প্রস্তাবিত টিপাইমুখ বাঁধ বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং পরিবেশের জন্য নতুন মরণফাঁদ বলা হলেও ছয় দিনের সফর শেষে গতকাল দেশে পৌঁছে সংসদীয় প্রতিনিধি দলের প্রধান আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর কোনো প্রকল্প ভারত বাস্তবায়ন করবে না বলে তারা নিশ্চিত হয়েছেন। আবদুর রাজ্জাকের ভাষায়, ‘আমরা অ্যাবসলিউটলি আশ্বস্ত যে, বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর এমন কিছু ভারত করবে না। ভারত বলেছে, পরিবেশগত ক্ষতি হলে প্রথমে ভারতের হবে । সুতরাং তারা বিষয়টি মাথায় রেখেছে।’ তিনি বলেন, শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ভারত এ বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এ থেকে যে বিদুৎ উৎপাদন হবে তা দু’দেশ ভাগ করে নেবে। এ বাঁধের মাধ্যমে সেচ প্রকল্পের জন্য পানি প্রত্যাহারের কোনো আশঙ্কা নেই; বরং শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ আগের চেয়ে বেশি পানি পাবে। বিমানবন্দরে সংবাদ সম্মেলনে আবদুর রাজ্জাক জানান, সফরকালে তারা নয়াদিল্লিতে ভারতের বিদ্যুৎ মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেছেন। বৈঠকে তারা স্পষ্টভাবে আশ্বস্ত করেছেন, বাংলাদেশের স্বার্থে আঘাত হানে এমন কিছুই ভারত বাস্তবায়ন করবে না। তারা বলেছে, টিপাইমুখ বাঁধ একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। এর মাধ্যমে সেচ কাজে ব্যবহারের জন্য ভাটিতে বরাক নদীর কোনো পয়েন্টেই পানি প্রত্যাহার করা হবে না। আবদুর রাজ্জাক বলেন, আমরা ভারতের কাছে এ বাঁধের যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত দেয়ার আবেদন জানিয়েছি। তারা আমাদের সব রকম তথ্য-উপাত্ত দিতে সম্মত হয়েছে। এ বিষয়টিকে সফরের অন্যতম একটি সাফল্য বলে অভিহিত করেন তিনি। গত ২০-২২ বছর ধরে ভারতের কাছে এসব তথ্য-উপাত্ত চাওয়া হয়েছে, তবে তা দিতে তারা এতদিন সম্মত হয়নি বলে রাজ্জাক জানান।
সংবাদ সম্মেলনের এক পর্যায়ে আবদুর রাজ্জাক টিপাইমুখ বাঁধের বিষয়ে কথা বলতে জাতীয় পার্টির এমপি রুহুল আমিন হাওলাদারকে আমন্ত্রণ জানান। হাওলাদার মাইক্রোফোন নিয়ে বলেন, ভারতের বিমান বাহিনীর একটি হেলিকপ্টার তাদের পরপর দু’দিন প্রকল্প এলাকায় নিয়ে যায়। তবে খারাপ আবহাওয়ার কারণে দুর্গম ওই পাহাড়ি এলাকায় তারা অবতরণ করতে পারেননি। টিপাইমুখ এলাকায় এখনও কোনো নির্মাণ কর্মকান্ড শুরু হয়নি। তিনি বলেন, বিবিসির একজন সাংবাদিক তার তোলা প্রকল্প এলাকার ছবি সফরকারী প্রতিনিধি দলকে দেখিয়েছেন। ওই ছবিতে একটি পাথরের ভিত্তিপ্রস্তর ও টিনের ঘর ছাড়া আর কোনো স্হাপনার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। রাজ্জাকের সুরে তিনিও বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী এমন কিছুই ভারত করবে না। সফরকারী আওয়ামী লীগদলীয় এমপি আবদুর রহমানও একই কথা বলেন।
রুহুল আমিন হাওলাদার দুর্যোগপুর্ণ আবহাওয়ার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, অবস্হা এতটাই খারাপ ছিল যে প্রতিনিধি দলের সদস্য ফজলুল আজিম হেলিকপ্টারে বমি করে ফেলেন। অন্যদিকে ফজলুল আজিম বলেন, সবাই হেলিকপ্টারে দোয়া-দুরুদ পড়েই সময় পার করেছেন। রুহুল আমিন হাওলাদার কোরআন শরিফ হাত থেকে রাখেনইনি। তিনি বলেন, আবহাওয়া খারাপ থাকায় তারা ঠিকমত কিছু দেখতে পারেননি। প্রকল্প এলাকাটি এতটাই দুর্গম যে, ওই এলাকায় নির্মাণ সামগ্রী নিয়ে যাওয়াও বেশ দুরুহ বলে তার কাছে মনে হয়েছে। দুর্যোগপুর্ণ আবহাওয়ার কারণে প্রস্তাবিত বাঁধ এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করতে না পেরে সোমবার প্রতিনিধি দলটির দেশে ফেরার কথা ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত এমপি ছাড়া বাকি চারজন দেশে ফিরলেও দলনেতা রাজ্জাকসহ ছয় এমপি অতিরিক্ত একদিন নয়াদিল্লিতে অবস্হান করেন। গত ২৯ জুলাই টিপাইমুখ প্রকল্প পরিদর্শনে প্রতিনিধি দলটি ভারত রওনা হয়। প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন, সরকারি দলের দুই এমপি এবিএম আনোয়ারুল হক ও জহির হোসেন এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন, ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের সদস্য সাজ্জাদ হোসেন, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ওয়াহিদুজ্জামান ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক এমরান আহমেদ।
(সুত্রঃ আমার দেশ, ০৫/০৮/২০০৯)