বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক গুরুদের অন্যতম চীনের মাও সে তুং-এর একটি বহুল প্রচারিত তত্ত্ব হচ্ছে, বন্দুকের নলই সকল ক্ষমতার উংস। সমাজতন্ত্রের শক্র-মিত্র নির্বিশেষে সচরাচর পারিপার্শ্বিক অবস্খার বিচার-বিশ্লেষণ ব্যতিরেকেই এই আপ্ত-বাক্যটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এক-এগারোর অব্যবহিত পরবর্তী বাংলাদেশের অবস্খাদৃষ্টে বাংলাদেশের জনগণ হয়তো এই তত্ত্বে অধিকতর বিশ্বাস করতেও আরম্ভ করেছিল। আমার অত্যন্ত প্রিয়ভাজন কবি এবং কলামিস্ট ফরহাদ মজহারও বিগত পনেরো মাসে তার একাধিক কলামে মাও-এর উপরোক্ত তত্ত্বটিকে মোটামুটিভাবে ইতিবাচক অর্থেই ব্যবহার করেছেন। বর্তমান অনির্বাচিত সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতার আলোকে জনাব মজহারের সাথে আমি সবিনয়ে দ্বিমত পোষণ করব। এ কথা ঠিক, গেল বছর এক-এগারো এসেছিল আপাতদৃষ্টিতে বন্দুকের নলে সওয়ার হয়েই। তবে আপাতদৃষ্টির বিভ্রম যে হতে পারে না এমন দাবি করা যাবে না। বাস্তবতা হলো এক-এগারো বাংলাদেশের জনগণের কাছে এখনো এক বিরাট রহস্য হয়েই আছে। আমরা যারা লেখালিখি করে থাকি তারা নিজেদের বিচারবুদ্ধি ব্যবহার করে এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির সাথে মিলিয়ে কথিত রাজনৈতিক ভূমিকম্পকে বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছি। বর্তমানে কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার নেতৃত্বাধীন একদা মহাজোটের নেতাকর্মীদের বদ্ধমূল বিশ্বাস, এক-এগারো তাদের লাঠি-বৈঠার বর্বর আন্দোলনেরই ফসল। সংবাদমাধ্যমে প্রদত্ত বক্তব্য-বিবৃতিতে এ বিষয়টি নিয়ে তারা যথেষ্ট আত্মশ্লাঘাও প্রকাশ করে থাকেন। অপ্রকাশ্য সরকারের নীতিনির্ধারকরাও সম্ভবত মনে করেন, তারাই জরুরি অবস্খা জারির মতো চরম সিদ্ধান্ত গ্রহণে মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে বাধ্য করেছেন। আমার ব্যক্তিগত ধারণা অবশ্য কিছুটা ভিন্ন। বাংলাদেশকে নিয়ে পরাশক্তিগুলোর নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষাদৃষ্টে আমার কাছে অন্তত প্রতীয়মান হচ্ছে যে এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা এবং নেপথ্যজনেরা দু’পক্ষই সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছে মাত্র। ঘটনার প্রকৃত নিয়ন্ত্রক তারা কিছুতেই নন। বড়জোর এদেরকে বাংলাদেশের বর্তমান সঙ্কট সৃষ্টির উপলক্ষ বলা যেতে পারে। বাল্যকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ভক্তিভাজন’ নামে একটি ক্ষুদ্র কবিতা পড়েছিলাম।
রথযাত্রা লোকারণ্য, মহা ধুমধাম
ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম।
পথ ভাবে ‘আমি দেব ’ রথ ভাবে ‘আমি’
মূর্তি ভাবে, ‘আমি দেব’ হাসে অন্তর্যামী।
রবীন্দ্রনাথের কবিতার মতোই এক-এগারোর প্রকৃত
অন্তর্যামীবৃন্দ শেখ হাসিনার মহাজোট এবং নেপথ্যের নায়কদের আস্ফালন দেখে নিশ্চয়ই হেসে কুটিপাটি হন। পানীয়ের পাত্র হাতে বাংলাদেশের গ্রিন জোনে বসে এরা এ দেশের রাজনৈতিক এবং অরাজনৈতিক উভয় প্রকৃতির নেতৃবৃন্দের নির্বুদ্ধিতা নিয়ে একে অপরের সাথে ঠাট্টা-মশকরা করেন। বাংলাদেশের আমজনতার দুর্ভাগ্য যে তাদের ওপর লাঠি ঘোরানো দোর্দণ্ডপ্রতাপ দেশীয় শাসক শ্রেণীর সাদা চামড়াপ্রীতি আর গেল না। দুই শ’ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়াতেই সম্ভবত এমন সরীসৃপসম আচরণ। ক’দিন আগে বিএনপি’র মূলধারার মহাসচিব খোন্দকার
