A Portrait of Glorious Bangladesh
Home

বাংলাদেশ: ভবিষ্যতের লড়াই

খোমেনী ইহ্‌সান

ভবিষ্যতে বাংলাদেশে কী কোন লড়াই ঘনায়মান ? লড়াই যদি ভবিষ্যতের গর্ভেই থাকে , তাহলে এখন কি লড়াই শূণ্য বাংলাদেশ ? এমন দু ' টি প্রশ্নের হাত ধরেই আমাদের বাংলাদেশের ভবিষ্যত লড়াই বিষয়ক আলোচনায় নাক গলাতে হবে । নাকটা শেষের প্রশ্নে ঢুকিয়েই প্রথমটার ফয়সালা করার চেষ্টা করছি ।

আসলে ‘ বাংলাদেশ ' বলে আমরা যদি একটি বিশেষ রাজনৈতিক সত্ত্বাকে গণ্য করি , যার অপর রাষ্ট্রসমূহের সাপেক্ষে সীমানা-সার্বভৌমত্ব রয়েছে অথবা একটি বিশেষ ভূ-খন্ডের বাংলাদেশ নাম ধারণ করে রাষ্ট্র হয়ে ওঠার চেষ্টার ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় রাখি , তাহলে এর একটা লড়াই সব সময় হাজির থাকে । রাষ্ট্র কোন হাওয়াই ব্যাপার না । ব্যক্তি সমষ্টির একই ইচ্ছার প্রতিফলনেই রাষ্ট্রের উদ্ভব । ব্যক্তি সমষ্টির এই ইচ্ছার প্রতিফলনের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট মতাদর্শের রাজনৈতিকতা প্রতিষ্ঠিত হয় বলেই রাষ্ট্র একটি রাজনৈতিক সত্ত্বা । তাই কোন রাষ্ট্র সত্ত্বাকে ঘিরে ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক রাজনীতিই মাত্র । এই রাজনীতিতে লড়াই আছে , থাকতে হয় । কারণ রাষ্ট্র সকল ব্যক্তিকে সমান বলে দাবি করলেও শ্রেণীতে শ্রেণীতে বিভক্ত ব্যক্তিরা কোন ভাবেই সমান নয় । শ্রেণীগত অবস ' ানের কারণে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে অসমতা থাকেই । পুঁজির ঐতিহাসিক বিকাশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় , শ্রেনীসমূহের অবস ' ান , সঙ্গতি ও সক্ষমতায় একটি সাম্যবাদী মতাদর্শের রাজনীতির প্রতিষ্ঠা ব্যতিত প্রত্যেক শ্রেনীই অসম । এই সাম্যবাদী মতাদর্শের অনুপসি ' তে অন্য সব মতাদর্শের গর্ভে পুঁজি তার বিকাশ ঘটায় অসমতা আর শোষণের রূপে-গুণে । এটি ব্যক্তি মানুষ মানতে চায় না । সাম্য চায় । এর জন্য লড়াইও অনিবার্য করে তুলে । এই সত্য মানুষের ইতিহাসে অসামান্য ও এড়িয়ে যাওয়ার পথহীন ।

এখন বাংলাদেশকে ঘিরে এর নাগরিকদের পারষ্পরিক যে সম্পর্ক রয়েছে তার বিচার করলে বলা যায় এর নাগরিকদের একটা লড়াই বর্তমান রয়েছে । এই লড়াই বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই বর্তমান ছিল । কারণ পাকিস-ান রাষ্ট্রে বাংলাদেশ ভূ-খন্ডের নাগরিকদের লড়াই ছিল বলেই একটি যুদ্ধ হয়েছে ও আরেকটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে । এই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালে নাগরিকদের সকলকে সমান বলে ধরে নেওয়া হলেও শ্রেণীতে শ্রেণীতে অসমতার অবসান হয়নি তাই তখন থেকে বাংলাদেশ লড়াইয়ের মধ্যে নিপতিত । এতটুকু বলে দিয়ে সামনে গেলে বড় একটা বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হবে । বিষয়টি হচ্ছে শ্রেণীতে শ্রেণীতে সমতা প্রতিষ্ঠার এক বিরাট সুযোগ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পাওয়া গিয়েছিল , যা নষ্ট করা হয়েছে । একটি শ্রেণী অন্য সকল শ্রেণীর উপর শোষণ আর আধিপত্য কায়েম করেছে । এই শ্রেণীকে শোষিত শ্রেণীর ব্যক্তিরা শত্রু গণ্য করে তাদের পরাভূত করে সত্যিকারের সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে চায় । আবার বাংলাদেশের বাইরের বিভিন্ন রাষ্ট্র এই একটি শ্রেণীকে শোষণ করার , আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ও টিকে থাকার সহায়ক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়ে শোষিত শ্রেণীর শত্রুতে পরিণত হয়েছে । ফলত বাংলাদেশের শোষিত ও আধিপত্যের শিকার শ্রেণীর মানুষেরা রাষ্ট্রীয় শ্রেণী শত্রু ও তাদের পররাষ্ট্রীয় মিত্রদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত । তাই শোষিত শ্রেণীর লড়াইয়ের ফ্রন্ট বা ক্ষেত্র দু ' টি ।

