A Portrait of Glorious Bangladesh
Home

নাজাকাত এবং পৃথিবীর প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য রূপে কক্সবাজারের নমিনেশনের জন্য একটি ভোট

ফারজানা মাহবুবা

১.

নাজাকাতের সঙ্গে আমার পরিচয় কিচেনে । আমার ক্লাস শেডিউল একটু অসময়ে হয়ে যাওয়ায় প্রায়ই দেখা যেতো আমি যখন কিচেনে যেতাম তখন প্রায় সবার রান্না শেষ । এতে একদিক দিয়ে সুবিধাই হতো । পুরো কিচেনটাতেই আমি ঘুরে ফিরে আরাম করে রান্না করতে পারতাম । তারপর আসেত্ম-ধীরে খেতাম ।

একদিন দেখি নতুন এক মেয়ে । আমারই সমান । বস্নন্ড চুল , লালচে ছোপ ছোপ সাদা চামড়া , বুঝলাম ইওরোপিয়ান । কিন ' এমন খিদে পেয়েছিল যে , সেদিন আর কথা বলা হলো না ।

এক দিন , দুই দিন , তিন দিন...

জিজ্ঞাসা করলাম , তোমার লাঞ্চ করতে প্রায় দেরি হয় দেখি ।

ও বললো- তোমারও তো ।

হেসে ফেললাম ।

ব্যাস , এভাবেই শুরম্ন কিচেন ফ্রেন্ডশিপের ।

জানলাম ও রাশান মুসলিম । কিন ' সমস্যা বাধলো আমার দেশ নিয়ে । ও কিছুতেই আমার দেশ চেনে না । চেনে না তাও ঠিক ছিল , কিন ' দেখি উচ্চারণও করতে পারে না ।

খালি বলে- ‘ ব্যাংলেদেস ' ।

নোওও , বাংলাদেশ ।

- ব্যাং লে এ দে স স স ।

- নোওওওও , ইটস বাং লা দে এ এ এ শ শ ।

- ওওওহ , আই কান্ট হেল্প ইট । ব্যাংলাদেস ? ইজ ইট ওকে নাউ ?

আমার মাথা প্রায় খারাপ করে ফেলে ও বাংলাদেস করতে করতে । আমি একটা জিনিস কিছুতেই বুঝি না , বাংলাদেশ শব্দটা এমন কি কঠিন যে বেশির ভাগ বিদেশিই কিছুতেই ঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারে না ?

উচ্চারণ শেখানোতে নিজেই ক্লানত্ম হয়ে যতি টানলাম । এবার তার নতুন প্রশ্ন- এটা কি ইনডিয়ার অংশ ।

আমি এমনভাবে ‘ নোওও ' বলে উঠি যে ও বেশ ভয়ই পেয়ে যায় । তাড়াতাড়ি আবার বলি- না ভাই , ইনডিয়া আর বাংলাদেশ দুটো আলাদা দেশ ।

এরপর ওকে বাংলাদেশ নিয়ে একেকদিন একেক গল্প বলতাম ।

বলতাম , আমার দেশে গ্রীষ্মে কতো রকম ফল হয় । গ্রামে দুষ্টু ছেলেরা কিভাবে পাথর ছুড়ে অন্যের গাছ থেকে ফল পেড়ে খায় । বর্ষায় টিনের চালে যখন ঝুম বৃষ্টি পড়ে তখন কেমন সুর করে গেয়ে ওঠে পুরো প্রকৃতি । শরতে আকাশ কেমন বিশাল একটা ক্যানভাস হয়ে যায় হালকা নীল আর সাদা মেঘ কোলে নিয়ে । হেমনত্ম ধানের গন্ধে পুরো গ্রাম কেমন মাতাল হয়ে যায় । শীতে ভোরে কুয়াশার চাদর গায়ে খেজুর রস খেতে কেমন স্বর্গীয় অনুভূতি হয় । বসনেত্ম হাজারো রকমের ফুলে হেসে ওঠে বাংলাদেশ ।

ও বলতো আ ' ম জেলাস! ইউ গট সাচ অ্যান ওন্ডারফুল কান্ট্রি ।

আমি খুশিতে ঝলমল করে উঠতাম ।

তারপর একদিন হঠা ৎ কিচেনে এসেই নাজাকাতের বিস্ময়ভরা প্রশ্ন- হ্যাই , ইউ ডিডন্ট টেল মি অ্যাবাউট ইউর ফ্লাড অ্যান্ড মসকুইটো ।

আমি অবাক হলাম না । শুধু জিজ্ঞাসা করলাম- কোথা থেকে শুনলে ?