দেলোয়ার বৈঠক করলেন মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স গীতা পাসির সাথে। এই বৈঠকের মাধ্যমে টেলিভিশনের পর্দায় আসার আপাতত শেষ সুযোগটি গ্রহণ করেছেন এই কূটনীতিক। কারণ তার মাত্র তিন দিন পরেই ঢাকায় সস্ত্রীক পা রেখেছেন আসল ক্ষমতাধর ব্যক্তি অর্থাৎ নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মি. মরিয়ার্টি। আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে কুলায় না গীতা পাসির সাথে ফটোসেশনে সম্মতি দিয়ে খোন্দকার দেলোয়ার তার নিজের এবং দলের জন্য কী অর্জন করলেন? মার্কিন কূটনীতিকের সাথে চা পান করাই যদি উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তাহলে সপ্তাহখানেক অপেক্ষা করে দূতাবাসের এক নম্বর ব্যক্তিটির সাথেই তো সেই কাজটি করা যেত। মার্কিন দূতাবাসের দুই নম্বর ব্যক্তিটিকে সাক্ষাৎ প্রদান করে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির কী উপকার সাধিত হলো সেটি জানার বড়ই বাসনা রইল। বন্দুকের ক্ষমতাবিষয়ক মূল আলোচনায় ফেরত যাওয়া যাক।
বাংলাদেশেরঅর্থনীতির গতিপ্রকৃতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি প্রতিবেদন গত সপ্তাহে প্রকাশিত হয়েছে। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান বছরে বাংলাদেশের দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৫.৫ শতাংশ অর্জিত হবে এবং ২০০৯ সালে এই প্রবৃদ্ধি নাকি এক শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৬.৫ শতাংশে উন্নীত হবে। দেশের জনগণ বোধহয় এখনো বিস্মৃত হননি, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৬৩ শতাংশ। মনে করিয়ে দেয়া অনাবশ্যক যে সেই সময় দেশে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের প্রচারণা অনুযায়ী একটি অতি দুষ্ট প্রকৃতির সরকার ক্ষমতাসীন ছিল। সেই সময় বিশ্বব্যাংক এবং তাদেরই অর্থপুষ্ট ও বশংবদ সুশীল(?) সমাজের প্রচারণা ছিল, এই দুর্নীতিপরায়ণদের স্খলে সৎ মানুষের সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া মাত্র আমাদের জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি এক লাফে ২ শতাংশ বেড়ে যাবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ডিএফআইডি (উঋওউ)-এর অর্থানুকূল্যে পরিচালিত ‘সৎ ও যোগ্য প্রার্থী আন্দোলন’-এর সারা দেশ চষে বেড়ানোর স্মৃতি আমরা এখনো নিশ্চয়ই ভুলতে পারিনি। ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধির গড় বৃদ্ধি হিসাব করে তার সাথে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের উপহার হিসেবে ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি যোগ করলে ২০০৯ সালে বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি অবশ্যই ১০ শতাংশ অর্থাৎ দুই অঙ্কে পৌঁছানোর কথা ছিল। এই সরকারের প্রকাশ্য এবং জোরদার সমর্থক আইএমএফ এখন বলছে জাতীয় আয়ে সে রকম নাটকীয় কিছু নাকি ঘটতে যাচ্ছে না। তাহলে আমরা ধরে নিতে বাধ্য হচ্ছি, দেশ থেকে দুর্নীতি দূর হওয়া দূরের কথা পরিসংখ্যান বলছে দুর্নীতি বরং বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ বিগত কথিত দুর্নীতিপরায়ণ জোট সরকারের পাঁচ বছরের শাসনকালীন জাতীয় আয়ের বাৎসরিক গড় বৃদ্ধি ধরে রাখলেও ২০০৯ সালে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ হওয়ার কথা। আমাদের মতো নিন্দুকের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। জরুরি সরকারের দুই প্রধান দীক্ষা গুরুর একজন, টিআইবি প্রধান প্রফেসর মোজাফ্ফর আহমেদও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে তার ভাবশিষ্যদের শাসনামলে প্রশাসনের নিুস্তরে দুর্নীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। এফবিসিসিআই সভাপতি আনিসুল হক সম্প্রতি এক গোলটেবিল বৈঠকে দাবি করেছেন, সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে রাজনৈতিক দুর্নীতি কমলেও আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি বেড়েছে। প্রশাসনের উচ্চস্তরের তুলনায় নিুস্তরের দুর্নীতিই যে সাধারণ জনগণের জন্য অধিকতর হয়রানিমূলক এবং ক্ষতিকারক এ বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের যে অবকাশ নেই সেটি বোধহয় স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টাও স্বীকার করবেন। আমার এই মধ্য পঞ্চাশের জীবনকালে বর্তমানের মতো নির্মম হয়রানি আর কোনো দিন প্রত্যক্ষ করেছি বলে স্মরণে আসছে না। কিন্তু যারা এসবের অনুঘটক তারা না পারল মানুষের আয় বাড়াতে, না পারল দুর্নীতির প্রকোপ কমাতে।
বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত ২০০৮ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণী পড়ছিলাম। প্রতি মাসে প্রকাশিত এই বিবরণীটি নানারকম সূচক, পরিসংখ্যান ও হিসাবে ঠাসা থাকে। এত সব অঙ্ক নিয়ে বিশ্লেষণ শুরু করলে পাঠক অতিশয় বিরক্তবোধ করবেন। আমি শুধু বাণিজ্য ঘাটতি এবং বিনিয়োগে মন্দার দিকেই দৃষ্টিপাত করছি। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে জুলাই থেকে ডিসেম্বর এই ছয় মাসে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ২০২৩ বিলিয়ন ডলার যা পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৭ শতাংশ বেশি। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই দেশের চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত কমে দাঁড়িয়েছে ২৮৭ মিলিয়ন ডলারে। চলতি হিসাবে এখনো যে সামান্য উদ্বৃত্তটুকু রয়েছে তার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব প্রবাসী বাংলাদেশীদের। তারা বর্তমান অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে আগের বছরের তুলনায় ৫৮০ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত অর্থ দেশে প্রেরণ করেছে। বিদেশে কর্মরত অতীব পরিশ্রমী এই শ্রমজীবী মানুষদের অসীম দেশপ্রেমই এখনো বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে সচল রেখেছে। সাম্প্রতিক সময়ে পত্রপত্রিকায় নিয়মিত সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে যে বর্তমান সরকারের ভ্রান্ত এবং বিশেষ রাষ্ট্রের প্রতি দুর্বল পররাষ্ট্রনীতির ফলে বিদেশে আমাদের শ্রমবাজার ক্রমেই সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। মোটকথা আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি উদ্বেগজনক আকার গ্রহণ করছে এবং সৎ ও যোগ্য সরকার বিদায়ের আগে দেশের চলতি হিসাবেও উদ্বৃত্তের পরিবর্তে ঘাটতি রেখে গেলে আমি অন্তত বিস্মিত হব না। বিনিয়োগের অবস্খা বোঝার সবচেয়ে কার্যকর সূচক হচ্ছে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির হিসাব। দেশে যন্ত্রপাতি আমদানি বৃদ্ধি ও হন্সাসের অর্থ হচ্ছে যথাক্রমে সরাসরি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং হন্সাস। ২০০৬-০৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি ছিল মোট আমদানির ৯.৩ শতাংশ। বর্তমান অর্থবছরে একই সময়কালে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি হন্সাস পেয়ে দেশের সর্বমোট ১৩ বিলিয়ন ডলার আমদানির ৭.