দুই ফ্রন্টের লড়াই বর্তমান থাকা সত্ত্বেও আমরা বৈঠকে বসেছি ভবিষ্যতের লড়াইকে আলোচনা করতে । এখানে বর্তমানকে ছাপিয়ে ভবিষ্যতকে খুব গুরুত্ব দিচ্ছি আমরা । এর কারণ কী ? আসলে পুঁজিবাদ বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদে পর্যবসিত হয়ে একটি ভবিষ্যত নির্মাণের চেষ্টায় লিপ্ত । সাম্রাজ্যবাদ চাচ্ছে সকল রাষ্ট্রকে অধীনস- করতে । এ ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদ রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করে ও এর নাগরিককে দাস জ্ঞান করে তার নিজস্ব রাজনৈতিকতাকে অস্বীকার করছে । সাম্রাজ্যবাদের এই কুফুরির পরিণতিতে ব্যক্তি আধিপত্যের এক বিশাল সীমানায় আত্মপরিচয়হীন হয়ে দাসের খেতাব নিয়ে বেঁচে থাকার কর্তব্য পালন করতেই বাধ্য থাকছে মাত্র । এ অবস ' ায় ব্যক্তি মানুষের নিজ রাষ্ট্রীয় শ্রেণী শত্রুর সাথে লড়াই করা প্রাধাণ্য পাওয়ার অযোগ্য হয়ে যায় । সাম্রাজ্যবাদের সাথে লড়াই প্রধান গুরুত্বের দাবিদার হয় । তবে শ্রেণী শত্রুর সাথে লড়াই তামাদি হয় না , একই সাথে চালাতে হয় । শোষিত শ্রেণীর লড়াইয়ের দুটি ফ্রন্টই কার্যকর থাকলেও আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছি সাম্রাজ্যবাদের সাথে লড়াই-ই প্রধান । এক্ষেত্রে অনুতপ্ত নিজ রাষ্ট্রীয় শ্রেণী শত্রুরা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ে শরিক হওয়ার সুযোগের দাবি রাখে । কারণ সাম্রাজ্যবাদ শ্রেণী শত্রুদেরও পরাজিত করে অনুগত শ্রেণীর ক্ষমতায়ন ঘটায় । আর সাম্রাজ্যবাদ প্রতিরোধের লড়াই একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রে জাতীয় লড়াই হিসেবে চিহ্নিত হয় ।

শোষিত শ্রেণীর লড়াই নিয়ে এতোটুকু আলোচনাকে বিবেচনায় রেখে আমরা অনুমান করতে পারি বাংলাদেশের সামনে লড়াইটা কেমন হবে । আমাদের মনে হচ্ছে বাংলাদেশে একটি জাতীয় লড়াই আসন্ন । এ লড়াই সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী হবে । কারণ বর্তমান বিশ্বে একক পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের শিকার হয়েছে বাংলাদেশ । এই আগ্রাসনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন , কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া আন-র্জাতিক মিত্র হয়েছে । অন্য দিকে আগ্রাসনের দক্ষিণ এশিয় মিত্র হয়েছে ভারত । এই রাষ্ট্রটি চাচেছ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও এর সহযোগীদের হাতে রেখে নিজেই একটি আগ্রাসন চালাতে , যা সমপ্রসারণবাদ বলে স্বাধীনতা লাভের পরপরই এই ভূ-খন্ডের ক্ষণজন্মা বীর শহীদ সিরাজ শিকদারের দাবির প্রেক্ষিতে ও ভারতীয় কর্মকান্ডে বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বাস করে আসছে ।

