- মোহীত উল আলম
টিপাইমুখ বাঁধ বাঁধা বা না বাঁধা নিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হচ্ছে, তাতে অনেকের প্রাচীন গ্রিক কথক ঈশপের সেই বহুল প্রচলিত গল্প 'নেকড়ে ও মেষশাবকের' জল ঘোলা করার গল্পটি মনে পড়তে পারে। গল্পটির মূল কথা : বড় এবং শক্তিশালীরা সবসময় ছোটদের বশ্য বা শিকারে পরিণত করার জন্য যুক্তি খাড়া করতে পারে। সেটার সঙ্গে হয়তো বাংলাদেশ এবং ভারতের বর্তমান বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্কের তুলনা হবে না; কিন্তু বরাক নদীর উজানে নেকড়ের জায়গায় ভারতকে তুলনা করলে এবং ভাটির জায়গায় মেষশাবককে বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা করলে যে চিত্রকল্পটি ফুটে ওঠে, সেটি আমাদের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। অবশ্য আধুনিক বিশ্বে কোনো দেশ অন্য দেশের ওপর নেকড়ের মতো হামলে পড়বে তার অবকাশ নেই, যদিও বুশ পিতা-পুত্র মিলে ইরাকের ওপর দু'দু'বার তা-ই করেছিল এবং আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিসরে জোটনিরপেক্ষ দেশগুলোর সম্মেলনে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের কাছে এ আশ্বাস পেয়েছেন যে, বাংলাদেশের স্বার্থে আঘাত হানে এরকম কোনো কাজ ভারত করবে না। এ আশ্বাসকে ইতিবাচক ইঙ্গিত মনে করে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া সরকারকে আশ্বাস দিয়েছেন, টিপাইমুখ ইস্যু নিয়ে সরকারের শক্তিশালী অবস্থানের পাশে বিএনপি দাঁড়াতে ইচ্ছুক। এখানে আমরা সাধারণ জনগণ কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছি এজন্য যে, অন্তত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ঐক্য খুঁজে পাওয়ার মতো একটি ইস্যু খুঁজে পেল।
সরকার ও বিরোধী দল দেশের স্বার্থে এক হবে_ এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে নতুন শোনালেও গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে এটি হরহামেশাই ঘটছে। নিউজিল্যান্ডের কথা বলি। বছর দশেক আগে যখন মার্কিন রণতরী থেকে পারমাণবিক বর্জ্য ফেলার জন্য নিউজিল্যান্ডের কাছাকাছি প্রশান্ত মহাসাগরের একটি কোনাকে আমেরিকা বেছে নিয়েছিল এবং জাহাজ পাঠিয়েছিল, তখন তার বিরুদ্ধে নিউজিল্যান্ডবাসীর প্রতিরোধের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রতিবাদ জানাতে সেখানে হাজির হয়েছিলেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি সে দেশের বিরোধীদলীয় নেত্রীও। এ ঘটনাটি বিশেষ করে মনে পড়ার কারণ হচ্ছে, তখন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে ভীষণরকমের রেষারেষি যাচ্ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস করা না-করা নিয়ে।
আধুনিক বিশ্ব, বিশেষ করে প্রথম বিশ্ব, বহু আগেই পরিবেশবাদী যুগে প্রবেশ করেছে। প্রাকৃতিক পরিবেশকে অক্ষুণ্ন রেখে মানবসমাজের উন্নতিসাধন হচ্ছে পরিবেশবাদী চিন্তা ও চর্চার মূলকথা। এ চিন্তার আলোকে জাতিসংঘ ১৯৮৩ সালে 'দ্য ওয়ার্ল্ড কমিশন অন এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট' বা ডবি্লউসিআরডি নামে একটি সংস্থার সৃষ্টি করে, যার নেতৃত্বে ছিলেন নরওয়ের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গ্রো হারলেম ব্রান্টল্যান্ড। ব্রান্টল্যান্ডের নেতৃত্বাধীন প্রথম কমিশনের রিপোর্টে প্রকৃতি-সহনশীল উন্নতি বা সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সম্পর্কে বলা হয়, উন্নতি এমন ধারায় করতে হবে যাতে বর্তমান প্রজন্মের প্রয়োজন মিটবে কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মও তাদের প্রয়োজন মেটাতে অসুবিধায় পড়বে না। এ রিপোর্টে আরও বলা হয়, যে কোনো প্রকল্প হাতে নেওয়ার সময় তিনটি দিক বিবেচনায় আনতে হয় : পরিবেশ, অর্থনীতি ও সাম্যতা : ইংরেজিতে ইকোলজি/ এনভায়রনমেন্ট, ইকোনমি/এনভায়রনমেন্ট এবং ইকুইটি/ইকুয়্যালিটি, এ শব্দ সমাহারের জন্য এ ধারণাগুচ্ছকে সংক্ষেপে তিনটি 'ই' বা 'থ্রি ই' বলা হয়। টিপাইমুখ নামক স্থানে বরাক নদীর ওপর বাঁধ পড়লেই যে উপরের তিনটি 'ই' বিপর্যয়ের মুখে পড়বে তা বলাবাহুল্য। সাদা চোখে স্কুল ভূচিত্রাবলীতে চোখ রাখলে দেখি, বরাক নদী দু'ভাগ হয়ে সুরমা ও কুশিয়ারা নাম ধারণ করে সিলেটের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এ দুটি নদীই বাঁধের প্রভাবে শুকনো দিনে শুকিয়ে যাবে, আবার বর্ষার সময় প্লাবিত হবে। আমাদের কাপ্তাই বাঁধের অভিজ্ঞতা আছে এবং সেটি সুখকর নয়। এখন দেখা যাচ্ছে, ওই বাঁধটি দেওয়ার ফলে যত না লাভ হয়েছে, পরিবেশ এবং অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতি হয়েছে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি। তাছাড়া রাজনৈতিক ও সম্প্রদায়গতভাবে পাহাড়ের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সমতল বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী তিক্ত সম্পর্কের সৃষ্টি হয়েছে ওই কাপ্তাই বাঁধের কারণেই, যেটি অপনোদন করতে আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬-২০০১ আমলে প্রশংসনীয়ভাবে পার্বত্য শান্তি চুক্তি সম্পাদন করেছিল।
সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোরের প্রামাণ্য চিত্র অ্যান ইনকনভিনিয়েন্ট ট্রুথ দেখে শিউরে উঠতে হয় আগামী পঞ্চাশ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ দেখে। দেশের এক-তৃতীয়াংশ ডুবে যাবে বঙ্গোপসাগরে উষ্ণীকরণের প্রভাবে। টিপাইমুখ বাঁধ বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ও অর্থনীতি প্রকৃত বিরূপ অবস্থার মধ্যে পড়বে।
ভারতের বিশ্বনন্দিত লেখক অরুন্ধতী রায় তাদের দেশের নর্মদা নদীর ওপর বাঁধ স্থাপন নিয়ে আদিবাসী মেধা পাটেকরসহ বহু যুদ্ধ করেছেন, তারপরও ভারত সরকার বাঁধটি বসিয়েছে এবং এ কারণেই বাংলাদেশিদের মনে ভয় ঢুকেছে যে, টিপাইমুখের বাঁধটি হয়তো ভারত সরকার স্থাপন করে ফেলবে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বাঁধটি স্থাপনের পক্ষে রায় দিলেও এই বলে সরকারকে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, পরবর্তী কোনো সময়ে এ বাঁধের উচ্চতা বৃদ্ধি করার আগে পূর্ব থেকে বিতাড়িত জনগোষ্ঠীর সম্পূর্ণ পুনর্বাসন যেন নিশ্চিত করা হয়। অরুন্ধতী রায় এ বাঁধের ওপর তার বিখ্যাত রচনা 'দ্য গ্রেটার কমন গুড' বা 'সবার জন্য ভালো' লেখা, যেটা তার 'দ্য কস্ট অব লিভিং' গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়, লিখলেন_ 'বিরাট বাঁধ দেওয়া সরকারের জন্য সেরকম সহায়ক, যেরকম আণবিক বোমা তৈরির কারখানা বসানো সামরিক অস্ত্রভাণ্ডারের জন্য সহায়ক। দুটিই হচ্ছে মানববিধ্বংসী অস্ত্র।'
এখানেই আমাদের পররাষ্ট্রনীতির সক্ষমতা বা অক্ষমতা ভালোভাবে পরীক্ষিত হবে। একটি আশার কথা এই যে, আওয়ামী লীগ সরকার আগে ভারতের সঙ্গে পানি চুক্তি সম্পাদন করতে পেরেছিল। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আশা করা যায়, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার বিরোধী দলের সমর্থন সহযোগে সম্ভবত ভারতের সঙ্গে টিপাইমুখ নিয়েও দফারফা করতে পারবে। আর মনমোহন সিং ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলেও অত্যন্ত পণ্ডিত এবং মানবিক লোক, তিনিও নিশ্চয়ই তার সরকার এবং দেশকে এ সমস্যা থেকে উত্তরণের পথে ভারত, বাংলাদেশ এবং এ অঞ্চলের বৃহত্তর কল্যাণে ইতিবাচক ভূমিকা নিতে সাহায্য করতে পারবেন।
লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি ও মানববিদ্যা বিভাগ ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস
(সুত্র: সমকাল, ২২/০৭/২০০৯)