৩ শতাংশে পৌঁছেছে।। বিনিয়োগের এই স্খবিরতা নিয়ে সম্প্রতি ঢাকায় এক গোলটেবিল বৈঠকে অর্থনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ীরা নিুোক্ত মন্তব্য করেছেন, ‘দেশের বর্তমান বিনিয়োগ পরিস্খিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। তারা বলেছেন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও প্রবৃদ্ধির জন্য নতুন বিনিয়োগ জরুরি হলেও দেশে বিনিয়োগ প্রবাহ দীর্ঘদিন থমকে আছে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগে নেমে এসেছে এক ধরনের স্খবিরতা। কর্মসংস্খান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন আর রফতানি বাড়াতে স্খবির এই বিনিয়োগের চাকা সচল করা বর্তমানে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। আর এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সবার আগে প্রয়োজন বিরাজমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার অবসান ঘটানো। জরুরি অবস্খা প্রত্যাহার এবং নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণার মাধ্যমে এই অনিশ্চয়তা দূর করতে হবে বলে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা।’ (আমার দেশ, ১৩ এপ্রিল ২০০৮) আমি যখন বিনিয়োগ বোর্ড পরিচালনার দায়িত্বে ছিলাম তখন বিশ্বব্যাংক এবং এডিবি’র মুখস্খ বুুলি ছিল বাংলাদেশে সুশাসনের অভাবে বিনিয়োগ কাáিক্ষত হারে বাড়ছে না। বাংলাদেশের জেনেভাস্খ মিশনের বর্তমান প্রধান ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সেই সময় বিদেশী অর্থে সেমিনার আয়োজন করে সেখানে প্রতি সপ্তাহে দেশের বিনিয়োগ পরিস্খিতি নিয়ে বড়ই আহাজারি করতেন। আজ বিশ্বব্যাংক, এডিবি এবং দেশের ‘সেরা’ অর্থনীতিবিদ ড. ভট্টাচার্য এবং তার সঙ্গী-সাথী সবারই মুখে কুলুপ আঁটা। এদের কথা বাদ দিয়ে এবার বরং সেনাপ্রধানের কথাই বলি। দিন দশেক আগে ঢাকার বাজারে চালের দাম এবং সরবরাহ সরেজমিন পরিদর্শনে এসে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, দেশে খাদ্যের কোনো সঙ্কট নেই, ব্যবসায়ীরাই এই কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করেছে। বর্তমান সরকার সমর্থক রাজনৈতিক দল পিডিপি’র আহµায়ক ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী ১২ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে সেনাবাহিনী প্রধানের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে বলেছেন, দেশে খাদ্য সঙ্কট নিয়ে রাজনীতি চলছে। জরুরি আইন বলবৎ থাকার পরও এগুলো কিভাবে হচ্ছে তা বোধগম্য নয়। হুমকি-ধমকির জোরে যে দেশের অর্থনীতি চলে না এবং দ্রব্যমূল্য কমে না সেটা তাহলে স্বয়ং সেনাপ্রধান এবং সরকার সমর্থক দল পিডিপি প্রধান শেষ পর্যন্ত স্বীকার করলেন। এই পর্যন্ত আলোচনার পর মন্তব্য করতে বাধ্য হচ্ছি, হুমকি-ধমকি ও বল প্রয়োগ করে কর্মসংস্খানের সুযোগ সৃষ্টি হয় না, দারিদ্র্য দূর হয় না, জাতীয় আয় বাড়ে না, বিনিয়োগে বৃদ্ধি ঘটে না, চালের দাম কমে না, সুশাসন কিংবা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয় না, দেশের সার্বিক অর্থনীতির উন্নতি হয় না, এমনকি দুর্নীতিও দূর হয় না। তবে এর পরও এমন ঢালাও মন্তব্য করতে আমি রাজি নই যে ক্ষমতা দিয়ে কিছুই হয় না। এবার পনেরো মাসের অভিজ্ঞতার আলোকে পর্যালোচনা করা যাক এই অস্ত্রটি কোথায় কোথায় কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়।
দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রসঙ্গটি আলোচনার বাইরে রাখছি কারণ অস্ত্রের প্রয়োগ ছাড়া আগ্রাসী শক্তির আক্রমণ যে প্রতিহত করা সম্ভব নয় সেটি বলাই বাহুল্য। তবে সে ক্ষেত্রেও অস্ত্রের চেয়েও মূল্যবান এবং শক্তিশালী হচ্ছে অস্ত্রধারীর দেশপ্রেম। প্রথমেই স্বীকার করতে হবে যে রাষ্ট্রক্ষমতা দিয়ে দল ভাঙা সম্ভব। এই কাজটি আরো সহজ হয়ে যায় যদি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের নীতি-নৈতিকতা কিংবা সততার বালাই না থাকে। মধ্যরাতে মধুমেহ রোগাক্রান্ত ব্যক্তিদের শর্করাযোগে চা-পানের দাওয়াত গ্রহণ বাধ্যতামূলক