প্রকৃত প্রস-াবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রে শ্রেণী সাম্য প্রতিষ্ঠা করে জাতীয় মুক্তি অর্জণের গণতান্ত্রিক বিকাশ হয় নি । যা এ দেশের নাগরিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠকে সংক্ষুব্ধ করে রাষ্ট্র সম্পর্কে একটি নেতিবাচক অবস ' ানে পৌছে দিয়েছে । এই নেতিবাচকতা সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের দোষ নয় । দোষী সংখ্যা লঘিষ্ঠ শোষক শ্রেণীই । রাষ্ট্রে জাতীয় মুক্তির গণতান্ত্রিক বিকাশ নিশ্চিত না হওয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকরা যেমন রাষ্ট্রীয় সংহতির বাইরে রয়ে গেছে , পাশাপাশি পর রাষ্ট্রীয় সাম্রাজ্যবাদী ও সমপ্রসারণবাদীরাও আস্কারা পেয়েছে বেশ । এর ফলে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি একটি কঠিন অবস ' ায় পতিত হয় বাংলাদেশ । এই অবস ' া থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ চাট্টিখানি ব্যাপার না । এটি শুধু বাংলাদেশের অভ্যন-রীণ ব্যাপার হলে হয়তো হতো । কিন ' এ ঘটনাটিকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নাইন ইলেভেন অনুকরণে ওয়ান ইলেভেন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে । যা ঘটনাকে ব্যবহার করে অনন- যুদ্ধের মতবাদের অনুসারী হয়ে পড়ে । নাইন ইলেভেনকে ব্যবহার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার রাষ্ট্রের নাগরিকদের হোমল্যান্ড সিকিউরিটির নামে অধিকার হারা করেছে আর দেশে দেশে আগ্রাসনের মওকা খুঁজে পেয়েছে । যা সূচনা করেছে অনন- যুদ্ধের এক ভয়াবহ দুর্বৃত্তায়ন ।

ওয়ান ইলেভেনে বাংলাদেশে দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির অন-ঃসার শূণ্যতাকে ও কথিত দুর্নীতিকে কাজে লাগিয়ে একটি দেশীয় পক্ষ , যারা সাম্রাজ্যবাদ ও সমপ্রসারণবাদের দালালি করছে , তারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে । এ যুদ্ধের ফলে বাংলাদেশ রাষ্ট্র থাকা সত্ত্বেও অনির্বাচিত সরকার , সংবিধান বহির্ভূত কার্যক্রম ও জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার মধ্যে পতিত হয়েছে । এ পতিত দশা থেকে উদ্ধার সুদূর পরাহত । যদি উদ্ধার ত ৎ পরতা চালাতে হয় তাহলে তা সম্মিলিত সংগ্রাম ছাড়া কোন ভাবেই সম্ভব নয় । এই সংগ্রামে ওয়ান ইলেভেনের বিরোধী বুর্জোয়া , পাতি বুর্জোয়া , সমাজবাদী , সাম্যবাদী তথা সকল শ্রেণীর নাগরিকদের অংশগ্রহণ করতে হবে । এই সংগ্রামে বিজয়ী হওয়ার পাশাপাশি শ্রেণী মুক্তির নিশ্চয়তা বিধানের সংগ্রামও চালাতে হবে ।

এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যত লড়াই । মজার কথা হচ্ছে শ্রেণী মুক্তির যে লড়াই তা কোন মতাদর্শকে ঘিরে হবে তা এখনও পষ্ট হয়নি । কিন ' শ্রেণী মুক্তির লড়াই হবে নিশ্চিত । সে ক্ষেত্রে দুটি মতাদর্শ সামনে চলে আসে । একটি সমাজতন্ত্র অন্যটি ইসলাম । দুই মতাদর্শেই শ্রেণী সংগ্রাম ঐতিহাসিকভাবে লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে । এই অভিজ্ঞতায় দুটি মতাদর্শেই সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা জানা যায় । এখন শেষ প্রশ্নটি হচ্ছে বাংলাদেশে কোন মতাদর্শ কার্যকর থাকবে শ্রেণী সংগ্রামে তা এই দুই মতাদর্শের অনুসারীদেরই পষ্ট করতে হবে । এই পষ্টাপষ্টির ব্যাপারটি আগামী দিনের সাংবাদিকতায় গভীর অুনসন্ধানের ব্যাপার হচ্ছে নিশ্চিত । সংবাদ কর্মীদের সহযোগিতা করার উদ্দেশ্যে বলছি দুটি পক্ষের মধ্যে কিন ' সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ে একটি আঁতাতও গড়ে ওঠছে বিশ্বের দেশে দেশে । এটি বাংলাদেশে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কই ?

আমাদের এই আলোচনার বুননে মুন্সিয়ানার ঘাটতি থাকলেও জাতীয় মুক্তি ও শ্রেণী মুক্তির তাগিদ কোন অংশেই আবেদন হারাবে না । কারণ ১৯৭১ সালের লাখো মানুষের রক্তের সিড়ি বেয়ে যে বাংলাদেশের আগমন বিশ্বে মানচিত্রে তাকে ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে প্রমাণ করার জন্য যা যা করা দরকার সম্পন্ন হয়ে গেছে । কিন ' এর বিরুদ্ধে গণমানুষের যে প্রতিরোধ হবে তার ছিটেফোটাও আমরা এখনও মোকাবেলা করিনি । অর্থা ৎ প্রতিরোধটা কতো ব্যাপক হবে তা ভবিষ্যতেই জানা যাচ্ছে ।

 

 

 
© Sonar Bangladesh, 2002-2008, Dhaka, Bangladesh. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Last updated on May 10, 2008