছি সহকারী জজ / বিচারিক ম্যাজিষ্ট্রেটগণ ইংরাজি ভাষায় রায় ও আদেশ সমূহ লিখছেন। তাদের প্রশিক্ষণ শুরু ও শেষের অনুষ্ঠানের ব্যানারগুলো লেখা হচ্ছে ইংরাজি ভাষায়। গোটা প্রশিক্ষণ কর্মসূচী চলছে ইংরাজিতে , যদিও এসব ক্ষেত্রে দশ বছর আগেও ব্যবহৃত হয়েছে বাংলাভাষা। পরীক্ষার্থীদেরকে ইংরাজি ভাষায় উত্তরপত্র লিখতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। ক্যাডেট কলেজ সমূহে শিক্ষার মাধ্যম বাংলা বাদ দিয়ে ইংরাজি করা হয়েছে। গাড়ির নাম , বাড়ির নাম ফলক , বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সাইন বোর্ড লেখা হচ্ছে ইংরাজিতে। প্রাগুক্ত সংবিধান ও আইনের আলোকে এসব কর্মকান্ডকে বেআইনী ও অকার্যকর বললে তাতো অন্যায় হবে না।
সব ক্ষেত্রেই তো বিদেশী সাহায্য তো সুফলদায়ক নয়। দুস্থ ও অভাবগ্রস্থ মানুষের কল্যাণ ও তাদেরকে আইনী সহায়তা দেবার কথা বলে বিদেশী সাহায্য নিয়ে কতিপয় ভাগ্যবান কর্মকর্তাকে চাঁদে চাঁদে বিদেশ করতে আমরা দেখেছি। এ জন্যই দফতর সমূহে বাংলার বদলে ইংরাজি ভাষা ব্যবহার অপরিহার্য বলে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে । এসব কর্মসূচীতে নির্ধারিত কিছু কিছু জেলায় সার্কিট হাউজের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে স্থানীয় কিছু ব্যক্তিদের নিয়ে মতবিনিময় সভা ও ভোজসভা হয়েছে বটে কিন্তু যাদের নাম করে বিদেশী সাহায্য নেওয়া হয়েছে , সেই গরিব দুস্থ অভাবগ্রস্থ মানুষদের ভাগ্যের ইতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হতে আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি।
এতোকিছুর পরও আমরা ফেব্রুয়ারি মাস আসলেই শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য বক্তৃতা দেই , পাজামা-পাঞ্জাবি পরিধান করি । এভাবে যেসব আনুষ্ঠানিকতা করি ও বলি নিজ কর্মক্ষেত্রে তা কিন্তু সযতনে পরিহার করি। এই আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে মুক্ত হতে না পারলে আমাদের জাতীয় মুক্তি অর্জন কখনোই সম্ভব হবে না।
লেখকঃ অনুবন্ধ অধ্যাপক , দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় , রাজশাহী ; সাবেক জেলা ও দায়রা জজ । aniskamal44@yahoo.com
রোমেল রহমান লিখেছেন : আপনাকেও অনেক মোবারকবাদ । আসুন আমাদের অগ্রজদের মতো আমরাও এগিয়ে যাই সর্বস্তরে বাংলাভাষা প্রতিষ্ঠার পথে সকল প্রতিবন্ধতা দূর করার সংগ্রামে।
২
638009
০৫ ফেব্রুয়ারী ২০১২; রাত ০৮:২৪
আব্দুস সামাদ লিখেছেন : "হেন কালে আকাশেতে উঠিলেক চাঁদা, কেরোসীন শিখা বলে এসো মোর দাদা" আমরা এখন কেরসীন শিখা কিনা?তাই,হ্যাচাগ লাইটকেও সালাম করতে আনন্দ পাই। আর একাম যারা করছে, তারাই আইন বানায়,তাদের ছেলেমেয়েরাই বাংলা স্কুলে পড়তে লজ্জা পায়।এটা আমাদেরই লজ্জা দেয়। আপনাকে ধন্যবাদ।
কীবোর্ড
Bijoy UniJoyPhoneticEnglish
নাম:
মন্তব্য:
তথ্য পাঠানো হচ্ছে, অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন
০৫ ফেব্রুয়ারী ২০১২; রাত ০৮:৪৬
630793
রোমেল রহমান লিখেছেন : বাংলাভাষার বিরুদ্ধে যারা আজও ষড়যন্ত্র করছে এবং নিজেরা বিশেষ বিশেষ দিনে বাংলাভাষার দরদী সেজে মায়া কান্না কাদছে তাদের মুখোশ উন্মোচন করে দেই, তাদেরকে সামাজিকভাবে বর্জন করি। / আপনাকে অনেক মোবারকবাদ।