করার ক্ষেত্রেও ক্ষমতা যে একটি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে সেটিও প্রমাণিত হয়েছে। ক্ষমতার শীর্ষে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিবর্গের জাতির উদ্দেশ্যে বক্তব্যের বিষয়বস্তু নির্ধারণ, পরিবর্তন এবং তাদের আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণেও এই মহৌষধি ব্যবহার করা যেতে পারে। আদালতের রায় নির্ধারণে আইনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ, খ্যাতিমান আইনজীবীদের কূটতর্ক এবং মসীর ব্যবহারের পাশাপাশি অসি বিশেষ কোনো ভূমিকা রাখে কি না এ বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রিটকৃত একটি মামলার রায় নিয়ে সম্ভবত আইন সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞ হওয়ার কারণেই আমার মনে একটি প্রশ্ন জেগেছে। মামলাটি ছিল ইলেকশন কমিশন কর্তৃক বিএনপি’র কথিত অস্খায়ী মহাসচিব অব: মেজর হাফিজউদ্দিন আহমেদকে সংলাপের জন্য আমন্ত্রণ জানানোকে কেন্দ্র করে। বেগম খালেদা জিয়ার মামলাটি আদালত প্রধানত তিনটি কারণে খারিজ করে দিয়েছেন। প্রথমত, সংলাপের আমন্ত্রণের নির্ধারিত তারিখ ছিল ২২ জানুয়ারি ২০০৭ এবং যেহেতু তারিখটি অতিক্রান্ত হয়েছে কাজেই ওই পত্রের জন্য উদ্ভূত রিটের আর কোনো কার্যকারিতা নেই। সাধারণ জ্ঞানে মনে হচ্ছে আদালতের এই নির্দেশনাটি সঠিক। দ্বিতীয়ত, একটি রাজনৈতিক দলের কে কোন পদ অধিকার করবে সেটি সেই রাজনৈতিক দলের নিতান্তই অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং রিট আদালতের এই পদ-পদবি নির্ধারণের কোনো এখতিয়ার নেই। আদালতের এ ব্যাখ্যাও মেনে নেয়া যেতে পারে যদিও অব: মেজর হাফিজ দাবি করছেন, আদালত নাকি রায়ে তার পদবিকেই বৈধতা প্রদান করেছেন। টেলিভিশনের পর্দায় তার কার্যালয়ে মিষ্টি বিতরণের ধুমও দেখতে পেলাম। এই দাবি করে বিএনপি’র কথিত অস্খায়ী মহাসচিব আদালতের রায়কে বিকৃত অথবা আদালত অবমাননা করছেন কি না সেটি বিবেচনার দায়িত্ব আদালতের। তৃতীয়ত, ইলেকশন কমিশন সংলাপে রাজনৈতিক দলের কোন সদস্যকে আমন্ত্রণ জানাবে এ সংক্রান্ত যেহেতু কোনো আইনসিদ্ধ বিধিমালা নেই, কাজেই কথিত অস্খায়ী মহাসচিব অব: মেজর হাফিজউদ্দিন আহমেদকে সংলাপের আমন্ত্রণ জানিয়ে ইলেকশন কমিশন কোনো বিধি ভঙ্গ করেনি। এ ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের প্রয়াত এবং প্রখ্যাত কমেডিয়ান ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো অবশ্য আমার দুটো কথা আছে। ইলেকশন কমিশন যদি বিএনপি’র একজন সাবেক সংসদ সদস্য এবং চারদলীয় জোট সরকারের দু-দু’টি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাবেক মন্ত্রী অব: মেজর হাফিজকে আমন্ত্রণ জানিয়ে থাকেন তাহলে আমার কোনো কথা নেই। কিন্তু আমন্ত্রণপত্রে ইলেকশন কমিশন যদি নামের আগে দলের অস্খায়ী মহাসচিব, এই পদবি ব্যবহার করে থাকে তাহলে দুটো নয় আমার অনেক কথাই আছে। যে মুহূর্তে ইলেকশন কমিশন অব: মেজর হাফিজের নামের আগে ‘অস্খায়ী মহাসচিব’ পদবি ব্যবহার করবে তখনই আদালত বিএনপি’র গঠনতন্ত্রকে বিবেচনায় নিতে বাধ্য। এই গঠনতন্ত্রটিকে একটি বাজে দলিল আখ্যায়িত করা যেতে পারে, কিন্তু কোনো অবস্খাতেই এটিকে উপেক্ষা করার সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না। দলীয় কাউন্সিল ব্যতীত ক্ষমতাসীনদের কোনো ফরমানের বলে বিএনপি গঠনতন্ত্রকে যে পরিবর্তন করা যাবে না সেটি বোধহয় রায় প্রদানকারী মাননীয় বিচারকবৃন্দও জানেন। বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষের বড় বড় আইনজীবী আমার যুক্তিটি বিবেচনা করে দেখতে পারেন। অসি এবং মসীর মধ্যে কোনটি অধিকতর শক্তিশালী এ বিষয়ে