বললো- ক্লাসে স্যার আজ এশিয়ান জিওগ্রাফিতে বলেছে । পুরো দেশটাই তো ফ্লাডে ডুবে যায় । আর মসকুইটোর কারণে সারাড়্গণ তোমরা নেটের ভেতর ঢুকে থাকো ।

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম । তারপর বললাম দেখো , বন্যা হয় , কিন ' পুরো দেশ ডোবে না । তাছাড়া ভৌগোলিক অবস ' ানের কারণেই প্রতি বছর একটা সময়ের জন্য বন্যা হয় । কিন ' আমরা সাহসী জাতি , প্রতি বছর বন্যার পরও মাথা তুলেই দাড়িয়ে আছি ।

আর মশাও আছে । তবে শুধু রাজধানীতেই বেশি । কিন ' বেশি মানে এতো নয় যে , আমরা সারাড়্গণ মশারি দিয়ে থাকি । শুধু রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময় মশারি দেই ।

ও কি বোঝে কে জানে , চুপ করে থাকে ।

আরেক দিন বলে- আই স ইউর কান্ট্র্রিজ পিকচার ইন ইন্টারনেট । বাট অল আর পুওর পিপলস পিক্স ।

আমি আবারো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলি দেখো , সব দেশেই গরিব আছে । খোদ উন্নত দেশগুলোতেই এমন মানুষ আছে যারা রাসত্মায় ঘুমায় । আমাদের দেশেও আছে । হয়তো বেশিই আছে । কিন ' মিডিয়া কেবল গরিবদের তুলে ধরার মানে এই নয় যে , আমরা শুধু গরিব ।

এবারো ও চুপ করে থাকে ।

আমি আর দেশের টপিকস তুলি না । নাজাকাতও না । অনেকদিন পর শুধু একবার বলে ইউ ম্যান লাভ ইউর কান্ট্রি ভেরি মাচ । লাকি কান্ট্রি গট পিপল লাইক ইউ ।

আমার চোখে পানি চলে আসে । আমি রান্না হয়েছে কি না দেখার ভান করে ঢাকনা তুলে মুখ লুকাই । চোখের পানি রান্নার বাষ্পের সঙ্গে মিশে যায় ।

নাজাকাতকে আমার বলা হয় না , আমার দেশটা বড় দুর্ভাগা । এখানে গ্রীষ্মে ফল ধরে ঠিকই , কিন ' তা শুধু পয়সাওয়ালারাই কিনতে পারে । এখানে বর্ষায় বৃষ্টি বিলাসের চেয়ে বৃষ্টিতে ভিজে রিকশা চালানোর মানুষ বেশি । শরতে আকাশ দেখার সৌভাগ্য হয় না গার্মেন্টের মেয়েদের । ওরা ভোরে খোয়াড়ে ঢোকে , সন্ধ্যা পেরম্নলে বের হয় । হেমনেত্ম ধানের গন্ধ দূরে থাক , অনেক পরিবার ভাতের মাড়টুকুও পায় না । শীতে ছালা পেচিয়ে রাসত্মায় ঘুমায় অগণিত মানুষ । বসনত্ম কখন আসে কখন যায় টের পায় না রাসত্মার পাশে ফুটপাথে বড় হওয়া বাচ্চাগুলো...

২.

দেশে চলে এসেছি প্রায় নয় মাস হয়ে গেল ।

সেদিন ইন্টারনেটে দেখি পৃথিবীর প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যের নমিনেশন ভোট হচ্ছে এবং বাংলাদেশের কক্সবাজার এক নাম্বার এবং সুন্দরবন দুই নাম্বার অবস ' ানে । আমি দ্রম্নত আমার পরিচিত সবাইকে ফরওয়ার্ড মেইল করি আমার দেশের এই দুই প্রাকৃতিক সম্পদকে নমিনেশন পদে ভোট দেয়ার জন্য । মেইল লিস্টে নাজাকাতের অ্যাড্রেসও ছিল ।

দুদিন পর নাজাকাতের মেইল আসে ‘ হেই আই ভোটেড ফর কক্সবাজার , দি লংগেস্ট সি-বিচ অফ দি ওয়ার্ল্ড । নাউ , আ ' ম কনফিউজড হোয়েদার ইউর কান্ট্রি ইজ লাকি অ্যাজ ইট গট পিপল লাইক ইউ অর ইউ পিপল লাকি গট অ্যা কান্ট্রি লাইক ব্যাংলেদেস! '

আমার চোখে পানি চলে আসে , রাশিয়ান একটা মেয়ে আমাদের কক্সবাজারের জন্য ভোট দিয়েছে ।

পৃথিবীর প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যে কক্সবাজারের নমিনেশনের জন্য একজন বিদেশি যদি ভোট দিতে পারে তাহলে আমরা কেন পারবো না নিজের দেশকে মহিমান্বিত করতে ?

যারা এ লেখাটি পড়ছেন তাদের কাছে বিনীত অনুরোধ কক্সবাজারের নাম সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিন । এখনি লগ ইন করম্নন-

http://www.new7wonders.com/nature/en/vote_on_nominees/

ভোট বক্সে এশিয়া ক্লিক করম্নন । ভোট দিন কক্সবাজার এবং সুন্দরবনকে । পরিচিত সবাইকে বলুন ভোট দিতে ।

বাংলাদেশের আরেকটি পরিচয় উঠে আসুক বিশ্ব দরবারে । আমাদের গর্বে যুক্ত হোক আরেকটি নতুন মাত্রা ।

 


 
© Sonar Bangladesh, 2002-2008, Dhaka, Bangladesh. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Last updated on May 1, 2008