স্কুলজীবনে বিতর্ক করেননি এমন লেখাপড়া জানা ব্যক্তির সংখ্যা আমাদের দেশে নগণ্যই হবে। বর্তমানে আদালত পাড়ার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে পুরনো বিতর্কের বিষয়বস্তু নতুন করে যদি আমাদের মনে পড়ে যায় তাহলে আশা করি আদালত অবমাননার অভিযোগ উথাপিত হবে না। বিগত পনেরো মাসে ক্ষমতার সহায়তায় আরো যেসব কাজকর্ম করা গেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ১. সংবিধান নামক অপ্রয়োজনীয় বস্তুটিকে পাশ কাটিয়ে একটি অনিয়মিত সরকার প্রতিষ্ঠা, ২. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদকালকে রবারের মতো টেনে লম্বা করা, ৩. রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে নিত্যনতুন পদ সৃষ্টি, ৪. কারো কারো চাকরির মেয়াদ বর্ধিতকরণ, ৫. দেশের বেসামরিক নাগরিকদের সাথে প্রভুসুলভ আচরণ, ৬. দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে সংবিধানবহির্ভূতভাবে প্রতিবেশী পরাশক্তিকে এয়ার ট্রানজিট প্রদান, ৭. দুর্নীতি দমনের নামে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়ের ইত্যাদি, ইত্যাদি।
সমাজতন্ত্রের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা মাও সে তুং-এর তত্ত্ব দিয়ে আজকের লেখা শুরু করেছিলাম। তিনি যে আস্তিক ছিলেন না সেটা ধারণা করতে আমাদের খুব বেশি অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কাজেই যখন তিনি বন্দুকের নলকে সকল ক্ষমতার উৎস হিসেবে বর্ণনা করেছেন তখন নিশ্চিতভাবেই পার্থিব বিবেচনা বোধ থেকেই তার সেই সদম্ভ উচ্চারণ। আমাদের সমাজের বিশ্বাসী শ্রেণী কিন্তু অপার্থিব শক্তিকেই সব কিছুর ঊর্ধ্বে স্খান দিয়ে থাকেন। আমার জানা মতে, বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে বিশ্বাসী শ্রেণীই বিপুলভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ। এই বিশ্বাসী শ্রেণীর মধ্যে বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক বিভাজন থাকতে পারে তবে অপার্থিব শক্তির কাছে আত্মসমর্পণের বিষয়ে সম্ভবত নাস্তিক্যবাদে বিশ্বাসী অতি ক্ষুদ্র শ্রেণী ব্যতীত সবাই একমত পোষণ করবেন। বর্তমানে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশ শাসন করছেন তাদের মধ্যে কতজন নাস্তিকতায় বিশ্বাস করেন সে তথ্য আমার জানা নেই। তবে যেহেতু শাসক শ্রেণীর মধ্যে সমাজেরই প্রতিফলন থাকে, কাজেই ধারণা করছি যে সেখানেও প্রকাশ্যে নাস্তিকতা চর্চাকারী ব্যক্তির সংখ্যা অনুল্লেখ্যই হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বর্তমান সরকার নেপথ্য শক্তির ওপর যে অতি নির্ভরতা প্রদর্শন করছে তা কিন্তু যেকোনো ধর্মবিশ্বাসের বিচারেও অতীব অন্যায় আচরণ। আমার আজকের লেখায় আস্তিকতা এবং নাস্তিকতার প্রসঙ্গ উথাপন করার উদ্দেশ্য হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের স্মরণ করিয়ে দেয়া, শক্তি দিয়ে অধিকাংশ পার্থিব কার্য সম্পন্ন করা তো যায়-ই না অধিকন্তু শক্তির এই অসদ্ব্যবহার যেকোনো ধর্মীয় বিচারেই জুলুম হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে প্রায় নব্বই শতাংশ জনগোষ্ঠীর পালনকারী ধর্ম ইসলামের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআন শরীফে মহান আল্লাহতায়ালা বারবার শাসকদের উদ্দেশে কঠোর সাবধান বাণী উচ্চারণ করে তাদেরকে জুলুম, অন্যায়, সীমা লঙ্ঘন ও অবিচার থেকে নিবৃত্ত হওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব শাসকবৃন্দ এবার অন্তত নেপথ্য শক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সংযত আচরণ করুন। পৃথিবীর ইতিহাস প্রমাণ করে, আল্লাহর শক্তির কাছে সব শক্তিই নগণ্য।
|